বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত উদযাপন : শহরে সারাদিনব্যাপী মাস্টারক্লাস, সিনেমা দেখা, সিনে-আড্ডা

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্টের বার্ষিক অনুষ্ঠান

শরীরে না থাকলেও বুদ্ধদেব থেকে গেছেন তাঁর কবিতা ও সিনেমার বিমূর্ত ল্যান্ডস্কেপের ভেতর, নিয়মহীন অসম ভালোবাসার ভেতর, যন্ত্রের অযান্ত্রিকতার ভেতর, গাছেদের বন্ধুতার ভেতর, অন্ধকারে আলো হয়ে থাকা স্বপ্নগুলোর ভেতর– যে স্বপ্নের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এভাবে তাঁর থেকে যাওয়া বিশ্বজুড়ে কতশত মানুষকে অনুপ্রেরণা আর সাহস জুগিয়ে চলেছে। “যখন তাকিয়ে থাকি, তোমার হাত দুটোকে মনে হয় ডানা।/ যখন তাকিয়ে থাকি আমার পায়ের দিকে/ বেঁকে, পাখার মতো ছড়িয়ে যায় পা।/ আর মাথার ওপর দিয়ে কেবলই উড়ে যায় একটা উড়ো-জাহাজ …” এ শুধু বুদ্ধদেবের কবিতা নয়, সিনেমা নয় – তাঁর জীবন। এই উড়োজাহাজটিকে আজীবন যত্ন করেছেন কবি-পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। এই জীবনদর্শনকে পাথেয় করেই, প্রয়াণের তিন বছরে শহরে সারাদিনব্যাপী উদযাপিত হতে চলেছেন সিনে-মায়েস্ত্রো বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত এবং ফোরাম ফর ফিল্ম স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যালায়েড আর্টস-এর সহযোগিতায় এই স্মরণ-অনুষ্ঠানে আলোচিত হবে বুদ্ধদেবের জীবন ও কাজের নানা দিক। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন বুদ্ধদেবের সমসাময়িক বিশ্বখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ এবং সুদক্ষ অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী জয়া শীল ঘোষ।

অনুষ্ঠানসূচিতে থাকছে সিনেমাটোগ্রাফার অসীম বোসের মাস্টারক্লাস। ‘উত্তরা’ ছাড়াও বুদ্ধদেব পরিচালিত ‘টোপ’ (২০১৬) এবং ‘উড়োজাহাজ’ (২০১৮)-এ তাঁর কাজ মনে রাখার মতো, তদুপরি শিক্ষণীয়।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমার অন্যতম বিশেষত্ব সিনেমাটোগ্রাফি। তাঁর যুগান্তকারী ছবি ‘উত্তরা’-র (২০০০) কথাই ধরা যাক। উঁচু টিলার উপর কুস্তি লড়া দুটি চরিত্র এবং খানিক নিচে রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে হেঁটে চলা লোকশিল্পীদের দল। দুটি ভিন্ন ঘটনা জুড়ে যাচ্ছে একটাই দৃশ্যে। দ্বিমাত্রিক স্তরের এ ভাষা বুদ্ধদেবের নিজের, যাকে ক্যামেরার ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক, অধ্যাপক অসীম বোস। এ ছবির অবাক করা ল্যান্ডস্কেপ, একাকিত্বের শব্দহীন বাঙ্ময় থেকে ঘোর কাটে না। অনুষ্ঠানসূচিতে থাকছে সেই অসীম বোসের মাস্টারক্লাস। ‘উত্তরা’ ছাড়াও বুদ্ধদেব পরিচালিত ‘টোপ’ (২০১৬) এবং ‘উড়োজাহাজ’ (২০১৮)-এ তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি মনে রাখার মতো, তদুপরি শিক্ষণীয়।

‘উত্তরা’-র দৃশ্য

বুদ্ধদেবের সিনেমায় আবহ ও লোকগান প্রয়োগের দিকটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এখানেও এসে পড়বে উত্তরা-র প্রসঙ্গ। এ ছবির জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পেয়েছিলেন পরিচালক। উত্তরা-র আবহ করেছিলেন অভিজিৎ বসু, যিনি সুর ভাঁজার কায়দায় মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন নিখাত মাটির ঘ্রাণ, যা ফিকে হয় না, পোঁছে যায় হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেজন্যই তো ‘কালো জলে কুচলা তলে’, ‘ফুল গাছটি লাগাই ছিলাম’-এর মতো বাংলার নির্ভেজাল লোকগান আন্তর্জাতিক পরিসরে এমনকি এ প্রজন্মের মননেও পৌঁছে গিয়েছে। বুদ্ধদেবের স্মরণ-অনুষ্ঠানে এই সবকিছু নিয়েই আলোচনা করবেন অভিজিৎ বসু।

‘টোপ’-এর দৃশ্য

এছাড়াও থাকছে বুদ্ধদেব পরিচালিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘টোপ’ (২০১৬)। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের সূত্র ধরে বুদ্ধদেব ফের ফিরেছিলেন তাঁর প্রিয় লোকেশন পুরুলিয়ায়। বুদ্ধদেবের ছবি আর পুরুলিয়ার নিসর্গ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে এই ছবিতেও। আন্তর্জাতিক স্তরে বহু সমালোচিত ছবিটি টরোন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, বুসান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, লন্ডনের বিএফআই-তে প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিটি ফের একবার বড়োপর্দায় দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে এই অনুষ্ঠান।

উল্লেখ্য, মাস্টারক্লাসের জন্য ইতিমধ্যেই সমস্ত সিট পূর্ণ হয়ে গেছে। ৬ জুলাই, শনিবার, নন্দন-৩ প্রেক্ষাগৃহে, অন্যান্য দর্শকরা বিকেল ৪টে থেকে প্রেক্ষাগৃহে ঢুকতে পারবেন। প্রবেশ অবাধ।

Developed by DXDasia