উৎপল দত্তের পত্রিকা ‘এপিক থিয়েটার’

‘দ্য ব্রেখট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’-র মুখপত্র

চল্লিশের দশকে বাংলার মঞ্চ বা রঙ্গালয়ে নতুন এক ধারার নাটকের উদ্ভব ঘটে। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সফল প্রয়োগ শুরু হয় বাংলা থিয়েটারে। পরে সেটি মূলস্রোতের নাটকে পরিণত হয়। নতুন নাট্যচর্চায় তরুণ নাট্যসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে নাট্যপত্রের প্রকাশ খুব প্রয়োজন ছিল। নাট্যগোষ্ঠীর সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের জানবার আগ্রহ থাকে। কিন্তু জানবে কীভাবে? তার জন্যই একটি পত্রিকা থাকার খুব প্রয়োজন, যার ভিতর দিয়েই ওই গোষ্ঠীর কার্যকলাপ জানা যেতে পারে। এক সময়ে বাংলা থিয়েটারের জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল ‘বহুরূপী’ পত্রিকা।

১৯৬৪তে দ্বিতীয় জার্মান সফর থেকে দেশে ফিরে উৎপল দত্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, কিংবদন্তি জার্মান নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখটের স্ত্রী তথা অভিনেত্রী হেলেন ভাইগেলের সঙ্গে এদেশে ব্রেখটের নাট্য আদর্শ প্রচারের একটি ক্ষেত্র তৈরি করবেন। সেই উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হল ‘দ্য ব্রেখট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’। হেলেন ভাইগেল হলেন আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা। আর সভাপতি পদে ছিলেন সত্যজিৎ রায়। সোসাইটির মুখপত্র হিসাবে উৎপল দত্তের হাত ধরে প্রকাশিত হওয়া শুরু করল ‘এপিক থিয়েটার’। ব্রেখট চর্চার কারণেই ‘এপিক’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছিল। 

বাংলায় একের পর এক ব্রেখটের নাটক মঞ্চস্থ করা শুরু করে এই সংগঠন, যা বিপুল প্রশংসা পায়। উৎপল দত্ত অভিনয়-সহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও কখনো পত্রিকা প্রকাশে নিরুৎসাহিত হননি। ব্রেখটের মতো তিনিও থিয়েটারের মাধ্যমে আম-জনগণের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। বলতে চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা। যাতে নাটকের মধ্যে দিয়ে জনগণ দেখেন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের আসল রূপ কী এবং কীভাবেই বা সমাজ বদল সম্ভব।

‘টিনের তলোয়ার’ নাটকের সেই উক্তি – 

“সাহেব, তোমরা আমাদের দেশে এলে ক্যানে? আমরা তো তোমাদের কোন ক্ষেতি করিনি, আমরা তো ছিলাম ভাইয়ে ভাইয়ে গলাগলি করে, হিন্দু মুসলমানের প্রীতি বাহু বেঁধে বাংলা মায়ের শ্যামল অঞ্চলে মুখ ঢেকে…হাজার হাজার মাইল দূরে এসে ক্যানে বুট জুতা মাড়াতে এলে আমাদের স্বাধীনতা…” 

সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ‘এপিক থিয়েটার’-এর প্রচ্ছদ 

একটা কথা মানতেই হয়, স্রষ্টা হয়তো চিরকাল থাকেন না, কিন্তু তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে দেশ, কাল, সময়ের একটি স্পষ্ট ছবি দিতে পারেন ভবিষ্যতের জন্য। শোভা সেন তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, “নভেম্বরে আমরা ব্রেখট সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া রেজিস্ট্রি করে তার কাজ শুরু করি পুরোদমে। ‘এপিক থিয়েটার’ পত্রিকাও এই উপলক্ষে প্রকাশিত হতে শুরু করে”। ১৯৭১-এর পর ব্রেখট সোসাইটি অবলুপ্ত হলে ‘এপিক থিয়েটার’কে ‘পিপলস লিটল থিয়েটার’ দলের মুখপত্র করা হয়। অবশ্য উৎপল দত্তের প্রয়াণের পর বহু বছর ধরে সম্পাদনার হাত বদল হয়েছে। এখন সেই পত্রিকা আর প্রকাশিত হয় না, তবে নাট্য সংস্কৃতির অঙ্গনে চিরকাল ‘এপিক থিয়েটার’ পত্রিকা উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র – অরূপ মুখোপাধ্যায়, কমল তপাদার।
 

Developed by DXDasia