সুব্রত মিত্র : ‘পথের পাঁচালি’র রূপকার, যাঁকে ছাড়া প্রাণ প্রতিষ্ঠা হত না সত্যজিতের সিনেমায়

ভারতীয় সিনেমায় বাউন্স লাইটের পথিকৃৎ

ছবি: সঞ্জীত চৌধুরী

শিল্পী হিরণ মিত্রের কাছে শোনা, ২০০১ বা ২০০২ সালে সিমা গ্যালারিতে ‘আর্ট অফ বেঙ্গল’ নামে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। দেখতে গিয়েছিলেন মৃণাল সেন, সুব্রত মিত্র। প্রদর্শনীর একটা দেওয়াল জুড়ে শুধুমাত্র হিরণ মিত্রের ছবি ছিল। সেই কাজগুলো দেখে খুব ভালো লাগে সুব্রতবাবুর। তিনি শিল্পীকে বলেন, আমি এই দেওয়ালটার কিছু ছবি তুলতে চাই কিন্তু এখানে ছবি তুলতে দিচ্ছে না। এ কথা শুনে হিরণ মিত্র প্রদর্শনীর দায়িত্বে ছিলেন এমন এক ব্যক্তিকে বলেন, এই এই ব্যাপার। সব শুনে সেই ব্যক্তি তাঁকে বলেন, “সুব্রত মিত্র কে?”

ব্যক্তিটির এহেন প্রশ্ন শুনে হিরণ মিত্রঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি ‘পথের পাঁচালি’ নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, তাঁর নাম শুনেছো?

ব্যক্তিটিঃ হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা শুনেছি…

হিরণ মিত্রঃ সত্যজিৎ রায়ের নাম শুনেছো?

ব্যক্তিটিঃ হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা শুনেছি…

হিরণ মিত্রঃ সত্যজিৎ রায় যে ‘পথের পাঁচালি’ বানিয়েছিলেন, সুব্রত মিত্র তাঁর সিনেমাটোগ্রাফার মানে রূপকার ছিলেন।

২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে কলকাতার মানুষ সুব্রত মিত্রের নাম শোনেননি, এ ব্যাপারটায় খুব আশ্চর্য হয়েছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। আর আজও আমরা আশ্চর্য হই সুব্রত মিত্রের মত একজন আলোকচিত্রীর স্বল্পপরিচিতি নিয়ে। অথচ মাত্র একুশ বছর বয়সে, কোনওরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই অথবা, শুধু স্থিরচিত্রের অভিজ্ঞতা নিয়েই, তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেই ছবির চিত্রগ্রহণের—যা বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে উঠবে, বিশ্ব জুড়ে হইচই শুরু হবে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ নিয়ে। প্রথমে নাকি এই ছবির চিত্রগ্রহণের দায়িত্ব পড়তে চলেছিল ছিন্নমূলখ্যাত নিমাই ঘোষ-এর কাঁধে। তিনি তামিল সিনেমার কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁর স্থান পূরণ করেছিলেন সুব্রত। ভাগ্যিস!

চারুলতা-র শুটিং-এ

‘পথের পাঁচালি’-তে কাজ করার আগে তিনি শুধুমাত্র স্থিরচিত্রগ্রাহক ছিলেন। বার্গম্যানের ক্যামেরা পরিচালক নিকভিস্ট ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় আলোকচিত্রী। বিশ্বখ্যাত চিত্রপরিচালক জঁ রেনোয়া যখন তাঁর ভাইপো প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ক্লোদ রেনোয়াকে নিয়ে ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিং করতে কলকাতা এসছিলেন, সুব্রত মিত্র তাঁদের শুটিং-এ ‘অবজার্ভার’ হিসেবে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন। সেখানে ছবি এঁকে এঁকে আলোর ব্যবহার, অভিনেতাদের চলাচল, ক্যামেরার অবস্থান সম্পর্কে অক্লান্ত নোট নিতেন। তাঁর সেই খাতাটি পরে ক্লোদ রেনোয়ার প্রয়োজন পড়েছিল লাইট কনটিউনিটির জন্য।

“ছবির পর্দায় এরকম দেখেছিস কখনও? এরকম মরা ব্যাঙ, জলের ওপর পোকা মাকড়ের খেলা, গ্রামের শুঁড়িপথ, কাশবন, অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়া রেলের লাইন—সবকিছু যেন জীবন্ত। তার চেয়েও জীবন্ত এই ছবির মানুষগুলো। এতকাল তো সিনেমার পর্দায় সাজা মানুষ দেখে এসেছি। নিজেও যা করেছি সব সাজা মানুষ। এই পথের পাঁচালি দেখিয়ে দিল আমরা কতটা ব্যাকডেটেড।” ‘পথের পাঁচালি’ দেখে এক বিশিষ্ট সাংবাদিককে এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন হাজারি ঠাকুরের ভূমিকায় মঞ্চ মাতানো বিশিষ্ট অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য। ভারতীয় দর্শকদের সিনেমা দেখার নতুন চোখ তৈরি করে দিয়েছিলেন সুব্রতবাবু।

ক্যামেরাম্যানই সিনেমার প্রথম দর্শক, সেকারণে তার দায়িত্ব একটু বেশিই। সেকথাটা সবসময় মাথায় রাখতেন। আলো ও ক্যামেরার মুগ্ধ প্রণয়ী ছিলেন। লুচিনো ভিসকন্তির সাদা-কালো ছবি ‘লা তেরা ত্রেমা’ (১৯৪৮) ও রঙিন ‘সেনসো’ (১৯৫৪) আর ভিত্তোরিয়ো দা সিকার ‘উমবের্তো ডি’-তে (১৯৫২) নবাগত ইটালিয়ান সিনেম্যাটোগ্রাফার জি আর আলডো প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট মাত্রার কৃত্রিম আলো যুক্ত করে অতিরিক্ত আলো বাউন্স অফ করিয়ে দিলেন। এই নিরীক্ষা বিষয়ে অবগত না থেকেও তরুণ সুব্রত মিত্র ডিফিউজ়ড লাইটিং-এর উদ্ভাবন করলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬) ছবিতে।  

সাইকোলজিক্যাল অ্যাপ্রোচ থেকে ক্যামেরাকে বোঝা, সকলের তো সেই বোধ থাকে না। সত্যজিতের ছবিতে সুব্রত মিত্রের অবদান অনস্বীকার্য। সত্যজিৎ রায় যেটা কখনো করেননি, জানতেন না, তা হল লাইটিং। লাইট ডিজাইন, ইন্টেন্সিটি, পজিশন সবটাই ক্যামেরাম্যান করে থাকে। এক্ষেত্রে সারা বিশ্বে সুব্রত মিত্রের ‘সেন্স অফ লাইটিং’ পড়ানো হয়, যেটা তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন সত্যজিতের ছবিতে। তিনিই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন (ভারতীয় চলচ্চিত্রে) বাউন্স লাইটিং-এর ব্যবহার। ‘চারুলতা’ ছবিতেও প্রচুর ক্যামেরা অপারেশন ছিল। বেশি ক্যামেরা অপারেশন থাকলে লাইটের ডিজাইনও পাল্টাতে থাকে। লাইট তো স্থির থাকে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে অবজেক্টের ওপর ফেলা হয়, সেখানে যদি মাল্টিপল অ্যাকশন বা মুভমেন্ট থাকে, তাহলে সেটা খুব মুশকিলের কাজ হয়ে দাঁড়ায়, ক্যামেরা অ্যাঙ্গল বদলাতে থাকলে আলোও বদলে যায়। অত্যাধিক মাল্টিপল মুভমেন্ট থাকার জন্য সত্যজিৎ বলেন যে, এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে লাইটের কন্ডিশনস এক থাকে। উপায় বের করলেন সুব্রত মিত্র। সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতিতে বাউন্স লাইট তৈরি করলেন। কয়েকটা সাধারন বাল্ব দিয়ে একটা বাক্স বানিয়ে নিলেন, তারপর তাতে ট্রেসিং পেপার লাগিয়ে ডিফিউজড-বাউন্স আলো তৈরি করলেন। চারুলতা যাঁরা মন দিয়ে দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন সারা সিনেমা জুড়ে কোনও ডিরেকশনাল আলো নেই, একটা নরম আলো ছিল সবসময়। কোথাও কোনও দৃশ্যে আলাদা ভাবে জরালো আলো এসে পড়ছে, এ দেখা যায় না। ছবির মুডের সঙ্গে এই নরম আলোটা একেবারে মানিয়ে যায়। এভাবেই জন্ম নেয় সুব্রত মিত্রের নিজস্ব ঘরানা।

‘চলচ্চিত্র অভিধান’ বইতে ব্রিটিশ সিনেমাটোগ্রাফার ডগলাস স্লকোম্বের (Douglas Slocombe) গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল। তিনি বলেছিলেন, “কয়েকজন চিত্রগ্রাহক আছেন যাঁর স্বতন্ত্র, যাঁরা ছবিতে ব্যক্তিত্ব আরোপ করে কিংবা বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য ট্রিটমেন্ট বদল করে যা আছে তার অতিরিক্ত কিছু সৃজনপারগ। যেমন জি ডবলিউ বিটজার, এলগিন লেসলি, চার্লস ল্যাং, হেনরি মিলার, গুণার ফিশার, কুতার, অঁরি দেকে, ক্রিস্টোফার ডয়েল, সুব্রত মিত্র প্রমুখ। দক্ষ ক্যামেরাম্যানের সংগ্রহে থাকে সেই সমস্ত প্রকৃত টেকনিক্যাল উপায় ও সম্ভাবনা যার সাহায্যে তিনি পরিচালকের বিমূর্ত ধারণাগুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। আর বড়ো ক্যামেরাম্যানদের এই দক্ষতা ছাড়াও থাকে টেকনিক্যাল উদ্ভাবনী শক্তি ও নিজস্ব শিল্পদৃষ্টি।”

লাইট ডিজাইনিং-এর সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা অপারেশনেও অদ্বিতীয় ছিলেন তিনি। টিল, প্যান বা অন্যান্য ক্যামেরা মুভমেন্টের ক্ষেত্রে তাঁর হাত নাকি মাখনের মতো চলত। এক্ষেত্রে ‘চারুলতা’রই একটা গানের দৃশ্য রচনার উল্লেখ করবো। ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারেই’ গানের দৃশ্যে একটা ‘জার্ক’ বা ঝাঁকুনি লক্ষ্য করা যায়। ছাত্র পড়ানোর সময় সুব্রতবাবু নিজেই বারবার বলতেন, “এটা আমার অপারেশন নয়, মানিকদার করা।” দুঃস্বপ্নেও ক্যামেরার কোনও কাজে তাঁর হাত কাঁপতো না, এ ছিল তাঁর আত্মগরিমা। আর হ্যাঁ, গানের ওই ‘জার্ক’-এর জায়গাটা সত্যিই সত্যজিৎ রায়ের নেওয়া শট ছিল।

চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ একবার এক আড্ডায় সুব্রত মিত্র প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “সুব্রতবাবুর কাছে ক্যামেরার লেন্স হচ্ছে স্বরলিপির নোট।”  তাঁর এই বিবৃতি এতটাই যথাযথ ছিল যে আজও গুণীমহলে তা সমাদর পায়। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে অপুত্রয়ীসহ দশটি ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন তিনি। একটা সময় আসে যখন তাঁর আর সত্যজিতের বিচ্ছেদ হয়। আলাদা করে কাজ শুরু করেন দেশে-বিদেশে। জেমস আইভরির সঙ্গে ‘শেক্সপিয়ারওয়ালা’, ‘দ্য গুরু’, বোম্বে টকি’ সহ আরও একটি-দুটি ছবি, তাং সু সুয়েন-এর সঙ্গে ‘দ্য আর্চ’, বাসু ভট্টাচার্যের ‘তিসরি কসম’ (১৯৬৫), রমেশ শর্মার ‘নিউ দিল্লি টাইমস’ সহ নানান কাজে জড়িয়ে থাকলেও সেভাবে জনসমক্ষে আসেননি তিনি। সেঅর্থে মূলস্রোতের জনপ্রিয়তা তাঁর কখনই তৈরি হয়নি। কিন্তু রতনে রতন তো চিনবেই! ইস্টম্যান কোডাক তাঁকে ১৯৯২ সালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কার দিয়েছিলেন। নিজ দেশে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার-টুরস্কার নিয়ে তাঁর মাথা ব্যথা ছিল না। চলচ্চিত্রবেত্তা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতে, “পথের পাঁচালিতে যখন অপু চোখ মেলল, তখন ভারতীয় সিনেমাও প্রথম দৃষ্টির ঐশ্বর্য খুঁজে পেল। ছায়াছবি যে মূলত ইমেজের, আর সেই ইমেজ যে মূলত আলোর মলাটে ধৃত দৃশ্যের প্রতিমা—এ কথা সুব্রত মিত্রের আগে কোনও বাঙালি সিনেমাটোগ্রাফার বুঝতে পারেননি—না প্রমথেশ বড়ুয়া, না নীতিন বসু।”

হিরণ মিত্রের করা সুব্রত মিত্রের পোর্টেট

৮৮-তে মহীনের গৌতম চট্টোপাধ্যায় একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন ‘লেটার টু মম’। সেখানে সুব্রত মিত্রের অরিফ্লেক্স ব্যবহার করা হয়েছিল, যে ক্যামেরাটা তাঁর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতো – যে ক্যামেরা দিয়ে তিনি ইতিহাস তৈরি করে গিয়েছেন। সুব্রত মিত্র যিনি কিনা ভারতীয় সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফিতে রেনেসাঁ এনেছিলেন, তাঁর একটি লেডিস সাইকেল ছিল। যাতে চেপে খাস দক্ষিণ কলকাতার বাসভবন থেকে অ্যাকাডেমি, নন্দন, কলকাতার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতেন। এতটাই নির্লিপ্ত ছিল তাঁর জীবন। সেকারণেই বোধহয় লোকে সেভাবে চিনলো না ধীর লয়ের মায়াবী আলোর পদপ্রান্তে বসে থাকা এই নিবিড় সাধককে, মনে রাখা তো দূরের কথা!

তথ্যসূত্রঃ

হিরণ মিত্র

আলো ক্রমে আসিতেছে, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় (www.filmfree.org)

Developed by DXDasia