অযোধ্যার কোলে সহজ শান্ত গ্রাম চড়িদা, রাস্তার দুই ধারে সারি সারি মুখোশের দোকান
বাংলার নিজস্ব নৃত্য-শিল্প ছৌ। আজ যা আর শুধুমাত্র এই বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বে। ছৌ নাচের পোশাক থেকে মুখোশ, এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে শিল্পীদের নাম, কেমন আছেন তাঁরা? বিশেষত এই কঠিন মহামারীতে? ঠিক এই মুহূর্তে সেই মুখোশ-গ্রামের পরিস্থিতি কীরকম? ২০২০ সালে ছৌ নাচের মতো বিষয় যখন অসংখ্য গবেষকদের গবেষণার বিষয়, প্রত্যেকের কাজের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য, তখন অর্থকষ্টে ভুগছেনই বা কেন ছৌ শিল্পীরা! অবশ্যই একটি নজরকাড়া বিষয়।

মূলত এই পোশাক এবং মুখোশ তৈরি করা হয় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করে। ছৌ নাচের পালায় উঠে আসে মহিষাসুরমর্দিনী, রামায়ণ, মহাভারত এমনকি শিব-পার্বতীর কাহিনি। কখনও এই নৃত্য প্রকরণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় দেবতাদের নিছক দেবতা না দেখিয়ে, তাঁদের মনুষ্যরূপ। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ছাড়াও ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশায় ছৌ বিখ্যাত। তবে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে মুখোশ ব্যবহৃত হয় না। মুখোশের জন্য বিশিষ্টতা অর্জন করেছে পুরুলিয়া। এই গল্প একটি মুখোশ তৈরির গ্রামের। বিভিন্ন পৌরাণিক দেব-দেবী ছাড়াও বর্তমানে ছৌ-এর মধ্যে মিশে গেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী। যেমন কথাকলি, মণিপুরী, ওড়িশি, কুচিপুরীর মতো নাচের মুখোশও এখন নির্মাণ করছেন শিল্পীরা।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে অনেকদিন পর গিয়েছিলাম পুরুলিয়ার চড়িদায়। অযোধ্যার কোলে সহজ শান্ত একটি গ্রাম চড়িদা। বাঘমুন্ডি থানার অধীন এই গ্রাম একসময় ছিল মাওবাদীদের ঘাঁটি। গ্রামে ঢোকার মুখেই দেখা যাবে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি অসংখ্য মুখোশের দোকান। কেউ মুখোশে সবে রং দিচ্ছেন, কেউ চোখ আঁকছেন, বছর দশেকের ছেলেটিও সাজ বসাচ্ছে মুখোশে। তাঁদের এই ব্যবসা বংশ পরম্পরায়। মুখোশ বর্তমানে আর শুধুমাত্র নাচেই ব্যবহৃত হয় না, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ঘর আলো করা ড্রয়িংরুমে শোভা পায় চড়িদার মুখোশ। এই এলাকায় একসময় ব্যবসায় ভাটা পড়ছিল।

শুধুমাত্র ‘লোক’ শিল্প হিসাবেই তা জনশ্রুত ছিল। ছৌ নাচ হয়ে উঠেছিল এই বিশ্বের শুধুমাত্র একটি ফ্যান্টাসির জায়গা। চরম অর্থ সংকটের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলেন এখানকার বিখ্যাত শিল্পীরা। পরিস্থিতির বদল এল বর্তমান রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে। ছৌ শিল্পীদের ভাতার ব্যবস্থা করল রাজ্য সরকার। প্রতি মাসে এক হাজার টাকা। ফলে ছৌ-এর দল বেড়েছে। ‘লোক’-এর গায়ে বসেছে নতুন পালক ‘আন্তর্জাতিক’।

প্রায় একশোর উপর পরিবার ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি করে। শিল্পীর সংখ্যা প্রায় চারশতাধিক। সূত্রধর সমিতির ছৌ মুখোশ শিল্পী সংঘ ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন শিল্পীদের নিয়ে মুখোশ তৈরির কাজে ব্যস্ত আছেন। সেখানকার দোকানে গেলেই বোঝা যাবে, ছৌ নাচ এখন আর শুধুমাত্র মহিষাসুরমর্দিনী পালাতেই সীমাবদ্ধ নেই; গণেশ, কার্তিক, ময়ূর, রাক্ষস-খোক্ষস, কালী, সীতা, রাবণ কতরকমের মুখোশই না আছে এই দোকানে। পাওয়া যাবে আদিবাসীদের প্রচলিত নানা কাহিনির সঙ্গে জড়িত মুখোশও।

শীতের মরশুমে ভিড় করেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকরা। নভেম্বর, ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি – এই তিনটে মাস তাঁদের রোজগারের জন্য চেয়ে থাকা।

আমরা ছৌ নাচের সঙ্গে সঙ্গে ছৌ নৃত্যশিল্পীদের গুরুত্ব দিই। কিন্তু ভুলে যাই এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মুখোশ ও পোশাক তৈরি করা শিল্পীদের। এখনও যাঁদের ঘরে গেলে দেখা যায় একটা সরু বিছানা আর কিছু ঘটি-বাটি ছাড়া বিশেষ কিছু নেই, আছে শুধু নানান রকমের হাজার হাজার মুখোশ। তাঁরা কি উপযুক্ত সম্মান পাচ্ছেন? এই বহু বিস্তৃত ইতিহাসের সঙ্গী তাঁরাও। চড়িদার এই ‘অখ্যাত’ শিল্পীদের ভুলি কী করে!
*নিজস্ব চিত্র
