ভোলানাথ পাল পেশায় কৃষিজীবী ও রেশন দোকানের কর্মচারী
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/ আসে নাই কেহ অবনী পরে/ সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে…”
কামিনী রায়ের এই কবিতা আমরা সকলেই পড়ে বড়ো হয়েছি। কিন্তু কজনই বা এই কবিতার মর্মার্থ বুঝি? বা বুঝলেও কজন এই কবিতার গভীর অর্থকে আমাদের জীবনের পাথেয় করতে পেরেছি? তবে পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র ভোলানাথ পাল তা পেরেছেন। যিনি দারিদ্রতাকে সঙ্গী করে, সমস্ত বাধা অতিক্রম করে আলো দেখাচ্ছেন সমাজকে।
সম্প্রতি তাঁর গ্রামের শ্মশানে ৭০টি তাল বীজ রোপণ করেছেন। বীজ থেকে জন্মানো ছোট্ট তাল চারার নিয়মিত পরিচর্যা করেন একা হাতে। এবং বিভিন্ন সমাজসেবীর ডাকে গ্রামে গ্রামে চলে যান গাছ লাগাতে।
খেজুরি থানার শ্যামপুর কটক গ্রাম-এর ভোলানাথ পাল পেশায় একজন কৃষিজীবী ও রেশন দোকানের কর্মচারী। কিন্তু নেশায় সমাজকর্মী, ছড়াকার, গীতিকার ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক লেখক। মাধ্যমিক পাস করার পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু অভাবের তাড়নায় মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিয়ে, সংসার চালানোর তাগিদে একটি বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজে যোগ দেন। কিছুদিন পর দিল্লি চলে যান জরির কাজ করতে। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আবার কলকাতা ফিরে আসেন। মেটিয়াবুরুজে একটি জরির কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেই থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুরু। যেহেতু কলকাতার রাস্তাঘাট চিনতেন, তাই গ্রামের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কলকাতার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসেন। কখনও কখনও দুই থেকে তিন দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। অনেক সময় নিজের টাকাতেই যাতায়াত করেন।

নিজের কাজের ক্ষতি করে আমরা কজনই বা এভাবে অন্যের হাত ধরতে পারি? তবে ভোলানাথবাবু তা পেরেছেন। এখানেই থেমে থাকেননি, বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখতে, ধরিত্রীকে সবুজ করার জন্য রোপণ করেন নানান গাছ। নিজের বাগানে তৈরি করেন গাছের চারা। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে সবার হাতে সেই চারা গাছ তুলে দেন। বোঝান গাছ লাগানোর গুরুত্ব। সম্প্রতি তাঁর গ্রামের শ্মশানে ৭০টি তাল বীজ রোপণ করেছেন। বীজ থেকে জন্মানো ছোট্ট তাল চারার নিয়মিত পরিচর্যা করেন একা হাতে। এবং বিভিন্ন সমাজসেবীর ডাকে গ্রামে গ্রামে চলে যান গাছ লাগাতে। তাদের সঙ্গে প্রায় একশো খানা বটগাছ লাগিয়েছেন। কোনো গবেষক খেজুরির আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে এলে, লোকে সেই গবেষককে ভোলানাথ পালের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তারপর সেই গবেষককে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো, তথ্য সংগ্রহের সাহায্য, বাড়িতে খাওয়ানো এবং রাত্রিবাসের ব্যবস্থাও করেন কোনো অর্থ ছাড়াই।
ভোলানাথ বলেন, “অতিথি দেব ভব! আমার বাড়িতে অতিথি আসা মানে তো আমার সৌভাগ্য। আমার পরিবারের মঙ্গল হয়। যেহেতু আমার বাড়ি বোগা বাসস্ট্যান্ডের একদম পাশেই তাই পার্শ্ববর্তী গ্রামের অনেক লোক দূরে কোথাও কাজে গেলে, আমার বাড়িতে সাইকেল রেখে যেতেন। রাত্রিবেলা বাস থেকে নেমে আবার সাইকেল নিয়ে তারা বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু ঝড়-বাদলের রাতে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব হত না। ছোটোবেলায় দেখতাম, ঠাকুমা তাদের রাতে খাইয়ে দাইয়ে বিছানা করে দিতেন। বলতেন, এটা গৃহস্থ বাড়ি। এরকম বিপদের মধ্যে লোককে ফেলে দিলে অমঙ্গল হবে। ছোটোবেলা থেকে দেখতাম বিশেষ করে বর্ষায় প্রায় দিন আমার বাড়িতে কেউ না কেউ রাতে থাকেন। এই ভাবনা আমি ঠাকুমার থেকে পেয়েছি।”
খেজুরি থানার শ্যামপুর কটক গ্রাম-এর ভোলানাথ পাল পেশায় একজন কৃষিজীবী ও রেশন দোকানের কর্মচারী। কিন্তু নেশায় সমাজকর্মী, ছড়াকার, গীতিকার ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক লেখক।
তিনি ছন্দে কথা বলেন। কথায় কথায় ছড়া কাটেন। ছোটোবেলায় দেখতেন বাবা বিয়েবাড়ি বা অন্নপ্রাশন বাড়িতে যাওয়ার আগে উপহারের প্যাকেটের উপর শুভেচ্ছা বার্তা লিখতেন। তা দেখে তিনিও ছড়া লিখতে শুরু করেন দশ বছর বয়সে। সেই কলম আজও চলছে। লিখেছেন অনেক ছড়া, কবিতা, ঝুমুর ও লোকগান। শিল্পী ঝুমা দাসের ক্যাসেটের ঝুমুর গান ‘মরদ আমার গেছে কলকাতা, আইনা দিবে নুপুর’ বা শিল্পী ভক্তদাস বাউলের গানের কথা লিখেছেন ভোলানাথ। এরপর ডাক পান জয়দেব মেলায়। সান্নিধ্যে আসেন প্রখ্যাত গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সংগীত নির্মাতা কল্যাণ সেন বরাট, জয়ন্ত দে, সনজিৎ মণ্ডল, বাউল সম্রাট পূর্ণদাস বাউলের। লিখেছেন ৬৮খানা লোকগান। এভাবে সুন্দর গান লিখছিলেন, কিন্তু হঠাৎ করে বাবা মারা যাওয়ায় গানের জগতে ছেদ পড়ে। কলকাতা থেকে শ্যামপুর কটকা গ্রামে ফিরে আসেন। পেশা পরিবর্তন করেন।

এখন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, সঙ্গে একটি রেশন দোকানের কর্মচারী। প্রকাশিত হয়েছে ভোলানাথ পালের কবিতার বই ‘স্মৃতি হয়ে থাক’। লোকসংস্কৃতি নিয়েও দীর্ঘ বছর লেখালেখি করছেন। নানান পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে গ্রামীণ মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা। সাধারণত যাদের কথা কেউ লেখেন না, তাদের কথাই ভোলানাথ লিখে চলেছেন। সেরকমই দুজন মৎস্যজীবী নারী কল্পনা বর ও আলপনা বরের জীবন যুদ্ধের কথা তিনিই প্রথম লেখায় তুলে ধরেন। আজ শুধু খেজুরি নয়, পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এই দুই মৎস্যকন্যার জীবন সংগ্রামের কথা জানেন। তাঁরা আজ বিভিন্ন জায়গায় ডাক পান, সংবর্ধিত হন শুধুমাত্র ভোলানাথ পালের জন্য। এভাবে ভোলানাথ পালের হাত ধরে আলো দেখছে অন্ধ গলিপথ।