কোলনের পুজোয় এবার চন্দ্রযানের গরিমা
বাঙালির পুজোর বাজনা বেজে উঠেছে দুই বাংলা জুড়েই। প্রবাসেও পুজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু জার্মানির রাইন নদীর তীরে মোটেই কাশফুল ফোটে না। অথবা কোলন শহরের কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়াও হয় না। তবু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এই শহরেও শরৎ এসে পৌঁছায় প্রতি বছর নিয়ম করে। তাই প্রবাসী বাঙালিদের আগ্রহে দেবী দুর্গাও সদলবলে এসে হাজির হন জার্মানির কোলন শহরে। কোলনের ভারত সমিতি-র দুর্গাপুজো-র খ্যাতি আজ সারা জার্মানি জুড়েই। জার্মানির দুর্গাপুজো যেন আজ সাজো সাজো রবে অনুষ্ঠিত হয়।

সে অনেক বছর আগের কথা। ১৯৯২ সাল। ১২ জন প্রবাসী বাঙালি জার্মানির কোলন শহর-এ হইহই করে দুর্গাপুজোর আয়োজনের কথা ভাবলেন। এর আগে তাঁরা ফ্র্যাঙ্কফুর্টের দুর্গাপুজো-তে যেতেন। কিন্তু সেবারই প্রথম তাঁদের মনে ভাবনা এলো, নিজেরা একটা পুজো করলে কেমন হবে? সেটা একদমই নিজেদের পুজো হবে। সব প্রবাসীদের মনে তখন দেশের পুজো, মানে স্বদেশের স্মৃতি জড়িয়ে। ঠিক হল, পুজোতে কলকাতার মতোই আয়োজন করা হবে।
এক চিলতে ভাবনা ডানা মেলেছিল কোলনের প্রবাসী বাঙালি-দের ইচ্ছের আকাশে। তারই ফলশ্রুতিতে ভারত সমিতির উদ্যোগে কোলনে শুরু হল দুর্গাপুজো। আজ সেই পুজো জার্মানির অন্যতম বড়ো পুজো বলে গণ্য হয়। পুজো কমিটির সদস্য সংখ্যা এখন ৫০-এর ওপরে। আশেপাশের নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ থেকে প্রায় হাজার খানেক মানুষ হাজির হন পুজো উপলক্ষে।

এই পুজো এ বছর ৩২ বছরে পা দিয়েছে। সেই তিন দশক আগের পুজো উদ্যোক্তাদের অন্যতম অশীতিপর সুবীর গোস্বামী আজও এই পুজোর পুরোহিত। কোলনের প্রবাসী বাসিন্দা ঐশ্বর্য পাল বাগ বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “পুজোর আগে আগে প্রতি সপ্তাহান্তে আমাদের মিটিং বসে। আমরা সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পুজোর কাজকর্ম করি।”
এখানে দুর্গা প্রতিমা প্রতি বছর বিসর্জন হয় না। পাঁচ বছর অন্তর অন্তর প্রতিমা কলকাতা থেকে গিয়ে পৌঁছায়। এবার নতুন প্রতিমা পুজো হবে। কুমোরটুলির প্রতিমা কোলনে এসে পৌঁছে যাবে সেপ্টেম্বরের শেষে নির্দিষ্ট সময়েই। তবে তার বহু আগে থেকেই পুজোর পরিকল্পনা শুরু হয়ে যাচ্ছে। কলকাতা থেকেই হাজির হবে পুজোর সামগ্রী। নির্ঘণ্ট মেনে, অর্থাৎ দেশের মতোই পাঁচ দিন ধরে চলবে পুজোর নানা আয়োজন- কলাবৌ স্নান, বোধন, সন্ধিপুজো, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা ইত্যাদি।

প্রতিবছর ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী- দুই বেলা চলে বাঙালিদের রান্নার মহাভোজ। বাঙালির নানাবিধ সাবেক পদই ভোজের প্রধান আকর্ষণ। পুজো কমিটির সদস্যরা নিজেরাই যাবতীয় রান্নাবান্নার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লুচি, মাংস, খিচুড়ি, ডাল, লাবড়া, পাঁচরকম ভাজা এ সমস্ত বাদ দিয়েও বিশেষ আকর্ষণ থাকে বিরিয়ানি, যা দশমীর বিসর্জনের পর আপ্যায়িত হয়।
আট থেকে আশি সকলের জন্য হাজির করা হয় স্ন্যাকস কাউন্টার। যার পোশাকি নাম ‘মুখরোচক’। রসনাবিলাসি বাঙালি মানেই স্ট্রিট ফুড বিলাসী। তাই তাদের জন্যে সিঙাড়া, ভেজিটেবল চপ, কচুরি মজুত থাকে কাউন্টারে। মূলত পুজো কমিটির সদস্যরাই এটা পরিচালনা করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া পুজো সম্পূর্ণ হয় না। তাই কোলন শহরে ষষ্ঠীর আগমনী সংগীত দিয়ে শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবার দুর্গাপুজোয় সিঙ্গাপুর, ভারত-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্পীরা আসবেন। থাকবে স্থানীয় শিল্পীদের নানাবিধ আয়োজন। ধ্রুপদী, পুরোনো দিনের বাংলা গান, গীতি-আলেখ্য, কত্থক থেকে বলিউড সংগীত ও নৃত্য – সব ধারার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। একজন গ্রিকশিল্পী গাইবেন বলিউডের গান।

এ বছর ভারতের চন্দ্রযান-৩ মহাকাশে বিশেষ সাফল্য পেয়েছে। সে কথা মাথায় রেখে ভারত সমিতির সদস্যরা এবার শিশুদের নিয়ে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন। শিশুদের অনুষ্ঠানের মূল থিম চাঁদ। শিশুদের জন্যই লেখা হবে স্ক্রিপ্ট। অভিনয়, আবৃত্তি, পিয়ানো বাজানোর মধ্য দিয়ে শিশুরা থিম তুলে ধরবে।
এছাড়া বাঙালির পুজোর সঙ্গে পুজোবার্ষিকীর অচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তাই কোলন শহরেও মা দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে প্রতি পুজোয় পত্রিকা প্রকাশ হয়। এবারেও ‘মাতৃবন্দনা’ নামের শারদসংখ্যাটি প্রকাশিত হবে পুজোর চতুর্থী-পঞ্চমী নাগাদ। সব মিলিয়ে কোলন-কলকাতা একসূত্রে বাঁধা পড়বে পুজোর কয়েকটা দিন।
