রান্নার স্বাদ আনতে মশলার জুড়ি মেলা ভার
যে কোনও রান্নার একটি অন্যতম উপাদান হলো মশলা। মশলার রকমফেরে আর পরিমাণের তারতম্যেই খাবারের স্বাদবদল ঘটে। সঠিক মশলার ব্যবহার রান্নার ভোলই পাল্টে দেয়। সঠিক পরিমাণে মশলার ব্যবহার চিনিয়ে দেয় রাঁধুনির জাত। সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক জায়গাতেই রান্নাতে মশলার ব্যবহার প্রসিদ্ধ। আমাদের দেশে আর আমাদের রাজ্যে তো বটেই। বিশুদ্ধ মশলা দিয়ে রান্না করা খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়, স্বাস্থ্যকরও বটে। বহু আগে মানুষের হাতে যখন পর্যাপ্ত সময় ছিল, রান্নায় ব্যবহার করা হত বাটা মশলা, পাঁচফোড়নের মতো মশলা অনেকে বাড়িতেই বানিয়ে ফেলতেন। তারপর এলো রেডিমেড মশলার যুগ। আরও কিছু পরে রেডিমেড মশলা কৃত্রিম বা ভেজাল হয়ে উঠতে শুরু করলো। আবার ভাববেন না যেন বাজার চলতি সব গোটা বা গুঁড়ো মশলাতেই গলদ আছে। সচেতন ক্রেতা হলে খুঁজলে ঠিকই পাবেন ভেজালহীন মশলা। হলুদ গুঁড়ো (Turmeric Powder), লঙ্কা গুঁড়ো (Red Chilli Powder), গোটা ধনে/জিরে (Jeera/Coriander Whole), গুঁড়ো ধনে/জিরে (Jeera/Coriander Powder), সরষে (Mustard Seeds), পাঁচফোড়ন (Paanch Phoron), রাঁধুনি (Radhuni)- সারা ভারতে চল্লিশেরও বেশি রকমের মশলা (Spice) ব্যবহার করা হয়। মশলাগুলি সবই কোনও না কোনও উদ্ভিদের অংশ।

শুধু খাবারের স্বাদবৃদ্ধিই নয়, প্রতিটি মশলার আছে নিজস্ব স্বাস্থ্যগুণ। সর্দি-কাশিতে হলুদের বা গরম আদা-চায়ের ব্যবহার তো সব বাঙালি বাড়িতেই বহুল প্রচলিত। এছাড়া শরীরের কোনও অংশে আঘাত লাগলে সেখানে চুন-হলুদ লাগানোর রেওয়াজ অনেকদিনের। হলুদে থাকা কারকিউমিন রাসায়নিকটি সর্দি-কাশি কমাতে ও রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জিরেতে আছে আয়রন, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়ামের মতন বহু উপকারী যৌগ। আছে ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স। পেটব্যথা, বদহজম, শরীরের ওজন কমানো, জিরের উপকারিতা অনেক। বিষাক্ততা রোধকারী অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিসেপটিক পদার্থে ভরপুর ধনেপাতা ত্বকের শুষ্কতা কমাতে এবং ত্বকের ফাঙ্গাল ইনফেকশন কমাতে খুবই কার্যকরী। সরিষায় আছে ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম। সরিষা খেলে কমে রক্তচাপ, মাইগ্রেনের মতো রোগ। ক্যান্সার প্রতিরোধেও সরিষা কার্যকরী।
বাংলাতে হলুদের চাষ হয় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরে। জিরে চাষ করা হয় বাঁকুড়াতে। এটি একটি রবি শস্য, যা চাষ করা হয় খুব কম জলে। ধনে চাষ করা হয় বাঁকুড়াতে। এর বীজ রোপণ করা হয় শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে। ফসল তোলা হয় প্রায় দশ সপ্তাহ পরে।
মশলার স্বাস্থ্যগুণ অনস্বীকার্য, কিন্তু অনেকক্ষেত্রে বেশি মুনাফার লোভে মশলাতে মেশানো হয় বিভিন্ন ধরনের ভেজাল। অতিরিক্ত রং, ঝাঁঝ ও গন্ধ আনার জন্য ব্যবহার করা হয় কেমিক্যাল। মেশানো হয় কাঠের গুঁড়ো, ইঁটের গুঁড়ো, ধানের তুঁষ ইত্যাদি। এর ফলে স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। হতে পারে ক্যান্সার, কিডনি এবং যকৃতের রোগ। তাই ক্রেতাদের উচিৎ আরও সচেতন হওয়া।
দ্য বেঙ্গল স্টোরের (The Bengal Store) এক কর্মী জানালেন, “আমরা বাঁকুড়ার শান্তিপুরের চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি মশলা কিনি। এই মশলা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত, কারণ শুধুমাত্র গোবর সার ব্যবহার করে চাষ করা হয়। আমরা কেনার পর খড়গপুর আইআইটির পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়ে নিই। ক্রেতারাও চাইলে ব্যক্তিগত ভাবে বাড়িতে বা যেকোনও পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারেন। এই মশলা গুণগত মানে সর্বোৎকৃষ্ট।”

রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, খাদ্যে ভেজাল মেশানো সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য সমাজবিরোধী কাজ। ভেজালের বহু পুরোনো ইতিহাস আছে। শুধু মশলা নয় কৃত্রিম রং করা যে কোনও খাবারই পারলে এড়িয়ে চলুন। কিন্তু, এইসব রং-অ্যাসিড আসছে কোথা থেকে? কে দিল এসব ব্যবহারের অনুমতি? ১৯৫৪ সালে যে ‘খাদ্যে ভেজাল নিরোধক আইন’টি তৈরি হয়, পরবর্তীতে তার সংশোধন করা হয় বেশ কয়েকবার। সংশোধনের পর ১৯৯৭ সালে ভারত সরকারের ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ফুড)–এর এক নির্দেশনামা মাফিক নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্যে ৮টি কৃত্রিম রং ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত রংগুলি কোনওভাবেই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। এর মধ্যে হলুদ রঙের জন্য ব্যবহৃত সানসেট ইয়েলো, টারট্রাজিন অথবা লাল রঙের জন্য ব্যবহৃত কারমোসিন শরীরের হজমশক্তি কমিয়ে দেয়। তাই, আমাদেরই ঠিক করতে হবে কী খাবো, কী খাবো না। ভেজাল খাবেন না খাঁটি, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কিন্তু একমাত্র ক্রেতাদের হাতেই। অভিনেত্রী-সমাজসেবক এমা ওয়াটসন একবার বিবৃতিতে বলেছিলেন, “As consumers, we have so much power to change the world by just being careful in what we buy.”।
*দ্য বেঙ্গল স্টোরের গুঁড়ো ও গোটা মশলা কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।