প্রকৃতির কোলে, মাটির মঞ্চে, দূষণহীন রাঢ় বাংলাতে ‘নাট্যধারা’ উৎসব

বেঙ্গল রেপার্টরি আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ডেস্টিনেশন থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল’

যাঁরা থিয়েটারের ইতিহাস সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানবেন, হেরাসিম লেবেডফ বাংলা থিয়েটার মঞ্চে আনার পরে বাংলা থিয়েটার লালিত হয়েছে অনেক সময় বাবু ও জমিদার শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায়। কলকাতায় বিভিন্ন ধনাঢ্য নাট্যপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল নাট্যমঞ্চ। তারপর নাটকের ইতিহাসে অন্য মাত্রা যোগ হয়। শুধুই শখ বা বিনোদনের জন্য নাটক নয়, সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে নাটকের ভাষা। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে মানুষকে জাগিয়ে রাখার জন্য তৈরি হতে থাকে একের পর এক নাটক। তবু, আজও কলকাতার ‘বাবু’ শ্রেণির একচেটিয়া আধিপত্য থেকেই গিয়েছে থিয়েটারের ওপর। এবং থিয়েটারকে এই আধিপত্য থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে ‘বেঙ্গল রেপার্টরি’, এগিয়ে চলেছে বেঙ্গল রেপার্টরি আয়োজিত ‘নাট্যধারা’ বা ‘ন্যাশনাল ডেস্টিনেশন থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল’। চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ করছে এই নাট্যোৎসব। 

নাটক একটি ‘মাইনোরিটি আর্ট’ হলেও সমাজ ও মননের ক্ষেত্রে যে সেটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, তা অনস্বীকার্য। ঠিক যেমন এই লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার দিনেও ছাত্ররা বিভিন্ন ‘লার্নিং মডিউল সিস্টেম’-এ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েও স্কুল এবং ক্লাসরুমের অভাব চূড়ান্ত ভাবে অনুভব করছে। বেঙ্গল রেপার্টরি তাদের এতদিনের চেষ্টায় কখনই তাদের নাট্যচর্চাকে একটি বিশেষ মঞ্চ বা স্পেসের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখেনি, বরং যখন ‘ইন্টিমেট থিয়েটার’ নিয়ে কলকাতার সামগ্রিক থিয়েটার দল চর্চায় মগ্ন, তখন বেঙ্গল রেপার্টরি বেরিয়ে পড়েছে নতুন নতুন দর্শক নির্মাণের লক্ষ্যে। দলের নির্দেশক ঋক অমৃত তাঁর প্রথম প্রকাশিত নাটক 'অশ্বত্থামা দ্য ওয়ার মেশিন'-এর উৎসর্গের পাতাতেই এই কথা ঘোষণা করেছিলেন। আর সেই লক্ষ্যেই ধারাবাহিকভাবে (তিনটি সিজন ধরে) তাঁরা অর্গানাইজ করে চলেছেন ন্যাশানাল ডেস্টিনেশন থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল, এবং নাটকের এই উৎসব আয়োজনের জন্য তাঁরা বেছে নেন পশ্চিমবঙ্গের একটির পর একটি জেলা।

ঋক অমৃত-র কথা অনুযায়ী, ‘বর্তমান নাট্যচর্চা অনেকটাই কলকাতা নির্ভর। সেখানে আমরা মহানগরের একটি সংগঠন হয়েও, বৃহত্তর দর্শকের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়, প্রথাগত মঞ্চের বাইরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চেয়েছি। আমরা সরকারি গ্রান্ট পাই, যা জনগণের ট্যাক্সের টাকা। ফলে আমাদের অনুষ্ঠানের কোনও টিকিট নেই। আমরা মহানগরের নাট্যচর্চার বিপ্রতীপ নই, কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে কলকাতার নাটক ও মফস্বলের নাটক এই ‘সিউডো’ ও ‘এলিট’ বিভাজনটিকে মুছে ফেলা দরকার। এবং এখনও পর্যন্ত প্রত্যেকবারই আমাদের নাটক নির্বাচন বিশেষভাবে দর্শকরাই শুধু নন, দেশের প্রত্যেক গুণী মানুষ স্বীকৃতি দিয়েছেন’।

গতবছরের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এনসিজেডসিসি-এর ডিরেক্টর ইন্দ্রজিৎ গ্রোভারের মন্তব্যও অমৃত’র কথাকে সমর্থন জানায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাট্যচর্চা সম্বন্ধে আমার ধারণাকে নতুন করে চেনালো বেঙ্গল রেপার্টরি আয়োজিত ‘নাট্যধারা’। গতবছর বর্ধমান জেলায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। এবছরও তাঁরা রাঢ় বাংলাতেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। এবারের ঠিকানা শান্তিনিকেতনের অনতিদূর দ্বারন্দা গ্রামে। প্রকৃতির কোলে, মাটির মঞ্চে, দূষণ থেকে দূর তাঁদের এই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে মার্চের ১২ থেকে ১৪ তারিখ। মোট ছয়টি নাটক, ও বিভিন্ন দেশজ শিল্পের মেলা বসবে এই উৎসবে। উৎসবের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শ্রী রতন থিয়াম। কোন কোন নাটক থাকছে এই ফেস্টিভ্যালে?

সংবৎসর কথা

চিদাকাশ কলালয়

পিয়াল ভট্টাচার্য

 

ডাকঘর

বীরভূম ব্লসম থিয়েটার

পার্থ গুপ্ত

 

রসকলি

বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী

উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়

 

কড়বা সচ

অভিনব থিয়েটার

দয়াল কৃষ্ণ নাথ

 

ভানু সুন্দরীর পালা

চাকদহ নাট্যজন

সায়ক সিদ্দিকী

 

রাবণ ইন টেন মাইন্ডস

সমন্বয় ডান্স কোম্পানী

হর্ষল ভ্যাস

 

এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছে বিখ্যাত কত্থক নৃত্যশিল্পী ঋতুশ্রী চৌধুরীর নির্মাণ ‘শিবোহম’। বেঙ্গল রেপার্টরি-র নিজস্ব ছোট্ট প্রযোজনা ‘আবাহন’।এ ছাড়া হরকুমার গুপ্তের ‘লেটো’ এবং বঙ্গভূষণ কার্তিক দাস বাউল-এর বাউল পরিবেশনা।

 

 

Developed by DXDasia