৩৯ বছর বয়সী এই তবলচি বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলছেন
২০০৩ থেকে ২০১৯, এই দীর্ঘ ষোলো বছরে মোট চারবার আমেরিকার লস এঞ্জেলেস-সহ বিভিন্ন শহরে গিয়ে ভারতের ধ্রুপদী সংস্কৃতির প্রচার করে এসেছেন শিলিগুড়ি হাকিমপাড়ার বাসিন্দা তবলা শিল্পী সুবীর অধিকারী। অনাবাসী ভারতীয় থেকে শুরু করে অন্য মহলে তবলা দিয়ে রীতিমতো ঝড় তুলেছেন। আবারও এই দুর্গাপুজো উৎসব পর্বে তিনি তবলার অনুষ্ঠান করতে জার্মানি যাচ্ছেন। সুবীর অধিকারী তবলা বাজিয়েই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, এমনকি বিদেশেও এখন ঝড় তুলছেন।
সুবীরবাবুর বাবা প্রয়াত বেনু অধিকারীও ছিলেন একজন তবলা শিল্পী। ছোটোবেলায় বাবার হাতেই দিনরাত তবলার নানান বোল শুনতে শুনতেই কখন যে তবলার নেশায় জড়িয়ে গিয়েছেন, তা নিজেও বুঝতে পারেননি। আর তবলার প্রতি ভালোবাসার জেরে আকাশবাণী দূরদর্শন-সহ বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক জায়গায় আবার এ গ্রেড শিল্পী হিসাবেও চিহ্নিত হয়েছেন। এক নাগাড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে তবলা বাজানোর সর্বোচ্চ রেকর্ডও তাঁর রয়েছে।

তবে নিয়মিত তবলার রেওয়াজ কোনওদিন বন্ধ করেননি সুবীরবাবু। তাঁর কথায়, নিয়মিত চার ঘণ্টা রেওয়াজ করা দরকার। রেওয়াজ করার সঙ্গে সঙ্গে ভালো গানবাজনা শোনাও জরুরি। শিলিগুড়ি থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত, নেপাল, ভুটান, সিকিম, বিহার সর্বত্র সুবীরবাবুর ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে রয়েছে। মেয়েরাও এখন তাঁর কাছে তবলা শিখতে আসছে। যেমন বিহারের কাটিহার নিবাসী কলেজ ও স্কুল ছাত্রী দুই বোন হিতেশি মণ্ডল ও হিরন্যসুধা ছয় ঘণ্টা ট্রেন জার্নি করে শিলিগুড়ি আসেন স্রেফ সুবীরবাবুর কাছে তবলা শিখতে। আবার কার্শিয়াংয়ের উঁচু পাহাড় থেকে প্রেমকুমার ঘাটানি শিলিগুড়ি নেমে আসেন তাঁর কাছে তবলা শেখার জন্য।
২০০৩ সালে প্রথমবার সুবীরবাবু আমেরিকা যান তবলার অনুষ্ঠান করার জন্য। সেবারে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠান করেন। যোগ দেন হলিউডের অনুষ্ঠানেও। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের জুলাই মাসে তিনি আমেরিকার বিভিন্ন শহর সফর করেন তবলার অনুষ্ঠানের জন্য। এবারেও অনাবাসী ভারতীয় নৃত্যশিল্পী প্রাচী দীক্ষিতের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে অনাবাসী ভারতীয় শিল্পী এবং আমেরিকানিবাসী অনেকের সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন। প্রচার করেন ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতির।

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শিলিগুড়ির এই তবলচি তবলা বাজিয়ে যেভাবে ঝড় তুলছেন, তার তারিফ করেন প্রাচী দীক্ষিত থেকে শুরু করে আমেরিকার শিল্পী স্টিফেন ডে, স্টেভিন ম্যাকনাভারা প্রমুখ।
সুবীরবাবু জানান, পুজো উৎসবের শুরুতেই এবার তিনি প্রথমে বেঙ্গালুরু যাচ্ছেন তবলা বাজানোর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সেখান থেকে ফিরে এসেই যাবেন জার্মানির স্টুট গার্ডে। জার্মানির চারটে স্থানে তাঁর তবলা বাজানোর কর্মসূচি রয়েছে। সুবীরবাবু বলেন, আমেরিকায় অনুষ্ঠান করার সময় কেউ কেউ সে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। উত্তরবঙ্গ থেকেই বারবার বিদেশে গিয়ে তবলার মাধ্যমে বাজিমাত করে দেওয়া যায়, তা তিনি আরও বেশি করে প্রমাণ করতে চান।

আবার তবলা দিয়ে দু-একজন মানুষকে সুস্থ রাখার কাজও করেন তিনি। শিলিগুড়ি ভারতনগরের কাছে ষাট বছরের এক ব্যক্তি বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। সেই ব্যক্তি গানবাজনা খুব ভালোবাসতেন। সুবীরবাবু তাঁকে বাড়ি গিয়ে বহুদিন গান বাজনা শুনিয়ে ভালো রেখেছেন। পরে অবশ্য সেই ব্যক্তি মারা যান। সুবীরবাবু বলেন, তবলা শুনিয়ে ওই অসুস্থ ব্যক্তিকে অনেকদিন ভালো রাখা হয়েছিল। ভবিষ্যতে বিরাট আকারে তবলা বাজানোর প্রতিযোগিতা উত্তরবঙ্গে তিনি করতে চান। তার পাশাপাশি দুঃস্থ তবলা শিল্পীদের পাশেও দাঁড়াতে চান।