প্রাচীন ইতিহাস আজও কথা বলে বিষ্ণুপুর জাদুঘরে

বাঁকুড়া জেলায় শিল্প এবং প্রত্নতত্ত্বের একমাত্র সংগ্রহশালা

জোড় বাংলা মন্দির থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার এবং বিষ্ণুপুর বাস স্টেশন থেকে মাত্র ২ কিলোমিটারের মধ্যে পাবেন আশ্চর্য এক বাড়ি – বিষ্ণুপুর মিউজিয়াম। ঠিকানা দলমাদল পাড়া। কাগজে কলমে নাম ‘আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন’।  নাম যাই হোক না কেন, বিষ্ণুপুরে গেলে একবার ঢুঁ মারতেই হবে এখানে। বাঁকুড়া জেলায় শিল্প এবং প্রত্নতত্ত্বের একমাত্র সংগ্রহশালা এটি। এবং এখনও চলমান। শেষ ভাস্কর্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছে চলতি বছর, মার্চের ৫ তারিখ, দ্বারকেশ্বর নদের তীরে পাত্রসায়র থানা এলাকায় নালিচা গ্রামের এক পুরোনো মন্দিরের কাছে।

জাদুঘরের প্রবেশপথ

দ্বারকেশ্বরের উৎপত্তি হয়েছে পুরুলিয়ায়। ছাতনার গা ঘেঁষে বাঁকুড়ায় ঢুকে পড়েছে। বিচিত্র সব প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার হয় এই নদ থেকে। ২০০৬ সালে অযোধ্যা গ্রামের কাছে দ্বারকেশ্বর থেকেই পাওয়া গিয়েছিল প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ বা আদিনাথের মূর্তি। বেশ কিছু হিন্দু এবং বৌদ্ধ ভাস্কর্যও মিলেছে। বাঁকুড়া হয়ে দ্বারকেশ্বর বয়ে যায় পূর্ব বর্ধমান এবং হুগলি জেলায়। পশ্চিম মেদিনীপুরে ঘাটালের কাছে গিয়ে শিলাই নদীতে মিশে রূপনারায়ণ নামে প্রবাহিত হয়। শেষ পর্যন্ত হুগলি নদীর সঙ্গে মিলিত হয় হাওড়ার গাদিয়ারায়। 

বিষ্ণুপুর মিউজিয়ামের বর্তমান কিউরেটর তুষার সরকার জানালেন, ১৯৫১ সালে এই সংগ্রহশালার যাত্রা শুরু হয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগে। স্থানীয় কিছু উৎসাহী মানুষ, যেমন বিষ্ণুপুর হাইস্কুলের শিক্ষক মানিকলাল সিংহ, এবং চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো তাঁর কয়েকজন সহকর্মী প্রথম কোমর বেঁধে লেগেছিলেন। নানা জায়গায় থেকে তাঁরা জোগাড় করতেন প্রত্নবস্তু। ইতিহাসপাগল লোকেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকেও মিউজিয়ামের জন্য জিনিসপত্র নিতেন। অবশ্য বড়ো বড়ো প্রত্নসামগ্রী নিয়ে চলে যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডাইরেকটরেট অফ আর্কিওলজি অ্যান্ড মিউজিয়ামস। 

এখন সংগ্রহশালায় রয়েছে প্রায় ৫ হাজার প্রাচীন পুঁথি। ‘চৈতন্য চরিতামৃত’, ‘মদনমোহন বন্দনা’ এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রের নানা দুষ্প্রাপ্য পুঁথি পাওয়া যাবে। একশোর বেশি পুঁথি মিলবে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর। ব্রিটিশ ইতিহাসের অবশিষ্টাংশ, বস্ত্রশিল্পের সংগ্রহ, ফটোগ্রাফ, আদিবাসীদের হস্তশিল্পও রাখা আছে। পাবেন মাইক্রোলিথিক, মনোলিথিক, চালকোলিথিক যুগের সামগ্রী, কুষাণ, শুঙ্গ, গুপ্ত, পাল আমলের মুদ্রা এবং শিল্পবস্তু, প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাঁকুড়ায় গড়ে ওঠা মানব সভ্যতার নানা চিহ্ন।

একটি সম্পূর্ণ গ্যালারি উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলার একমাত্র মার্গ সংগীতের ধারা বিষ্ণুপুর ঘরানাকে। গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সমকালীন নক্ষত্র গায়কদের ব্যবহার করা বাদ্যযন্ত্র দেখতে পাবেন। সেসবের আজ বেশিরভাগই লুপ্ত। 

বিষ্ণুপুর থেকে মোটামুটি ৮ কিলোমিটার দূরে কানা নদীর ধারে দিহড়ে পাওয়া গিয়েছে প্রায় ৩২০০ বছর আগের সামগ্রী। বাংলায় মানুষের বসবাস শুরু হওয়ার অন্যতম প্রমাণ। প্রাক-ইতিহাস, আদি-ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক যুগের নানা স্তরের সাক্ষ্য দেয়। সেইসব দুর্লভ জিনিসপত্র দেখতে পাবেন সংগ্রহশালায়। তুষারবাবু জানালেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ধারাবাহিক খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করার আগেই সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতারা সেখান থেকে প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করতে থাকেন। খুঁজে পাওয়া বেশিরভাগ সামগ্রী আজও রয়েছে বিষ্ণুপুর সংগ্রহশালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্থান পেয়েছে খনন করে পাওয়া সামগ্রী।

টেরাকোটা মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর

তুষার সরকার বললেন, “এক ঝলকে বাঁকুড়া জেলার সমস্ত ইতিহাস আপনি দেখতে পাবেন সংগ্রহশালায়। শুশুনিয়া পাহাড় থেকে পাওয়া কিছু সামগ্রীও রয়েছে। পাবেন ইতিহাসের নানা যুগের সংস্কৃতির পরিচয়। যেমন ধরুন, মহাবীর (জৈনদের ২৪তম তীর্থঙ্কর) এই অঞ্চলে আসেন খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক নাগাদ। স্থানীয় লোকেরা সন্দেহের বশে তাঁর দিকে কুকুর লেলিয়ে দেয়। কিন্তু এখান থেকে যথেষ্ট সংখ্যক জৈন মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। যার মাধ্যমে বোঝা যায়, এই এলাকায় ‘আর্যায়ন’ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।”

কীভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে ৪-৫ ঘণ্টা ড্রাইভ করে বিষ্ণুপুর পৌঁছনো যায়। ট্রেনে গেলে ৩ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। এসপ্ল্যানেড থেকে বাস ধরেও যেতে পারেন। পৌঁছে যাবেন ৪ ঘণ্টায়। এখনও কোভিডের সংক্রমণ থামেনি। তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নিয়ে নিন, পরিবহনে করোনা স্বাস্থ্যবিধি ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কিনা।

বিষ্ণুপুর ট্যুরিজম প্রপার্টি 

কোথায় থাকবেন

কয়েকদিন স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবেন পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব বিষ্ণুপুর ট্যুরিজম প্রপার্টি (পূর্বতন বিষ্ণুপুর ট্যুরিস্ট লজ)-এ। থাকা-খাওয়ার আরামদায়ক বন্দোবস্ত রয়েছে। বুকিং এবং অন্যান্য তথ্যের জন্য +91 97321 00950 নম্বরে ফোন করুন। অথবা মেল করুন bishnupurtl@gmail.com-তে।  বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন –
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
 

Developed by DXDasia