বহু শতাব্দী-প্রাচীন রহস্যে ঘেরা কুরুমবেরা দুর্গ

ওড়িশার প্রাচীন স্থাপত্যের অনবদ্য উদাহরণ এই ধ্বংসাবশেষ, কিন্তু কেন তৈরি হয়েছিল কুরুমবেরা দুর্গ?

সাধারণভাবে কেশিয়ারি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (সিডি) ব্লকে হয়তো যাবেন না সেখানকার বাসিন্দা ছাড়া আর কেউই। জেলা সদর মেদিনীপুর থেকে আন্দাজ ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত কেশিয়ারি বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত। যাবেন তাঁরাই, যাঁরা জানেন এই এলাকার বিশেষত্ব ঠিক কী।

স্টেট হাইওয়ে ধরে কেশিয়ারি যেতে হলে খড়গপুর ছাড়িয়ে আরও ২৭ কিমি গিয়ে বাঁদিকে ঘুরে বেলদার দিকে গেলে কুকাই নামক গ্রামের চৌরাস্তায় পৌঁছবেন, যেখান থেকে ২ কিমি গেলে কেশিয়ারি। কুকাই থেকে ডানদিকে বাঁক নিচ্ছে পাকা সড়ক, যা বেয়ে আরও ২ কিমি গেলেই পেয়ে যাবেন গগনেশ্বর গ্রাম। এবং সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে কুরুমবেরা দুর্গ বা ফোর্ট, যার ছোট ছোট ঘর এবং মন্দিরগুলি এনশিয়েন্ট মনুমেন্টস অ্যাক্ট-এর দৌলতে বর্তমানে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায়। ভিতরে ঢুকলেই দেখতে পাবেন বিশাল এক চাতাল, যার চারধারে রয়েছে থাম-যুক্ত বারান্দা, এবং তিনটি গোলাকৃতি গম্বুজ। দুর্গের মাঝখানে একটি বেদী, যা সম্ভবত বলি দেওয়ার কাজে ব্যবহার হতো।এক নজরে দেখে মনে হবে, কুরুমবেরা সম্পূর্ণভাবেই প্রাচীন ওড়িয়া স্থাপত্যকলার নিদর্শন। দুর্গে পাওয়া একটি শিলালিপি বলছে, এটি নির্মিত হয় ১৪৩৮ থেকে ১৪৬৯ সালের মধ্যে, সৌজন্যে ওড়িশার সূর্যবংশী রাজা গজপতি কপিলেন্দ্র দেব। কিন্তু আরেকটু দেখলেই বুঝতে পারবেন, ওড়িয়া শিল্পের সঙ্গে মিশেছে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের (১৬৫৮-১৭০৭) মোগল শিল্পকলা, যার নেপথ্যে ছিলেন জনৈক মহম্মদ তাহির, বলেছে দুর্গে প্রাপ্ত আরও একটি শিলালিপি।

তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় থাকলেও কুরুমবেরা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায়নি এখনও। ইতিহাস বলে, বিহার-বাংলার আফগান সুলতানত ওড়িশা আক্রমণ করে ১৫৬৮ সালে। সেসময় ওড়িশার অধীনেই ছিল অবিভক্ত মেদিনীপুর, তবে ১৭৫২ সালে তা হয় যায় বাংলার। তবে বেশিদিন ওড়িশা দখল করে থাকতে পারেনি আফগানরা, ১৫৭৫ সালে তুকারোই-এর যুদ্ধে মোগলদের কাছে পরাস্ত হয়ে ওড়িশা ছাড়তে হয় তাদের। মোগলরা ওড়িশাকে পাঁচটি ‘সরকার’ বা ভাগে বিভক্ত করে কুরুমবেরার অংশ দেয় জলেশর সরকারকে। তার প্রায় এক শতাব্দী পরে, আউরঙ্গজেবের নির্দেশ মেনে ওড়িশার বহু মন্দির লুট করেন মোগল সেনাপতিরা। সেই সময়েই আক্রান্ত হয় কুরুমবেরা, এবং যতদূর বোঝা যায়, তার একাংশকে পরিণত করা হয় মসজিদে। কুরুমবেরাকে আদৌ কেন দুর্গ বলা হবে, তারও কোনও সদুত্তর আজ অবধি মেলেনি। বাইরের স্তম্ভগুলি একটি ফুলের আকারের ছাদকে তুলে ধরেছে, এবং বাঁদিকের গম্বুজের পিছনদিকে দেখা যায় আরও কিছু গোলাকার স্তম্ভ। স্থাপত্যের নিরিখে ওড়িশার আরও কয়েকটি দুর্গের সঙ্গে কিছু মিল থাকলেও কুরুমবেরায় দুর্গের কোনও মৌলিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না, যেমন অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখার নিরাপদ জায়গা, শক্তিশালী দুর্গদ্বার, বিভিন্ন স্তরে প্রাচীর, পরিখা, প্রহরীদুর্গ, বা গোপনে প্রস্থানের পথ। সৈন্যসামন্তের লুকিয়ে থাকারও কোনও স্থান দেখা যায় না, যেমন দেখা যায় না আক্রমণ শুরু করার কোনও উপায়।

বরং মনে হয়, একসময় হয়তো জনসমাবেশ হতো এখানে। কিছু জায়গায় মসজিদের সঙ্গেও মিল পাওয়া যায়। যে বেদীর কথা বলা হয়েছে, তা পশ্চিমদিকে অবস্থিত, যাতে সমবেত জনতা একই দিকে মুখ ফেরাতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, যার দ্বারা দুর্গ বা মসজিদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়।

তবে কিছুই কি নেই? আছে বইকি, কুরুমবেরা সম্পর্কে এই অঞ্চলের এক জনপ্রিয় লোকগাথা। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকের কথা, গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় এলাকা পরিদর্শন সেরে বাড়ি ফিরছেন কেশিয়ারি গ্রামের জমিদার পদ্মলোচন দত্ত। পথে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি, যার ফলে তিনি আশ্রয় নিয়ে বাধ্য হন পরিত্যক্ত কুরুমবেরা দুর্গে। বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে করতে দুর্গ ঘুরে দেখতে শুরু করেন পদ্মলোচন, এবং আবিষ্কার করেন একটি দরজা বন্ধ করা ঘর। দরজা ঠেলে খুলতেই দেখেন, ভিতরে রাখা আছে তিনটি বিগ্রহ – জগন্নাথ, বলভদ্র, এবং সুভদ্রা। গঙ্গেশ্বরের বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করে বিগ্রহগুলি সম্পর্কে কোনও সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেন, গ্রামে ফেরত নিয়ে আসবেন তাদের। গ্রামে ফিরে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে বিগ্রহ তিনটি স্থাপন করেন তিনি। সেদিন থেকেই গ্রামে পূজিত হয়ে আসছেন জগন্নাথ এবং তাঁর দুই ভাইবোন। তাঁদের ঘিরে এক অভিনব রথযাত্রাও গড়ে উঠেছে, তবে সেই কাহিনি আরও একদিন বলা যাবে।

আজ পশ্চিম মেদিনীপুরের দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে পড়ে কুরুমবেরা। বেড়াতে গিয়ে থাকবেন পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের মৃত্তিকা ট্যুরিজম প্রপার্টিতে। বুকিংয়ের জন্য সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন +91 97325 10074 অথবা tourismcentrekolkata@gmail.com. পশ্চিম মেদিনীপুর সংক্রান্ত বিশদ জানতে যোগাযোগ করুন

West Bengal Tourism Development Corporation Ltd

DG Block, Sector-II, Salt Lake

Kolkata 700091

Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292

Website: https://www.wbtdcl.com/

Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com

 

Developed by DXDasia