সত্যজিতের পরিচালনায় ‘মা দুগ্গা’ : অন্য জীবনবোধের খোঁজ

‘পথের পাঁচালি’, ‘দেবী’, ‘নায়ক’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির প্রেক্ষাপট ঘিরে রয়েছে বাঙালির দুর্গাপুজো

'পথের পাঁচালি'-র দৃশ্য

“ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব আর ইন্দ্র- আর সেই সঙ্গে আরো সব দেবতাদের তেজ একসঙ্গে মিলে সৃষ্টি হলেন দেবী দুর্গা। এই দুর্গার দশ হাতে দশরকম অস্ত্র।” – এ কেবল পুরাণের গল্প নয়, চলচ্চিত্রের সংলাপ। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর শুরুটা হয়েছিল এভাবেই। ঠাকুর দালানের এক্কেবারে অন্দরে তখনও চলছে মূর্তি গড়ার কাজ। সাক্ষাৎ শরৎকাল। সিনেমা আসলে জীবনের কথা বলে। বাঙালির জীবনের গল্পে দুর্গাপুজো তো শুধুই বছরের চারটে দিনের ঘটনা নয়, বরং কয়েকশ বছরের সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়া দৈনন্দিন অংশ। তাই বাংলা ছবিতে নানা সময়ে উঠে এসেছে দুর্গাপুজো। কখনো নেপথ্যে, কখনও আবার মূল বিষয় হিসেবে।

দেখতে দেখতে আরও একটি দুর্গাপুজো দোরগোড়ায়। থেমে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কের চর্চা থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া, গান-বাজনা, কবিতা, সাহিত্যের পঠনপাঠন, ঘোরাঘুরি ইত্যাদি দুর্গাপুজো মানে আরও কতো কি! চলচ্চিত্রে জটায়ুর ভাষায় যাকে বলে ‘কাল্টিভেশন’- সব কিছুই পুরোদমে চলতে থাকে উৎসবের এই চার-পাঁচটি দিন।

‘পথের পাঁচালি’, ‘দেবী’, ‘নায়ক’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গ। কখনো নেপথ্যে, কখনও আবার মুল চরিত্র হয়ে।

হিন্দি সিনেমার দিকে তাকালে একটা বাতিক প্রায়ই নজরে পড়ে। সেখানে কলকাতা দেখাতে হলে পরিচালকরা দুর্গাপুজোকেই একমাত্র হাতিয়ার করে নেন। ‘কাহানি’ সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের কথা মনে আছে? দুর্গাপুজোর শেষ দিন, বিজয়া দশমী। জোরে ঢাক বাজছে, সিঁদুর খেলা, লাল পাড় সাদা শাড়ি পরা মেয়ের দল… মোট কথা দুর্গাপুজো নিয়ে বাঙালির যা-যা নস্ট্যালজিয়া থাকতে পারে, সব ক’টাকেই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিল ওই ক্লাইম্যাক্স। তবে বাংলা সিনেমায় দুর্গাপুজো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আজকের নয়। ৫০-এর দশকে সত্যজিৎ রায় এ কাজটা শুরু করেছিলেন। কোথাও বা দুর্গাপুজো ছবির কেন্দ্রে থেকেছে, তাকে ঘিরেই এগিয়েছে গোটা গল্প এবং চরিত্ররা; আবার কোথাও পুজো এবং তার বিভিন্ন অনুষঙ্গ সিনেমার মধ্যে তিরতির করে বয়ে গিয়েছে চোরাস্রোতের মতো। সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে দুর্গাপুজোর চিত্রকল্প বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। তাই পুজোয় বাংলা ছবির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে, মানিকবাবুর ছবিই থাকে সর্বাগ্রে।

দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যেকটি তিনি ছবি বানিয়েছিলেন, প্রত্যেকটিরই প্রেক্ষাপট ছিল স্বতন্ত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর যেরকম বিবর্তন ঘটেছে, তেমনই পরিচালক তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে পরবর্তী ছবির প্রেক্ষাপট সাজিয়েছেন। রইলো সেইসব চলচ্চিত্রের তালিকা –

পথের পাঁচালী (১৯৫৫):

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে, ‘পথের পাঁচালী’ হল সত্যজিৎ রায় পরিচালিত প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র। প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকালেন মানিকবাবু। ছবির প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের রায়বাড়ির দুর্গোৎসবের কয়েকটি ঝলক। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক দুঃস্থ পরিবারের দুই শিশুর স্বপ্ন, ভালো লাগা, জীবনের আসন্ন পরিবর্তন, কেমন করে কয়েক দিনের জন্য ধনী-দরিদ্রের প্রভেদ ঘুচে যায়, কেমন করে খুশিতে মেতে ওঠে কচিকাঁচার দল, তারই কয়েকটি আনন্দময় মুহূর্ত সত্যজিৎ রায় তুলে ধরেছেন প্রশ্নাতীত দক্ষতার মধ্যে দিয়ে।

'পথের পাঁচালি' চলচ্চিত্রে শরতের অনুষঙ্গ

ছবিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য অবশ্যই কাশফুলের বোনে দুই ভাইবোনের ঘুরে বেড়ানো এবং সেখানে দাঁড়িয়েই অপুর প্রথম রেলগাড়ি দর্শন। অপুকে আমরা পরবর্তীকালে অন্য ছবিতে আবার দেখব, কিন্তু দুর্গার এটিই শেষ পুজো। এক বর্ষার দিনে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে। গল্পে অন্যতম বড়ো ভূমিকা রয়েছে দুর্গা-অপুর মা সর্বজয়ারও, যিনি প্রবল অভাবের মধ্যেও সংসারের হাল ধরে রেখেছেন শক্ত হাতে যদিও দুর্গার মৃত্যুর শোকে শেষ পর্যন্ত তিনিও ভেঙে পড়েন। একটি গল্পের মধ্যে দিয়ে আরও অনেকগুলি গল্প বলার মুন্সিয়ানা এই ছবিতে সত্যজিৎ যেভাবে দেখিয়েছেন, তা ছবিটির অমরত্ব লাভের মধ্যে দিয়েই প্রমাণিত।

দেবী (১৯৬০):

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ অনুসারে লেখা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘দেবী’ গল্পের অনুসরণে এ ছবি। মধ্যবিত্ত সমাজে মহামায়ার গুরুত্ব ঠিক কতটা, তা সত্যজিৎবাবু দেখিয়েছেন এ ছবিতে। ‘দেবী’-র প্রেক্ষাপট অবশ্য পুজোর মধ্যেই শুরু। জমিদারবাড়িতে পাঁঠাবলির পর দুর্গাপ্রতিমা ভাসান হচ্ছে, এখান থেকেই গল্পের সূত্রপাত। চলচ্চিত্রের শুরুতেই বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সাবেকি ধাঁচের মৃন্ময়ী দুর্গাপ্রতিমা আস্তে আস্তে গড়ে ওঠার দৃশ্য দেখানো হয়েছে, এবং সেই সঙ্গেই চলেছে একের পর এক টাইটেল কার্ড।

'দেবী' চলচ্চিত্রের দৃশ্য

একটি স্বপ্নদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে শ্বশুর কালীকিঙ্কর নিজের কনিষ্ঠা পুত্রবধূ দয়াময়ীকে (অভিনয়ে শর্মিলা ঠাকুর) সাক্ষাৎ দেবীর অবতার হিসাবে পূজা করতে আরম্ভ করলেন, এবং তাঁর এই অন্ধবিশ্বাস-জনিত আচরণের ফলে তাঁর পরিবার ছারখার হয়ে গেল – এই হচ্ছে এ-চলচ্চিত্রের মূল বিষয়। স্বয়ং পরিচালক এই ছবির জন্য রামপ্রসাদী সুরে “এবার তোরে চিনেছি মা” গানটি বেঁধেছিলেন। শোনা জায়, এই ছবিটি বানানোর জন্য মানিকবাবুকে নানারকম বিতর্কের সম্মুখীনও হতে হয়েছিল।

নায়ক (১৯৬৬):

এই ছবিতে, বিখ্যাত ম্যাটিনি আইডল অরিন্দম মুখার্জির (অভিনয়ে উত্তমকুমার) স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তাঁর পাড়ার দুর্গাপুজোর কথা, মহাষ্টমীর দিন নাটক করার কথা। “শঙ্করদা বলত যে ওই চালচিত্তির, ডাকের সাজ, ড্যাবড্যাবে চোখ না হলে ঠিক ভক্তি আসে না।”– জানান অরিন্দম। তাই, তাঁদের পাড়ায় মায়ের সাজ হত এক্কেবারে সাবেকি ধরনের। আর সেই পুজোয় বিজয়াদশমীর দিন ঠাকুর বিসর্জনের সময়ে আচমকা মাটিতে পড়ে গিয়ে মারা যান শঙ্করদা, অরিন্দমের নাট্যগুরু। ছবিতে সংলাপের বুনটে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আবেগ এবং সেই উৎসব ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন পরিচালক।

'নায়ক' চলচ্চিত্রে অরিন্দম মুখার্জির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গ

জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯):

এটি সত্যজিতের বিখ্যাত গোয়েন্দা ‘ফেলুদা’ সিরিজের দ্বিতীয় ছবি। এই গল্পেরও প্রেক্ষাপটে রয়েছে পুজো। অবশ্য কলকাতার নয়, সে পুজো বেনারসের। বেড়াতে গিয়ে ফেলুদার (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) হাতে এসে পড়ে এক ‘কেস’। বেনারস শহরের নামকরা বাঙালি পরিবারের বাড়ি থেকে অদৃশ্য হওয়া এক অতি মূল্যবান গণেশমূর্তি উদ্ধারের দায়িত্ব এসে পড়ে ফেলুদার উপর।

'জয় বাবা ফেলুনাথ' চলচ্চিত্রে শশী পটুয়ার মূর্তি গড়ার দৃশ্য

এ ছবির পুরোটাই গড়ে উঠেছে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে। ছবির শুরুতে দেখা যায়, ঘোষালবাড়ির ঠাকুরদালানে প্রতিমা গড়া হচ্ছে, আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে বাড়ির ছোট্ট ছেলে রুক্মিণীকুমার ওরফে রুকুর সঙ্গে গল্প করছেন বৃদ্ধ শশী পটুয়া। শশীবাবুর গল্প থেকেই জানা যায়, বাঙালির দুর্গাপুজোর পৌরাণিক ইতিবৃত্ত। এসব গল্প শুনে অবশ্য ছোট্ট রুকু জিজ্ঞেস করেছিল “এই সব সত্যি?” শশী পটুয়ার অব্যর্থ জবাব, “মিথ্যে কী করে বলি রুকু বাবু? মুনি ঋষিরা তো এইসব লিখে গেছেন”। অর্থাৎ, আমাদের প্রশ্ন করার কোনও অধিকার নেই। যা গিলিয়ে দেওয়া হবে, তাই শিরোধার্য হবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের। আপাতদৃষ্টিতে ছোটোদের ছবি হলেও প্রাজ্ঞ পরিচালক, এর মধ্যে দিয়ে সমাজের কাছে তুলে ধরলেন বুদ্ধিদীপ্ত বার্তা। পুজো এই ছবির কেন্দ্রীয় থিম নয়, কিন্তু নানা টুকরো শটে, দৃশ্যে, দুর্গামূর্তি তৈরি, পুজোর আমেজ ইত্যাদিকে খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। আবার ছবির শেষে রহস্য উন্মোচনে পুজোটাই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গার বাহনের কী ভূমিকা, তাই দেখানো ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ।

মানিকবাবুর ছবি আমাদের ভাবতে শেখায়, সর্বস্তরে। তাই বাঙালি জীবনে বারবার তাঁর ছবির সমালোচনা আসে, ভবিষ্যতেও আসবে। এই পুজোয় আবারও চোখ থাকুক রুপোলি পর্দার সত্যজিতে। পুজো পরিক্রমার পাশাপাশি সত্যজিতের ফ্রেমে থাকুক চলচ্চিত্রের দুর্গারা। হয়তো আমরা নতুন কোনও জীবনবোধের খোঁজ পাবো সেখানেই।

Developed by DXDasia