
সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান, সংকটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মাণ/ মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়…
ছোটো থেকেই এই রবীন্দ্রসংগীতটি বহুবার শুনতে শুনতে আমরা অনেকেই বড়ো হয়েছি, কিন্তু রবি ঠাকুরের এই গানের মর্মার্থকে জীবনের ব্রত করে নিতে পেরেছেন যে কজন গুটিকয় মানুষ, তাঁরাই ধ্রুবতারা হয়ে সমাজকে দেখান নতুন পথের দিশা, সমাজের মানুষের চোখে এঁকে দেন নতুন দিনের স্বপ্ন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভূমিকন্যা প্রীতিকণা জানা (Pritikana Jana) সেই গুটিকয়েকরই একজন, যিনি নিজের জীবনে আসা বিভিন্ন ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কাটিয়ে আগলে রেখেছেন নিজের জ্ঞানপ্রদীপের শিখাটিকে, আর সেই শিখা থেকেই আলো জ্বালাচ্ছেন আরও অনেক সম্ভাবনার সলতেতে।

পূর্ব মেদিনীপুরের প্রীতিকণা পড়াশোনার সূত্রে আসেন শান্তিনিকেতন। বীরভূমের রুক্ষ মাটি ক্রমশ আর্দ্র করে তোলে জেদি, লড়াকু মেয়েটার সংবেদনশীল মনকে। আইনের ছাত্রী প্রীতিকণা সামাজিক মাধ্যমে মাধ্যমে পরিচিত হলেন বৃক্ষ এবং পশুপ্রেমী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে।
অর্থনীতির ভাষায় শ্রম হল সেই ধরনের কাজ, যার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন হয়, আর ভালোবাসার ভাষা বলে সুস্থ, সুন্দর, স্বনির্ভর একটা সমাজ গড়ে তোলার জন্য স্বপ্নের জন্য যারা পরিশ্রম করে চলছেন, তাঁরা সকলেই শ্রমজীবী। বীরভূম জেলার গোপালনগর গ্রাম হয়ে উঠেছে এমনই এক শ্রমজীবী কন্যার কর্মভূমি। পূর্ব মেদিনীপুরের প্রীতিকণা পড়াশোনার সূত্রে আসেন শান্তিনিকেতন। বীরভূমের রুক্ষ মাটি ক্রমশ আর্দ্র করে তোলে জেদি, লড়াকু মেয়েটার সংবেদনশীল মনকে। আইনের ছাত্রী প্রীতিকণা সামাজিক মাধ্যমে মাধ্যমে পরিচিত হলেন বৃক্ষ এবং পশুপ্রেমী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। নির্বিচারে গাছ কাটার বিপরীতে কিছু মানুষ আগলে রাখে সবুজকে, নতুন সবুজকে পৃথিবীতে আনতে প্রাণপণ লড়ে চলেন তারা। প্রীতিকণাও ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলেন সিডবল, ফাঁকা জায়গায় তাঁর ছড়ানো বীজ জন্ম দেবে নতুন গাছের, সেই গাছ পৃথিবীকে দেবে অক্সিজেন। এই আশা নিয়ে তাঁর পথচলা শুরু, সঙ্গে চললো পথের পশুদের সেবা, তাদের খাওয়ানো ইত্যাদি।
ইতিমধ্যেই এসে পড়লো কোভিড মহামারী। সারা বিশ্ব তখন থমকে গেল এক ভাইরাসের আক্রমণে। কিন্তু থমকে থাকেনি মানুষের শুভবোধ, সৃজনশীলতা। কলেজে যেতে আসতে প্রীতিকণার চোখে পড়তো গোপালনগর গ্রামের মানুষদের কার্যকলাপ। সেখানে শিশুদের অনেক সম্ভাবনা থাকলেও স্বপ্ন দেখার সুযোগ ছিল না। তার ওপর কোভিড ওদের আরও স্কুল বিমুখ করে তুলবে, এই চিন্তা ভাবিয়ে তুললো প্রীতিকণাকে। শান্তিনিকেতনের পার্শ্ববর্তী গ্রামে শিক্ষার আলো পৌঁছালেও প্রায় ৯-১০ কিলোমিটার দূরের গোপলনগর তখনও আঁধারে। সেই গ্রামে স্থানীয় একজনের সহায়তায় প্রীতিকণা নিয়ে গেলেন শিক্ষার আলো। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা না, তাঁর কাছে শিশুরা শিখলো স্বাস্থ্যবিধিও। শুধু পড়াশোনা আর স্বাস্থ্যবিধি নয়, মেধার যথার্থ বিকাশের জন্য নাচ, গান, আঁকা প্রভৃতি সৃজনশীল চারুশিল্পও শিখছে শিশুরা।

কিন্তু দারিদ্র্য যেখানে নিত্যসঙ্গী সেখানে শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে কোথা থেকে? সেই ব্যবস্থাও করলেন তিনি। গ্রামের শিশুদের শেখালেন সবজি চাষ। ফলে নিজেদের জমির সবজিতেই পুষ্টি পাচ্ছে শিশুরা।
তবে চলার পথ কখনোই এত সহজ ছিল না। কখনও সন্দেহ, কখনও অপবাদ সঙ্গী করেই লড়াই চালিয়েছেন প্রীতিকণা। আসলে নিজের জীবনের প্রতিকূলতা মনের জোর দিয়েছে তাঁকে। বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি জানালেন, “এখন আর আমি একা নই, অনেকে এগিয়ে আসছেন ওদের সকলের জন্য, কেউ ওদের আঁকা শিখিয়ে সৌন্দর্যবোধ বাড়িয়ে তুলছেন, কেউ ফুড ব্যাঙ্কের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইছেন। নিজের স্টাইপেন্ডের টাকায় যে কাজ শুরু করেছিলাম আজ সেই কাজে অনেক মানুষকে পাশে পাচ্ছি।”

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করার অধিকার বিধাতা না দিলেও নিজেকেই সেই অধিকার বুঝে নিতে হয়। তাই একদিন, “মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? বিয়ে দিয়ে দিতে হবে” – সমাজের এই মানসিকতার শিকার হতে হয়েছিল যে মেয়েকে, আজ তিনি নিজের জেদে নিচ্ছেন আইনের পাঠ। আর একটু একটু করে সমাজকে বাঁধতে চাইছেন নতুন ভাবে। যেখানে মানুষের পরিচয় হবে শুধুই ‘মানুষ’। আর মাতৃস্নেহে ছোটো ছোটো কুঁড়িদের ফুটতে দিয়ে সমাজকে আরও রঙিন করে তোলার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রীতিকণা।

