পিরের দরগায় শিরনি দিয়ে শুরু হয় সিংহ মজুমদার বাড়ির দুর্গাপুজো

হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই অংশ নেন গাজিপুরের শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোয়

মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর প্রিয় অনুচর আলি কুলি বা শের আফগানের বিয়ে দিয়েছিলেন মেহেরউন্নিসার সঙ্গে, যে মেহেরউন্নিসার ওপর সম্রাটের ছেলে সেলিমের নজর ছিল। আকবর মারা গেলে সেলিম হলেন সম্রাট, ‘জাহাঙ্গির’ উপাধিতে ভূষিত হয়ে শাসন করতে লাগলেন বিশাল সাম্রাজ্য। তখনও মেহেরউন্নিসাকে তিনি ভোলেননি। আলি কুলিকে লাহোর থেকে বদলি করলেন বর্ধমানে। জাহাঙ্গিরের সৎ ভাই কুতুবউদ্দিনের অধীনে আলি কুলি হলেন বর্ধমানের জায়গিরদার। তাঁর বিরুদ্ধে কর ফাঁকি দেওয়া এবং বিদ্রোহীদের সাহায্য করার অভিযোগ আনা হল। কুতুবউদ্দিনের হাতে নিহত হলেন আলি কুলি। মেহেরউন্নিসা এবং তাঁর শিশুকন্যাকে নিয়ে যাওয়া হয় আগ্রায়। সম্রাট জাহাঙ্গির মেহেরউন্নিসাকে বিয়ে করলে তিনি মেহেরউন্নিসার নাম রাখেন – ‘নুরমহল’। সেই নাম পাল্টে সম্রাট আবার নতুন নাম রাখেন, ‘নুরজাহান’ বা জগতের আলো।

শের আফগানকে হত্যা করার সময়ে জাহাঙ্গিরের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন এক বাঙালি। তাঁকে রাঢ় অঞ্চলে দামোদর নদীর তীরে জায়গিরদারি প্রদান করেন মুঘল সম্রাট। দামোদরের তীরে এইভাবে সিংহ মজুমদার বংশের আধিপত্য শুরু হল। এর আগেই অবশ্য এই পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বাদশা আকবরের সেনাপতি মান সিংহের পরিবারের সঙ্গে। মুঘল সম্রাটদের আপনজন হয়ে উঠেছিল এই পরিবার। পরবর্তীকালে দামোদরের বন্যায় সিংহ মজুমদাররা খুব বিপদে পড়েন। তাঁদের প্রচুর ধনসম্পত্তি নষ্ট হয়ে যায়। তখন বাংলার নবাব ও বর্ধমানের রাজার আর্থিক সহায়তায় সিংহ মজুমদার বংশের রামনারায়ণ সিংহ এক দুর্গামন্দির স্থাপন করেন। সে মোটামুটি দু’শ বছর আগের কথা। হাওড়ার ছোট্ট গ্রাম গাজিপুরে এখনও রমরমিয়ে চলছে সেই দুর্গাপুজো। 

একেবারে সূচনাপর্ব থেকেই এই পুজো হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক আশ্চর্য নিদর্শন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী মহাষষ্ঠীর দিন সিংহ মজুমদার বংশের প্রবীণতম সদস্য দেবীপূজার সূচনা করেন। সেদিন গাজি পিরের দরগায় শিরনি দেওয়া হয়। পিরের দরগায় শিরনি দেওয়ার মাধ্যমেই দেবীর পুজো শুরু হয়। তারপর হয় দেবী দুর্গার বোধন। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে গাজিপুরের দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলমান মিলনের এক মহোৎসব। সপ্তমীর দিন সন্ধিপূজার পর থাকে বিশেষ অনুষ্ঠান – বাংলার সচিত্র পশুপক্ষী পরিচিতি। অষ্টমীতে হয় কুমারী পুজো। দশমীর দিন সিঁদুর খেলার অনুষ্ঠান হয় দেখার মতো। গোটা উৎসবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গ্রামের মানুষরা অংশগ্রহণ করেন, পুজোর নানা দায়িত্ব ভাগ করে নেন।

তথ্যঋণ – রোর বাংলা, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলি।
ছবি – প্রতীকী 

 

Developed by DXDasia