‘আমাকে নিয়ে ভুল তথ্য চিত্রিত করা গ্রহণযোগ্য নয়’ – বলছেন ‘পথের পাঁচালি’র দুর্গা উমা সেন

‘পথের পাঁচালি’-তে দুর্গার নির্বাচন ছিল কীভাবে? অনীক দত্তের ছবি ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানান বিভ্রান্তি

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উমা সেন (ছবি সৌজন্যেঃ শ্রীময়ী সেন রাম)

সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) নির্মিত ‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali) হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত নিয়ে অনীক দত্ত (Anik Dutta) তৈরি করেছেন ‘অপরাজিত’ (Aparajito)। বহুকাল পর দর্শক হলমুখী হয়েছেন। নানান আলোচনা-সমালোচনা পার করে ইতিমধ্যেই কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করে সাড়া ফেলেছে এই ছবি। সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায়ের কাছ থেকেও এসেছে ভূয়সী প্রশংসা। ছবিটি দেখার পর একটি তাৎক্ষনিক রিভিউ করেছিলাম আমরাও। এখন মুক্তির বেশ কিছুদিন পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ‘পথের পাঁচালি’ নির্মাণে এই সমস্ত তথ্যগুলোই একমাত্র সম্বল। আর সেখানে ভ্রান্তি চোখে পড়লে প্রশ্ন তো উঠবেই। একটি ফেসবুক পোস্টে প্রশ্নটি তুলেছেন ‘পথের পাঁচালি’ ছবিতে দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করা কিংবদন্তি উমা সেনের মেয়ে শ্রীময়ী সেন রাম। সম্প্রতি ‘অপরাজিত’ ছবি দেখে আসার পর তিনি লেখেন, “আমার মা (উমা দাশগুপ্ত) স্কুল-থিয়েটারে নিয়মিত অভিনয় করতেন। তাঁর স্কুলের সহ-প্রধান শিক্ষিকা অপর্ণা সেন ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের পরিচিত। পরিচালকের নির্দেশে লেখক আশিস বর্মনের সহযোগিতায় পারিবারিক বাসভবনে আমার দাদু ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় (সর্বজয়া) এবং আমার মায়ের মধ্যে অসাধারণ মিল খুঁজে পান সত্যজিৎ রায়।”

কিন্তু অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’ ছবিতে দুর্গার চরিত্র নির্বাচনে এমন কোনো ঘটনার উল্লেখই করা হয়নি। বরং সেখানে দেখানো হয়েছে উমা সেন (Uma Sen) তাঁর মায়ের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গেছেন। চেহারা একটু বেশি শহুরে হয়ে যাওয়ায় প্রথমে পছন্দ হয়নি অপরাজিত রায়ের (সত্যজিৎ রায়ের আধারে নির্মিত চরিত্র)। কিছুক্ষণ পরে বিমলা রায় (বিজয়া রায়ের আধারে নির্মিত চরিত্র) সেই কিশোরীকে নিজের একটি শাড়ি পরিয়ে অপরাজিতর সামনে উপস্থিত করেন। এবং অপরাজিতর ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়।

‘পথের পাঁচালি’-র শুটিং (ছবি সৌজন্যেঃ শ্রীময়ী সেন রাম)

সত্যজিতের ছবিতে দুর্গা (Durga) চরিত্রে অভিনয় করা উমা সেনের মেয়ে শ্রীময়ী সেন আমাদের জানিয়েছেন, ‘অপরাজিত’ ছবিতে উল্লিখিত ঘটনাটি আমার মায়ের সঙ্গে অনেক পরে হয়েছিল। চূড়ান্ত নির্বাচনের সময় মা সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি যাননি। অনীক দত্তের (Anik Dutta) ছবিতে যা দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে অনেকটা ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অন্য এক বিখ্যাত অভিনেত্রীর নির্বাচন প্রক্রিয়ার মিল রয়েছে। শ্রীময়ী আমাদের জানান, “তখনকার দিনে স্কুলে পড়া এক কিশোরীর সিনেমায় অভিনয় করা রক্ষণশীল পরিবারগুলি ভালো চোখে দেখত না। এমনকি খুব একটা নাকি ‘সম্মানজনক’ও ছিল না। তাই অনেক বোঝানোর পর রাজি হয়েছিল আমাদের পরিবার। এবং আমার দাদু কিন্তু মায়ের অভিনয়ের জন্য সত্যজিৎ রায়ের থেকে একটা টাকাও নেননি। খুবই খারাপ লাগছে এই ঘটনার কোনোটাই অনীকবাবু দেখাননি। বরং ভুল তথ্য দর্শকদের উপস্থাপন করেছেন।”

কিন্তু কী ভাবছেন স্বয়ং দুর্গা? প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অভিনেত্রী উমা সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা। তিনি জানান, “মানিকদা এবং লেখক আশিস বর্মন আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন আমাকে দুর্গার চরিত্রে অভিনয়ের অনুমতি দেওয়ার জন্য। তখন বিজয়া রায় আমাদের বাড়ি আসেননি। আমার নির্বাচনের অনেক পরে আমি মানিকদার বাড়িতে যাই এবং বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু আমার চূড়ান্ত নির্বাচনের সঙ্গে বিজয়া রায় কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। তখন আমার ১৩ বছর বয়স। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। ভুল তথ্য চিত্রিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। দুঃখিত!”

দুর্গা চরিত্রে কিশোরী উমা দাশগুপ্ত (সেন)

এখানেই শেষ নয়। অনীক দত্তের ছবিজুড়ে আরও বেশকিছু বিভ্রান্তির কথা নজরে এনেছেন অনেকেই। সেই ‘খটকা’গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘পথের পাঁচালি’র সম্পাদক দুলাল দত্তের ভূমিকা। অনীক দত্ত দেখিয়েছেন, এডিটিং-এর সময় রাত জেগে কাজ করতে করতে ক্লান্ত এডিটর একটু ছুটি চাইছেন আর সত্যজিৎ তাঁকে যথাসম্ভব সাহায্য করছেন। কিন্তু সম্পাদক দুলাল দত্ত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দিনরাত কাজ করতে হবে ভেবে তিনি ঝোলায় করে সকাল সকাল তেল সাবান মাজন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তা দেখে রায় সাহেব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ কেউই ভাবতে পারেননি দিন-রাত এক করে কাজ হবে। শুধু কি তাই! সত্যজিৎ রায় সোসাইটি আয়োজিত ‘দ্য পেঙ্গুইন সত্যজিৎ রায় মেমোরিয়াল লেকচার’ (২৭ এপ্রিল ২০১৯, শিশির মঞ্চ)-এ পরিচালক তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar) বলেছিলেন দুলাল দত্তের কথা, ‘“দুলাল আমাকে বললেন, …একটা ছবির এডিটিং করছি আমি মাঝে মাঝে। ডিরেক্টর একেবারে নতুন। কিন্তু কী সমস্ত শট, কী সব কম্পোজিশন। দেখলে থ’ হয়ে যাবেন। দেখবেন না কি এক-আধটা রিল?’’ পরিচালক-সম্পাদকের সম্পর্ক বন্ধুত্বে না গড়ালে এত উৎসাহ কারোর মধ্যে থাকে না। সেটা দুলাল দত্তের মধ্যে প্রথম থেকেই ছিল। সত্যজিৎ রায়ের উৎসাহ অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু সম্পাদক দুলাল দত্তের ভূমিকাকে খানিক যেন খাটো করেই দেখানো হয়েছে ‘অপরাজিত’ ছবিতে।

মানিকদা এবং লেখক আশিস বর্মন আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন আমাকে দুর্গার চরিত্রে অভিনয়ের অনুমতি দেওয়ার জন্য। তখন বিজয়া রায় আমাদের বাড়ি আসেননি।  – উমা সেন

দুলাল দত্তের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও দুর্গা চরিত্রকে ঘিরে এ হেন ভুল তথ্য পরিবেশন সমর্থন করেননি অনেক দর্শক। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানান লেখালেখিও হচ্ছে নিয়মিত। আমরা অভিনেত্রী উমা সেনের (দুর্গা) সঙ্গে এ বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা বলি। তাঁর বয়ান হুবহু এখানে দেওয়া রইল –

উমা সেন বর্তমানে…

“সত্যজিৎ রায়ের টিম বিভিন্ন স্কুলে এক উপযুক্ত কিশোরীর খোঁজ করছিলেন দুর্গা চরিত্রের জন্য। আমি তখন ভবানীপুরের বেলতলা হাইস্কুলে পড়তাম। আমাদের সহ-প্রধান শিক্ষিকা অপর্ণা সেন আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কারণ তখন আমি পড়াশোনার পাশাপাশি নাটক করতাম। মানিকদা এবং অপর্ণাদির পরিচিত বন্ধু-লেখক আশিস বর্মন (মৃণাল সেনের বিখ্যাত ছবি ‘আকাশ কুসুম’ তাঁরই লেখা) আমাকে স্কুলে দেখে পছন্দ করেছিলেন। মানিকদাকে নিয়ে আশিসবাবু একদিন আমাদের বাড়িতে এলেন। ভেবেছিলাম নাটকে অভিনয়ের জন্যই আমাকে পছন্দ হয়েছে, সেইমতো বাবার সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। আমার এখনও মনে আছে, একটা ফ্রকের সঙ্গে মুক্তোর মালা পরেছিলাম। মানিকদা বললেন, একি! এসব মুক্তোর মালা চলবে না। পরে বাবা যখন শুনলেন আমার নির্বাচন আসলে একটা সিনেমার জন্য, তখন ভীষণ আপত্তি জানালেন। বললেন, আমরা সাধারণ ঘরের মানুষ। আমার মেয়ে ফিল্ম করবে না। মানিকদা কিছুতেই শুনলেন না। আমাকে এতই পছন্দ হয়েছে যে, বাবাকে অনেক অনুরোধ করে রাজি করালেন। টাকাপয়সার প্রশ্ন উঠলে বাবা বললেন, সেকি! আমার মেয়ে সিনেমা করবে আর আমি পয়সা নেব? অসম্ভব। মানিকদা সেটা শুনে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। কারণ পথের পাঁচালি তৈরির জন্য মানিকদার আর্থিক অবস্থাও সে সময় ভালো ছিল না।

এই সিনেমায় নির্বাচনের আগে আমি কখনোই মানিকদার বাড়িতে যাইনি। শুটিং চলাকালীন বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার নির্বাচনের অনেক পরে মানিকদার বাড়িতে যাই এবং বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়। মনে আছে, মানিকদা ট্রামে করে ওঁর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন একবার তাঁর শাড়ি পরিয়েছিলেন আমাকে। কিন্তু আমার চূড়ান্ত নির্বাচনের সঙ্গে বিজয়াদি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। যদিও তারপর বিজয়া রায় এবং মানিকদার মা সুপ্রভাদেবীর সঙ্গে এত ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল যে, শুটিংয়ের পর আমি মানিকদার বাড়িতে যেতাম। বিজয়া রায় রান্না করে খাওয়াতেন। এতটাই যত্ন, আদর আমি তাঁদের থেকে পেয়েছি।

আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব সকলের মুখে যখন শুনলাম ‘অপরাজিত’ ছবিতে আমাকে নিয়ে খানিকটা ভুল তথ্যই পরিবেশন করা হয়েছে, খুব দুঃখ পেয়েছি। তাছাড়া এ নিয়ে দীর্ঘ বছর আমি একাধিক লেখালেখি করেছি। প্রচুর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। অনীক দত্তের মতো পরিচালকের থেকে এই ভুল আশা করা যায় না।”

‘পথের পাঁচালি’-র টিম (ছবি সৌজন্যেঃ শ্রীময়ী সেন রাম)

‘অপরাজিত’ ছবি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সত্যজিৎ-পুত্র পরিচালক সন্দীপ রায় (Sandip Ray)। তাঁর অনুমতি ছাড়া এ ছবি হওয়া অসম্ভব ছিল। তাঁর নির্দেশেই ছবিতে চরিত্রদের নাম পাল্টে দেওয়া হয়। অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় থেকে অপরাজিত রায়, দুর্গা থেকে উমা, বিধান রায় থেকে বিমান রায় ইত্যাদি। যদিও ‘পথের পাঁচালি’-তে দুর্গা চরিত্রের নির্বাচন আসলে কীভাবে হয়েছিল, অনীক দত্তের ছবিতে তার তথ্যগত ভুল আছে কিনা, সে নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি কোথাও।

আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব সকলের মুখে যখন শুনলাম ‘অপরাজিত’ ছবিতে আমাকে নিয়ে খানিকটা ভুল তথ্যই পরিবেশন করা হয়েছে, খুব দুঃখ পেয়েছি। ছবিটা বানানোর আগে একবার তো আমাকে ফোন করতে পারতেন অনীকবাবু। – উমা সেন

অনীক দত্তের উমা (দুর্গার আদলে নির্মিত চরিত্র)

অনীক দত্তের ছবিতে এই তথ্যগুলি দীর্ঘ পরিসরে দেখানো খুব জরুরি ছিল না, এ কথা ঠিক। কিন্তু যে দৃশ্যগুলি দেখানো হয়েছে, সবই আজ ইতিহাস। তথ্যে সামান্য গলদ থাকলেও তখন তা চোখে পড়ে। বিশেষ করে যে বা যাঁরা ‘পথের পাঁচালি’-র নির্মাণ নিয়ে কোনো বই পড়েননি বা জানেন না, যাদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের সংখ্যাই বেশি, প্রত্যেকের কাছেই সামান্য কোনো তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে কিনা তা দেখা গবেষকদের জরুরি কাজ। ‘পথের পাঁচালি’-র নির্মাণের ইতিহাস নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে, যেমন- সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর পাঁচালি’ (Apur Panchali), ‘মাই ইয়ারস উইথ অপু’ (My Years With Apu), মেরী সিটনের ‘দ্য পোর্ট্রেট অফ এ ডিরেক্টর’ (The Portrait of a Director), বিজয়া রায়ের ‘আমাদের কথা’ (Amader Katha)। সেই বইগুলি পড়লেই জানা যাবে সমস্ত তথ্য এবং ঘটনা পরম্পরা। মনে রাখতে হবে, অনীক দত্ত ছবি বানিয়েছেন ‘পথের পাঁচালি’-র নির্মাণের উপর, সেখানে অন্যতম বড়ো ভূমিকা রয়েছে চরিত্র নির্বাচন প্রক্রিয়ার। দুর্গারূপী উমা সেন (Uma Sen) এখনও জীবিত। সুতরাং তাঁর সঙ্গে কথা বললে বিষয়টি অনেক সহজ হতে পারত। যদিও সামাজিক মাধ্যমের আরেকটি অংশের দর্শক অন্য সুরে কথা বলছেন। তাঁদের মতে, ‘অপরাজিত’ সত্যজিৎ রায় দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি কাল্পনিক কাহিনি। চরিত্র নির্বাচন থেকে ১৯৫৫-র মতো সেট ডিজাইন – অনীক দত্ত আশ্চর্যজনকভাবে কাজ করেছেন। তাঁরা মনে করছেন তারিখ বা আসল ঘটনার কথা বিচার না করে মুক্ত মন নিয়ে এই ছবিটা দেখতে। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে সিনেমার প্রয়োজনে ইতিহাস পাল্টে যাবে? এই ধরনের সিনেমা দেখে যাঁরা তথ্য সংগ্রহ করেন বা জ্ঞানার্জন করেন, তাঁদের কাছে কি ভুল বার্তা পরিবেশিত হচ্ছে না?

পথের পাঁচালির শুটিং ও অন্যান্য ছবি সৌজন্যেঃ উমা সেন, শ্রীময়ী সেন রাম

Developed by DXDasia