বাংলার ঐতিহ্য মানে তো শুধুই ব্রিটিশ যুগ নয়
‘হেরিটেজ’ শব্দটি বহুমুখী – এর মধ্যে মিশে আছে নিজেদের অতীত সম্পর্কে গর্ব, নান্দনিক শিল্পকলার নানা নিদর্শন, এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র স্থাপনের প্রয়াস। তবে একই সঙ্গে হেরিটেজ যে হয়ে উঠতে পারে রাজস্ব আদায়ের একটি অন্যতম পন্থা, তার প্রমাণ রয়েছে ভারতের একাধিক রাজ্যে, এবং পৃথিবীর বহু দেশে। বাংলার বিবিধ ঐতিহ্য যে সহজেই এই তালিকায় স্থান পায়, সেকথাও বলা বাহুল্য।
কলকাতায় ব্রিটিশ আমলের হেরিটেজ প্রায়শই আলোচিত হয় নানা মঞ্চে, নানা সভায়। অথচ বাংলার ইতিহাসের পাতায় ব্রিটিশ যুগ হল নবতম সংযোজন। আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস আজও বেঁচে আছে, তবে কলকাতায় নয়, এ রাজ্যের অন্যন্য জেলায়। যেমন ধরুন বাঁকুড়ার একাধিক অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে তাম্র এবং মধ্য-প্রস্তর যুগে মানুষের বসবাসের প্রমাণ। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ৩ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ব্যাপী। এছাড়া রয়েছে তিন জেলায় বাংলার অন্তত তিনটি রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ – মুর্শিদাবাদ, মালদা, এবং নদীয়া, যেখান থেকে বিভিন্ন যুগে রাজত্ব করে গেছেন হিন্দু, মুসলমান, এবং বৌদ্ধ শাসক।
আরও পড়ুন: প্রাচীন ইতিহাস আজও কথা বলে বিষ্ণুপুর জাদুঘরে
এই অতি প্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য থাকতে স্রেফ কয়েকটি অঞ্চলেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার কোনও অর্থ হয় কি? তাই আমরা বাংলার কিছু অগ্রগণ্য ‘হেরিটেজ ডেসটিনেশন’ বেছে নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করলাম, যা দিয়ে যাত্রার শুরুটা করতেই পারেন:
মালদা
আমের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিখ্যাত এই জেলার প্রাচীন নাম গৌড়। সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্কদেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই শহর ছিল বাংলার তৎকালীন রাজধানী। আজও যার ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে মূল মালদা শহর থেকে কিছু দূরেই। সেন বংশের আমলে গৌড়ের নাম হয় ‘লখনৌতি’, যা ক্রমশ বাংলা এবং বাঙালির পরিচয় বাহক হয়ে ওঠে, তবে ১২০৪ সালে এই শহর অধিকার করে নেয় দিল্লির সুলতানত। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে বাংলার দুই রাজধানী ছিল গৌড় এবং পান্ডুয়া (পুণ্ড্রবর্ধন), যে দুই শহরের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান, মালদার ইংলিশ বাজার শহর থেকে সমদূরত্বে, একটি উত্তরে, একটি দক্ষিণে।

বড়ো সোনা মসজিদ
এছাড়াও গৌড় এবং পার্শ্ববর্তী আদিনায় দেখতে পাবেন ১৪ থেকে ১৭ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ইসলামি স্থাপত্যের প্রাচুর্য। বস্তুত, বাংলায় ইসলামি স্থাপত্যের যত উৎকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে, সেই তালিকায় তৃতীয় স্থান দখল করেছে পান্ডুয়া। এখানকার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে পড়ে জামি মসজিদ (১৫৬৬) এবং নদীর ওপারে আজও জমকালো নিমসারি টাওয়ার। মালদা মিউজিয়মে রয়েছে এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্য ও নৃতত্ত্বের নানাবিধ উদাহরণ। আশেপাশে রয়েছে বারোদুয়ারি অথবা বড় সোনা মসজিদ, দাখিল দরওয়াজা, ২৬ মিটার উঁচু ফিরোজ মিনার, লুকোচুরি গেট, চিকা মসজিদ, এবং কদম রসুল মসজিদ। পান্ডুয়াতে পাবেন কুতুবশাহী মসজিদ এবং একলাখি সৌধ। এবং মালদা শহর থেকে ৩৬ কিমি দূরে জগজীবনপুরে রয়েছে এক প্রাচীন বৌদ্ধমঠ সহ বহু প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ।
কলকাতা থেকে রেল বা সড়কপথে সহজেই পৌঁছে যাবেন মালদা। থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে আম্রপালি ট্যুরিজম প্রপার্টি (অতীতে মালদা ট্যুরিস্ট লজ)-তে। বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করুন tourismmalda@gmail.com অথবা +91 97330 08792 নম্বরে
মুর্শিদাবাদ
বাংলার উন্নত স্থাপত্যের নিদর্শনের কোনও তালিকা যদি তৈরি করা হয়, তার শীর্ষে নিঃসন্দেহে থাকবে মুর্শিদাবাদ, ব্রিটিশদের হাতে কলকাতা গড়ে ওঠার আগে যা ছিল বাংলার রাজধানী। কথিত আছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যার মাধ্যমে বাংলা তথা ভারতে জাঁকিয়ে বসে, সেই রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ শহরের বৈভব এবং প্রাচুর্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, এবং বলেছিলেন, ইউরোপের কোথাও এমন শহর দেখেননি তিনি।
আজও সেই মুর্শিদাবাদে দ্রষ্টব্য এত কিছু রয়েছে যে একটি সফরে কুলোবে না। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানে অবশ্যই হাজারদুয়ারি প্যালেস, মীর জাফরের বংশধর নাজিব হুমায়ুন জাহ-এর আদেশানুসারে ব্রিটিশ স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওড দ্বারা ১৮৩৭ সালে নির্মিত। তবে অবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় আরও থাকবে কাটরা মসজিদ, যেখানে চিরনিদ্রায় আজও আছেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, যার নামেই রাখা হয়েছিল রাজধানীর নাম।

খেরুর মসজিদ
দেখবেন কাঠগোলা প্রাসাদ, জগত শেঠ পরিবারের সুবৃহৎ পৈতৃক বাসস্থান, যে পরিবারকে একদা বলা হতো ‘বিশ্বের সওদাগর’। অবশ্যই দেখবেন মতিঝিল প্রাসাদ, যেখানে ব্রিটিশদের সঙ্গে চক্রান্ত করার অপরাধে সিরাজ বন্দি করেছিলেন তাঁর পিসি মেহেরুন্নেসা অর্থাৎ ঘসেটি বেগমকে; নসীপুর প্রাসাদ, যার নির্মাতা রাজা কীর্তিচাঁদ বাহাদুর ছিলেন পানিপতের এক ব্যবসাদার, কিন্তু বাংলায় কুখ্যাত হয়ে ওঠেন ব্রিটিশদের হয়ে খাজনা আদায়ের কাজে; এবং খোশবাগ, যেখানে অন্তিম শয্যায় শায়িত রয়েছেন নবাব আলিবর্দি খাঁ, তাঁর মা, স্বয়ং সিরাজউদ্দৌলা, এবং তস্য স্ত্রী লুতফন্নেসা। এসবের পরেও অন্তত একবার কাশিমবাজার না যেতে পারলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আপনার সফর। সেখানে দেখবেন মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর বিশাল প্রাসাদ; কিছু দূরেই পাবেন কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি, এবং আরও একটু এগিয়ে কাটিগঙ্গার কাছে দশটি শিবের মন্দির।

জগৎ শেঠের বাড়ি
এছাড়াও রয়েছে মদিনা মসজিদ, নিজামত ইমামবাড়া (যা সম্ভবত ভারতের বৃহত্তম), এবং জাফরাগঞ্জ কবরস্থান। থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে জেলা সদর বহরমপুরে অবস্থিত বহর ট্যুরিজম প্রপার্টিতে, বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন berhampore12@gmail.com অথবা +91 97325 10031 নম্বরে।
বাঁকুড়া
বাঁকুড়া মানেই বিষ্ণুপুর, এমন একটা ধারণা আজও কাজ করে অনেকের মনেই। এমনটা মনে হওয়ার কারণও হয়তো রয়েছে যথেষ্ট, তবে বিস্তীর্ণ এই জেলায় দেখার মতো রয়েছে আরও অনেক কিছুই। একদিকে অবশ্যই বিষ্ণুপুরের পোড়া মাটির মন্দির, যাদের অভূতপূর্ব স্থাপত্য আজও চোখধাঁধানো। তারপর রয়েছে বিষ্ণুপুর মিউজিয়ম, যার পোশাকি নাম আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন। জেলার নানা জায়গা থেকে পাওয়া পুরাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক শিল্পকলা জড়ো করা হয়েছে এখানে। এছাড়াও একটি গোটা গ্যালারি জুড়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর ঘরানা, যা কিনা বাংলা থেকে উদ্ভুত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একমাত্র ঘরানা।
আরও পড়ুন: রূপকথার নতুন ঠিকানা গজলডোবা
কিন্তু বাঁকুড়ার আরও প্রাচীন একটি দিক রয়েছে। বস্তুত, বাংলার সর্বাধিক প্রাচীন অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম এই জেলা। শুশুনিয়া পাহাড়ে একবার গেলেই বুঝবেন কেন। বাঁকুড়া আর পুরুলিয়ার মাঝখানে পূর্বঘাট পর্বতমালার অংশ শুশুনিয়া। বাঁকুড়া শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ছাতনা। তার থেকে আরও ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শুশুনিয়া পাহাড়। উচ্চতা প্রায় ১২০০ ফুট। প্রকৃতি তার সমস্ত মায়া যেন বিছিয়ে রেখেছে। পুরাতত্ত্ব আর জীবাশ্মের ভাণ্ডার এই পাহাড়। সিংহ, জিরাফ, হায়না এবং আরও নানা প্রাণীর জীবাশ্ম এখানে পাওয়া গিয়েছে। মিলেছে আদি সভ্যতার নানা সামগ্রী। আর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম শিলালিপি।
রেল বা সড়ক পথে কলকাতা থেকে যাবেন বাঁকুড়া, থাকবেন বিষ্ণুপুর ট্যুরিজম প্রপার্টিতে। যোগাযোগের মাধ্যম – 91 97321 00950 অথবা bishnupurtl@gmail.com
সব বলে দিলে ভ্রমণের আনন্দই মাটি, তাই আমরা স্রেফ কিছু ঝলক দেখালাম। বাকিটা নিজেরাই দেখে আসুন না। বুকিং এবং অন্যান্য সাহায্যের জন্য অবশ্যই যোগাযোগ করুন:
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com