ইতিহাস, সম্প্রীতি, পর্যটনে আজও অদ্বিতীয় মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী গ্রাম

কিরীটেশ্বরী – ভারতে বহুত্ববাদের মূর্ত প্রতীক

রোশনিবাগে সুজার সমাধি

কিরীটেশ্বরী এখন সংবাদ শিরোনামে, দেশের পর্যটন মানচিত্রে সেরার শিরোপা পেয়েছে এই গ্রাম। ভাগীরথীর পশ্চিমতীরের এই গ্রামকে ঘিরে এখন উন্মাদনার শেষ নেই। মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীনতম জনপদ বলা যায় কিরীটেশ্বরীকে। ‘মাইথলোজি’ বলে, এখানে সতীর কিরীট অর্থাৎ মুকুট পড়েছিল। সেই থেকে গ্রামনামে কিরীট-র আবির্ভাব। তখন গ্রামের নাম ছিল কিরীটকোণা। যদিও রেনেলের মানচিত্র বা রিয়াজুস সালাতীন গ্রন্থে গ্রামের নাম রয়েছে তীরতকোণা। মুখসুদাবাদ, মুর্শিদাবাদ হয়ে ওঠার আগে থেকেই এই মন্দির বিদ্যমান। আজ মানুষ এই গ্রামের নাম জানছে, সতীপীঠ হিসেবে খ্যাতি লাভ করছে কিরীটেশ্বরী। তবে, এ গ্রামের যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেশি করে আলোচনা করা দরকার, তা হল ধর্মীয় সম্প্রীতি। সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির কিরীটেশ্বরী। সে যুগে নবাবদের নহবতখানার বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ আর কিরীটেশ্বরীর শঙ্খধ্বনি মিশে যেত মুর্শিদাবাদের আকাশে-বাতাসে।

কিরীটেশ্বরী, পাশে পুরোনো ভগ্ন মন্দির

কিরীটেশ্বরী গ্রাম মানেই কেবল সতীপীঠ বা কালী মন্দির নয়। মন্দির চত্বরে বেশ কয়েকটি শিব মন্দির রয়েছে, এক একটির ইতিহাস সুপ্রাচীন। এখন কিরীটেশ্বরীর দু’টি মন্দির রয়েছে, পাশেই রয়েছে ভগ্ন মন্দির। সেটিই প্রাচীন মন্দির। দুই মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলে জেনেছি, এদের দুজনেরই বক্তব্য, “এই এটাই আসল কিরীটেশ্বরী, এখানেই কিরীটকণা পড়েছিল।” কাছেই রয়েছে গুপ্ত মন্দির, সেখানকার পুরোহিতেরও একই বক্তব্য। আদতে এদের পেশা পৌরহিত্য, মানুষকে যত ধর্মের মহিমা বলবেন, ততই এদের উপার্জন বাড়বে। ইতিহাস নিয়ে ভাবার সময় নেই এঁদের। মন্দিরের বাইরে যাঁরা ফুল, মালা, পুজোর সামগ্রী বিক্রি করেন তাঁদেরও একই অবস্থা। কিরীটেশ্বরী নিয়ে অধুনা বহু রকম প্রচার চলছে, তবে সত্য হল বঙ্গাধিকারীরা এই মন্দিরকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, কিরীটেশ্বরী আজও যে টিকে আছে তার সিংহভাগ কৃতিত্ব এঁদেরই এবং কিছুটা রানী ভবানীর উত্তরপুরুষদের। বঙ্গাধিকারীদের আদিপুরুষ ভগবান রায়ের ছোটো ভাই বঙ্গবিনোদ রায় শাহ সুজার থেকে কানুনগো পদ এবং প্রচুর দেবোত্তর সম্পত্তি পান। কিরীটেশ্বরীও ওই দেবোত্তর সম্পত্তির মধ্যে ছিল। ভাবা যায়? মোঘল শাসকের অধীনে রয়েছে দেবী কালিকার মন্দির আর সেই মন্দিরে এক চুলও আঘাত আসেনি। আজকের ভারতে যা রটানো হয়, সেকালের ভারত মোটেও তেমনটা ছিল না। মুসলাম শাসক মানেই হিন্দুর মন্দির ধ্বংসকারী নয়।

শিবমন্দির

এতজন নবাব মুর্শিদাবাদ শাসন করেছেন, কিন্তু কেউই কিরীটেশ্বরীর মন্দিরকে স্পর্শ করেননি। মন্দিরের উপর কোনও আঘাত আসেনি। বরং অস্তিত্ব রক্ষায় সাহায্য করেছেন তাঁরা। কারণ নানান সময়ে নবাবদের খাস কর্মীরাই এই মন্দিরের সংস্কার করেছেন। মুসলমান শাসনকালে কিরীটেশ্বরী তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তিনি নানান কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নবাবরা মায়ের মহিমার কথা জানতেন। মন্দিরের পিছনের দিকে পুকুর তাদেরই খনন করানো। আজও সেই পুকুর রয়েছে। ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখেছি, মীরজাফর জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এই মন্দিরের চরণামৃত পান করেছিলেন এবং তার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় খেয়েছিলেন কি? ইতিহাস বলছে নন্দকুমারের অনুরোধে তিনি চরণামৃত পান করেছিলেন। কুষ্ট আক্রান্ত মীরজাফর তখন মৃত্যুর অপেক্ষায়, পরিবারের লোকেরা তাঁকে নির্বাসিত করেছে। ফলে পরিত্রাণের পথ পেতে তিনি নিজ ইচ্ছায় এমনটা করতেই পারেন। কিন্তু পুকুর খননের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি। কেউ কেউ লিখেছেন বটে কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। পুকুর কাটা হয়েছে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর লম্বাটে করে। সাধারণত হিন্দু মন্দির লাগোয়া পুকুরগুলো এমন হয় না। পুরোপুরি বর্গক্ষেত্রে না হলেও, দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুপাতে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়। পুকুরটি মুসলমান শাসকের খনন করানো, এটাই যা ক্ষীণ সম্ভাবনা।

সেই পুকুর

কিরীটেশ্বরী গ্রামেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন মুর্শিদাবাদের দ্বিতীয় নবাব, মুর্শিদকুলীর জামাই সুজা উদ্দীন। ইতিহাস তাঁকে সেভাবে মনে রাখেনি, তবে প্রজাবাৎসল্যের নিরিখে তিনিই ছিলেন মুর্শিদাবাদের শ্রেষ্ঠতম নবাব। ধর্মীয় বেড়াজালের উপরে উঠে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের নবাব। মুর্শিদকুলী যে সব জমিদারদের বন্দি করেছিলেন, সুজা তাঁদের মুক্ত করেন। এমনকি মুর্শিদকুলীর যে’সব কর্মীরা হিন্দু প্রজাদের উপর অত্যাচার করেছিল, তাঁদের শাস্তি দেন সুজা। নাজীর আহম্মদ তাদের মধ্যে অন্যতম, তাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন সুজা। 

সুজা তৈরি করেছিলেন ফারহাবাগ। আজ আর তা নেই, তবে সুজার রোশনিবাগ রয়েছে, কিরীটেশ্বরী গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত সেটি। এখনও মানুষ তা দেখতে যান। সুজা মারা যান ১২৫১ অব্দে (হিজরি সন), রোশনিবাগেই তিনি সমায়িত রয়েছেন। মুর্শিদাবাদ নিয়ে লেখা একশো বছরের পুরোনো বইগুলো বলছে, সুজার প্রিয় কর্মচারী আলিবর্দি রোশনিবাগে মসজিদ তৈরি করেন, ১১৫৬ অব্দ (হিজরি সন)। যদিও শেষ পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, মসজিদটি সুজাই বানিয়েছিলেন। মসজিদটি আজও রয়েছে। রোশনিবাগে একজন গাইড আছেন। বৃদ্ধ, বয়সের ভারে কাহিল। ২০২০ সালেও তাঁর দেখা পেয়েছি, এখনও আছেন কিনা জানি না। তিনি স্থানীয় গ্রামবাসী, পেটের টানে গাইড হয়েছেন। ইতিহাস বলেন নিজের মতো করে, কিছুটা সত্যি কিছু জনশ্রুতি, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তাঁর কথায়, “সুজার সমাধিই হল গোটা মুর্শিদাবাদের সবচেয়ে লম্বা কবর”। মসজিদ থেকে কয়েক পা এগোলেই সমাধি। ফুট তিনেক উঁচু বেদির উপর সমাধিভবন বানানো হয়েছে। ভিতরে শুয়ে আছেন সুজা। উঁকি দিয়ে দেখলাম, সমাধির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত ফুট। সুজা বেশ লম্বা, চওড়া মানুষ ছিলেন তা বোঝা যায়। একেবারে প্রাচীন সমাধিভবনটি বহু আগেই ভেঙে গিয়েছে, তারপর নতুনটি নির্মিত। সেটির বয়সও একশোর বেশি হবে। এখন হেরিটেজ পাওয়ার দৌলতে রক্ষণাবেক্ষণ হয়। আমি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গিয়ে দেখেছি, রোশনিবাগের সাদা রঙ চকচক করছে, বুঝলাম সদ্যই রঙ হয়েছে। জিনিসপত্রও কিছু পড়েছিল, বুঝলাম সংস্কারের কাজ হবে হয়তো। মসজিদের সামনে দেখলাম প্যান্ডেল করা। মানুষের আসা-যাওয়া বোঝা যায়। উদ্যানের গাছগুলোও সুন্দর করে কাটা। রোশনিবাগে কোনও টিকিট লাগে না। অবশ্য লাগবেই বা কেন, ভিতরে রয়েছে কেবল মসজিদ আর সমাধি, আর রয়েছে কয়েকটা গাছ দিয়ে গোছানো বাগান। কিন্তু প্রবেশ মূল্য না নিয়েও যে রক্ষণাবেক্ষণ চলছে দেখে ভালো লেগেছিল। গাইড দেখালেন ওখানে আরও একটি কবর আছে। সেটি সুজার দ্বিতীয় স্ত্রীর। (প্রথম স্ত্রী মুর্শিদকুলীর মেয়ে) নিখিলনাথ রায় তাঁর বইতে দ্বিতীয় কবরটির কথা উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেটা কার কবর তা লেখেননি।

এই কিরীটকণাতেই সিরাজ গড়ে তুলেছিলেন হীরাঝিল। মেসো নাওয়াজেসের মোতিঝিল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃত্রিম ঝিল খনন করে গড়েছিলেন প্রাসাদ। সেই প্রাসাদে থাকতেন সিরাজ। পলাশীর পর মীরজাফরের সিংহাসন আরোহণ হয়েছিল হীরাঝিলেই। তবে আজ আর হীরাঝিলের চিহ্ন মাত্র নেই। সব ভাগীরথীর পেটে চলে গিয়েছে। এখন টোটো চালকরা ভাগীরথীর তীর ঘেঁষা এক জায়গায় পর্যটকদের নিয়ে গিয়ে বলেন, ‘এখানে সিরাজ-উদ্-দৌলার প্রসাদ, হীরাঝিল ছিল’। এ’সব কিছুকে আমার নিছক ‘গপ্পো’ মনে হয়। কারণ হীরাঝিল পুরোটাই জলের তলায়, সেখানে এখন নদী বইছে। পর্যটন শিল্পের সুবিধার জন্য হয়তো নতুন জায়গাটির উৎপত্তি করেছিলেন কয়েকজন গাইড। এই হীরাঝিলও কিন্তু সম্প্রীতির ঐতিহ্য বহন করেছে, সিরাজ তাঁর বেগমদের নিয়ে এখানে হোলি খেলতেন, এমন দাবিও করেছেন ঐতিহাসিকরা। এদেশের মুসলমান শাসকরা যে হোলির রঙের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আজকের ভারত অনেকখানি বদলে গিয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদকে অস্বীকার করার নেশায় মশগুল একদল মানুষ। সেখানে দাঁড়িয়ে কিরীটেশ্বরীর সেরার শিরোপা জয়, ফের ভারতের বৈচিত্র্য ও আবহমান সংস্কৃতির ধারাকে শীলমোহর দিল। মুসলাম শাসকের আমলে সতীপীঠ পুরোদস্তুর মন্দির হয়ে ওঠে। শাক্ত মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন চৈতন্য ও তাঁর বৈষ্ণব মতাদৰ্শ, তারও আগেও বৌদ্ধ ধর্মদর্শন। কিরীটেশ্বরীর ভৈরবকে ধ্যানস্থ বুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হত। মুসলমান শাসকের আমলে তা হয়ে ওঠে তীর্থক্ষেত্র, মানুষজন পুজো দিতেন। পাশাপাশি তৈরি হয় মসজিদ, সেখানে লোকজন নামাজ পড়েন। নবাব প্রাসাদে হোলি খেলেছেন। এটাই তো ভারত, সব জাতির মহামিলন ক্ষেত্র। বৈচিত্রপূর্ণ ভারত, যেখানে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল, সেই ভারতের নির্যাস ধরা দিত কিরীটেশ্বরীতে। আজও তাই-ই দেয়। আমি কিরীটেশ্বরী গ্রাম ঘুরেছিলাম ইসমাইলের টোটোতে, দেখেছি সেও মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে কপালে হাত ঠেকিয়েছে। মনে মনে বলে উঠেছি সাব্বাস ভারত! 

তথ্যসূত্র: 
ক্ষেত্র সমীক্ষা
মুর্শিদাবাদ কাহিনি, মুর্শিদাবাদ ইতিহাস: নিখিলনাথ রায়
মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি: কমল বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি: সৌভিক রায়

Developed by DXDasia