১৭৫ বছর পূর্ণ করল বেথুন স্কুল, নারীশিক্ষায় এই স্কুলই ছিল কলকাতার প্রথম

বেথুন কলেজিয়েট স্কুল পেল বঙ্গরত্ন পুরস্কার

“নিজের পেট নিজে চালাবি বৌ? এই সাহস নিয়ে ঘর ছাড়ছিস?”

‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ উপন্যাসের শেষে না জানিয়ে তার মেয়ে সুবর্ণলতার বিয়ে দেওয়ায় অভিমানী সত্যবতী যখন কাশীতে যাওয়ার জন্য গাড়িতে বসেছিল, তখন ননদ সদুদিদির এই প্রশ্ন বুঝিয়ে দেয় প্রকৃত শিক্ষাই এক নারীকে দিতে পারে মেরুদণ্ডের জোর, যে জোরে সে ছিঁড়তে পারে সব পরাধীনতার নাগপাশ। সত্যবতীকে এই জোর দিয়েছিলেন লেখিকা আশাপূর্ণাদেবী। আর বাস্তবে এইরকম শত শত সত্যবতীকে দেবী সরস্বতীর যোগ্য সাধিকা করে তুলতে এগিয়ে এসেছিলেন এক সাহেব, পেশায় যিনি ছিলেন তৎকালীন ভারত সরকারের শিক্ষাসচিব। নাম স্যার জন এলিয়েট ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন। তাঁর এবং এদেশের রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ মুক্তমনা পুরুষের উদ্যোগে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে ১৮৪৯ সালের ৭ মে কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তৈরি হয়েছিল নতুন ইতিহাস – হিন্দু ফিমেল স্কুল। এই ঐতিহাসিক স্কুলেরই পল্লবিত রূপ আজকের ‘বেথুন কলেজিয়েট স্কুল’, যা ২০২৩ সালে পৌঁছে গেল গৌরবোজ্জ্বল ১৭৫ বছরে।

“কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষাণীয়াতি যত্নতঃ” মেয়েদের শিক্ষার সপক্ষে মহানির্বাণতন্ত্র থেকে এই শ্লোক উদ্ধৃত করে বেথুন স্কুলের মেয়েদের যাতায়াতের গাড়িতে লিখিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শ্লোকটির বাংলা অর্থ কন্যা সন্তানকেও যত্নের সঙ্গে লালন-পালন করে শিক্ষাদান করা উচিত। বলা বাহুল্য সেই মেয়েদের সুশিক্ষিত করে তোলার এই ব্রত বরাবর পালন করে চলেছে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল। তাই সময়ের সারণী বেয়ে বেথুন স্কুল বারবার সমাজকে উপহার দিয়েছে একেক কৃতি কন্যা। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী বসু, বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা চন্দ্রমুখী বসু, বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়, কবি কামিনী রায়, সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র, বাচিক শিল্পী ব্রততী বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। ঐতিহ্যের সেই পরম্পরা বজায় রেখে স্কুলের ১৭৫ বছরে প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রী, শিক্ষাকর্মী, শিক্ষা সহায়ক কর্মী সকলে মিলে উদযাপন করছেন গৌরবের ১৭৫।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শবরী ভট্টাচার্যের সঙ্গে প্রবীণতম প্রাক্তনীরা

বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শবরী ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এই ১৭৫ বছর শুধু বেথুন স্কুলেরই ১৭৫ বছর শুধু নয়, বরং নারীজাগরণের ১৭৫ বছর বলে আমরা ভাবতে পারি। এই ১৭৫ বছরের উদযাপন আমরা সারাবছর ধরেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করবো।” এই বিদ্যালয়ের জন্মদিন পালনের উৎসব শুরু হয়েছে ২ মে থেকে, যেদিন উত্তর কলকাতার পথে একসঙ্গে পা মিলিয়ে হেঁটেছেন বর্তমান ও প্রাক্তন অনেক ছাত্রী, শিক্ষিকা, শিক্ষা সহায়ক কর্মী, অভিভাবক-সহ সমাজের বিশিষ্ট মানুষ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন ছাত্রী কৃষ্ণা চক্রবর্তী এবং মিনতি সেন যাঁরা স্কুলের প্রতি আবেগ এবং নস্টালজিয়াকে সঙ্গী করে আশি ঊর্দ্ধ বয়সেও সকলের সঙ্গে পা মিলিয়েছেন সেদিনের পদযাত্রায়। বঙ্গদর্শন.কম-কে কৃষ্ণা চক্রবর্তী জানান, “বাবার হাত ধরে তৃতীয় শ্রেণিতে যখন ভর্তি হই, তখন স্কুলে শতবর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠান চলছিলো। আমি স্কুলের সার্ধ শতবর্ষের অনুষ্ঠানেও এসেছি, ১৭৫ বছরের অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে পারছি যা আমার বড়ো প্রাপ্তি।  স্কুল মানেই আমার কাছে খোলা আকাশ, কারণ পরিবারের রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে স্কুলই আমাকে দিয়েছিল মুক্তির স্বাদ।” আরেক প্রাক্তন ছাত্রী স্বর্ণালী ঘোষ জানালেন, পড়াশোনাকে ছাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্নভাবে পড়াতেন শিক্ষিকারা, শুধু পড়াশোনাই নয়, অন্যান্য সৃষ্টিশীল কাজেও ছাত্রীদের বরাবর উৎসাহ দিয়েছেন শিক্ষিকারা এবং সেই ধারা আজও অব্যাহত।

বঙ্গরত্ন সম্মান পাওয়ার পর

বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শবরী ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এই ১৭৫ বছর শুধু বেথুন স্কুলেরই ১৭৫ বছর শুধু নয়, বরং নারীজাগরণের ১৭৫ বছর বলে আমরা ভাবতে পারি। এই ১৭৫ বছরের উদযাপন আমরা সারাবছর ধরেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করবো।”

ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শবরী ভট্টাচার্যের হাতে তুলে দেন বঙ্গরত্ন পুরস্কার। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা শাশ্বতী অধিকারী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “মেয়েদের শিক্ষার উদ্দেশ্য তৈরি বেথুন স্কুলের স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।” শিক্ষিকা নীলাঞ্জনা অধিকারী জানান, “বেথুন স্কুলের সার্ধশতবর্ষের অনুষ্ঠানে অতিথির আসন অলংকৃত করেছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল। আমাদের ইচ্ছা স্কুলের ১৭৫ বছরের জন্মদিনও নানাভাবে স্মরণীয় করে রাখবো। এছাড়াও প্রতি বছরই ৭ মে স্কুলের জন্মদিন পালনের রীতি আছে, সেদিন অনুষ্ঠানের পরে সকলে আইসক্রিম খেয়ে আমরা দিনটিকে উদযাপন করি।”

 

সম্ভ্রান্ত পরিবার হলে কী হবে! মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর রেওয়াজ ছিল না তখনও। মেয়েরা স্কুলে যাবে শুনলেই ‘গেল গেল’ রব উঠত। এই দুর্বিষহ পরিবেশের মধ্যেই তৈরি হল কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল বেথুন। সময়ের বিচারে এই বেথুন স্কুল হয়তো কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল ছিল না। তবে বেথুন স্কুলের মুক্ত ভাবনা, বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থাপনা, স্কুলের জনপ্রিয়তা, প্রচার, রক্ষণশীল ও সম্ভ্রান্ত সমাজে এই স্কুলের গ্রহণযোগ্যতা মিলেমিশে বেথুন স্কুলই সেই অর্থে কলকাতার প্রথম মেয়েদের স্কুল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল।

আসলে বিদ্যার দেবীই যেখানে নারী, সেখানে বিদ্যালাভের ক্ষেত্রে লিঙ্গবিভাজন সত্যিই অর্থহীন। কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে যে প্রতিষ্ঠান প্রথম মেয়েদের জন্য খুলে দিয়েছিল জ্ঞানচর্চার দরজা, সেখানে দেবী সরস্বতীর সন্ততিরা আজও একে অপরের সঙ্গে নাড়ির টানে আবদ্ধ, তাই এই স্কুল তাদের কাছে দ্বিতীয় বাড়ি, বেথুন বাড়ি। ঐতিহ্যকে স্মরণ করে, আধুনিকতাকে সঙ্গী করে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল এগিয়ে চলেছে নতুন উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের লক্ষ্যে।

_______

ছবি: প্রতিবেদক

Developed by DXDasia