মাহুত বন্ধুর তৎপরতায় জীবন ফিরে পেল রোহিণী

বনদপ্তরের পোষা হাতি রোহিণী

ত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স। বাংলার পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু প্রকৃতিঘেরা এই অঞ্চল। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, অসংখ্য পশুপাখি, চা-বাগান, আর ছবির মতন সুন্দর শহর মন কেড়ে নেয় প্রথম দর্শনেই। তবে ভালোর সঙ্গে খারাপও থাকে। এই অঞ্চল থেকে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়। আক্রান্ত হয় মানুষ, পশুপাখি, প্রকৃতি। কখনও চিতাবাঘ গ্রামে ঢুকে পড়ে বা কখনও ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হয় বা মারা যায় হাতি আর অন্যান্য পশু। তেমনই এক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল বনদপ্তরের পোষা হাতি রোহিণী। সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে জলদাপাড়া ডিভিশনের (Jaldapara Division) জঙ্গল-এ হাতিটি একটি বিষাক্ত কোবরার কামড়ে গুরুতরভাবে জখম হয়েছিল। তবে বনদপ্তরের তৎপরতায় সে আপাতত বিপন্মুক্ত হয়েছে।

বনদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ তারিখ বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ জঙ্গল পরিদর্শনের সময় হাতিটিকে সাপে কামড়ায়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে হাতিটি, এমনকি তার জীবনের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তার মাহুত বন্ধুর তৎপরতায় সে রক্ষা পেয়েছে প্রাণহানি থেকে। রোহিণীর মাহুত বিষয়টি লক্ষ্য করে সঙ্গে সঙ্গে বনদপ্তরের আধিকারিকদের খবর দেন। ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

 

বনদপ্তরের পশুচিকিৎসক অফিসার ডঃ উৎপল শর্মা হাতিটিকে পরীক্ষা করেন, তাকে সাপের বিষ-নিরোধক ইঞ্জেকশন দেন এবং অন্যান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসায় দ্রুত সুফল মিলতে দেখা যায়। মাহুত এবং হাতিটির রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত কর্মীরা গোটা সময় ধরে অকুস্থলে ছিলেন এবং সারাক্ষণ অসুস্থ হাতিটির সেবা-শুশ্রুষা করেছেন। তাঁদের চেষ্টার মধ্যে দিয়ে হাতিটির প্রতি তাঁদের ভালোবাসা এবং আবেগের ছবি ধরা পড়েছে প্রতিমুহূর্তে। চিকিৎসার গোটা সময় ধরে তাঁরা হাতিটিকে শান্ত করে রেখেছিলেন, যা হাতি এবং মাহুতের মধ্যে গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক ছাড়া সম্ভব হতো না। সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে হাতিটি। ২৬ সেপ্টেম্বর, রোহিণীর মধ্যে সুস্থতার লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করে। সে কারও সাহায্য ছাড়াই খেতে পারছিল। অর্থাৎ, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই হাতিটিকে বিপন্মুক্ত করা গেছে।

এই সাফল্য গোটা বনদপ্তরের। এতে শুধুমাত্র একটি প্রাণীর জীবন বেঁচেছে তা-ই নয়, পরীক্ষিত হয়েছে বনদপ্তরের পশুচিকিৎসা ব্যবস্থা, তাদের দক্ষতা, পরিকাঠামো সবকিছুই। বলাই বাহুল্য যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন তাঁরা। এই ঘটনা গোটা বনদপ্তরের মুকুটে যুক্ত করেছে এক নতুন পালক, যে সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত আছেন সকলেই- এডব্লুএলডব্লু, এডিএফও, রেঞ্জ অফিসারেরা, তৃণমূল স্তরের কর্মীরা। বনদপ্তরের এই সাফল্যে অংশীদার ছিলেন বিভিন্ন এনজিও, সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা, রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তর। রোহিণীর সুস্থতা জলদাপাড়া ডিভিশনের ইতিহাসে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই ঘটনা বনদপ্তরের কার্যদক্ষতা এবং টিমওয়ার্ক করার ক্ষমতার পাশাপাশি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে তাদের অঙ্গীকারকেও প্রমাণ করেছে। তাছাড়া এই ঘটনা সেই প্রাচীন আপ্তবাক্যকেও যেন আবার সঠিক প্রমাণ করল, যা বলে- যখন কোনও মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে সবাই এগিয়ে আসেন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, তখন সেই কাজ সফল হবেই।
বনদপ্তরের পক্ষ থেকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

তথ্যঋণ ও ছবিঃ পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের ফেসবুক পেজ

Developed by DXDasia