শুরু হচ্ছে নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা, সেই উপলক্ষে কথা বলছেন সোহিনী সেনগুপ্ত
রানি কাদম্বিনী – নান্দীকার
নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা (Nandikar National Theatre Festival) দেখতে দেখতে ৩৯ বছরে পদার্পন করল। পরম্পরা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন নাট্যদল এই মেলায় অংশগ্রহণ করলেও এবারের মূল আকর্ষণ বাংলার থিয়েটার এবং থিয়েটারের গান। এবারের নান্দীকার অনেক বেশি ঘরোয়া, আটপৌরে। বাংলার একাধিক মঞ্চসফল প্রযোজনাগুলির আমন্ত্রিত অভিনয় হবে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে। পাঁচদিনের উৎসবে এই প্রথম জেলার নাটক অভিনীত হবে। আটচল্লিশটি দলকে সঙ্গী করে ‘নদিয়া নাট্য’-এর প্রযোজনায় ‘চৈতন্য বিমঙ্গল’-এর মতো ব্যতিক্রমী নাটক দেখবেন দর্শক, যা মঞ্চস্থ হবে ২৪ ডিসেম্বর দুপুর ৩ টেয়।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ও নান্দীকারের অন্যতম প্রধান আয়োজক-পরিচালক সোহিনী সেনগুপ্ত (Sohini Sengupta) বঙ্গদর্শনকে উৎসবের পিছনের গল্প বলতে গিয়ে জানান, “দর্শকরা আসেন বলেই সেখান থেকে যা টাকা পাওয়া যায়, তা থিয়েটার দলগুলোকে দেওয়া হয়। প্রতিবছর একটু করে বুড়ো হই আর চিন্তা বাড়ে। কিন্তু কীভাবে যেন ফেস্টিভ্যালটা হয়েও যায় ভালো করে। নান্দীকারে কিছু তরুণ-তরুণী আছেন; অনিন্দিতা, অর্ঘ্য, অয়ন, শুভদীপ এরকম প্রায় জনা কুড়ি ছেলে-মেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফেস্টিভ্যালের চেহারাটাই পাল্টে যায়। এ বছরও তার অন্যথা হচ্ছে না।”

মৈমনসিংহ গীতিকা – নয়ে নাটুয়া
আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এর মঞ্চে চলবে নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা ২০২২। এ বছর নান্দীকারের বাজেট সীমিত। নিজেদের পকেট থেকেই বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। তবুও বাংলার মানুষের থিয়েটার দেখার উৎসাহ আছে বলে এই বিশাল কর্মকাণ্ড সহজ হয়ে যায়। প্রতিবারের মতো এ বছর উৎসবের পাঁচদিনই উপস্থিত থাকবেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। বেশ কয়েক বছর পর নান্দীকারের এই উৎসবে আমন্ত্রিত অভিনয় করবেন গৌতম হালদার। তাঁর ‘নয়ে নাটুয়া’ দলের অন্যতম বিখ্যাত প্রযোজনা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ মঞ্চস্থ হবে ২৪ ডিসেম্বর সন্ধে সাড়ে ছটায়। এছাড়াও অভিনীত হবে ‘ইচ্ছেমতো’ নাট্যদলের ‘ঘুম নেই’, দমদম সংস্তব দলের ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া’, বিডন স্ট্রিট শুভম নাট্যদলের ‘শব চরিত্র কাল্পনিক’।
প্রতিবারের মতো এ বছর উৎসবের পাঁচদিনই উপস্থিত থাকবেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। বেশ কয়েক বছর পর নান্দীকারের এই উৎসবে আমন্ত্রিত অভিনয় করবেন গৌতম হালদার।
বিহারের পরিচালক দিনকর শর্মার নির্দেশনায় অন্যতম বিখ্যাত হিন্দি নাটক ‘টিকিটও কা সংগ্রহ’ – এই একটিই জাতীয় নাটক মঞ্চস্থ হবে ২৪ ডিসেম্বর, বিকেল ৫টায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এ বছর নান্দীকারের নিজস্ব প্রযোজনায় চারটি নাটক মঞ্চস্থ হবে। সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় ‘রানি কাদম্বিনী’ মঞ্চস্থ হবে ২৩ ডিসেম্বর সন্ধে সাড়ে ছটায়। উৎসবের শেষ দিন, অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর সারাদিন জুড়ে মঞ্চে থাকবে শুধুমাত্র নান্দীকার। এদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা, দলের নতুন-পুরোনো সদস্যদের আয়োজনে থাকছে একগুচ্ছ প্রযোজনা। এছাড়াও সপ্তর্ষি মৌলিকের নির্দেশনায় ‘এক থেকে বারো’ (নান্দীকারের নতুন প্রযোজনা) এবং সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় ‘মানুষ’ মঞ্চস্থ হবে শেষ দিন।

মানুষ – নান্দীকার
সোহিনী সেনগুপ্ত বলেন, “শেষ চার-পাঁচ বছর নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা বাংলা থিয়েটারকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে আগের মতো অসাধারণ প্রযোজনা আর তেমন বোধহয় হচ্ছে না। হলেও আমাদের কাছে তার খবর এসে পৌঁছাচ্ছে না। তাছাড়া মুম্বাইয়ের দলগুলিকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো আর্থিক অবস্থা আমাদের নেই। এদিকে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামাকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ফেস্টিভ্যালে নেওয়ার মতো ওদের নতুন কোনো নাটকই নেই। সত্যি কথা বলতে বাংলায় এখন অসামান্য সব প্রযোজনা হচ্ছে। তাঁদের আরও বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কলকাতা ছাড়াও জেলার থিয়েটারও এখন রমরমিয়ে চলছে। কে বলে আজকাল ভালো বাংলা থিয়েটার হচ্ছে না?” অভিনেত্রীর মতে সারা ভারতের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটারই এই মুহূর্তে সেরা কাজ করছে। তাই এ বছর নান্দীকার অধিক প্রাধান্য দিচ্ছে বাংলার থিয়েটার।
এ বছর উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ থিয়েটারের গানভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘নাট্যগানের পরম্পরা’। গাইবেন অম্বরীশ ভট্টাচার্য এবং সোহিনী সেনগুপ্ত। এ প্রসঙ্গে সোহিনী বলেন, “কত কত থিয়েটারের গান আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। আমাদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য হবে থিয়েটারের গান নিয়ে আরও বেশি চর্চা এবং দর্শক-শ্রোতাদের উৎসাহিত করা। অম্বরীশ আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। কেতকী দত্তের ছাত্র সে। যেমন অসামান্য অভিনয় করে, তেমন অসামান্য গানও গায়। আমরা একসঙ্গে গাইতে গাইতে গান নিয়ে কিছু গল্পও বলব।”
উৎসবের প্রথম দিন নান্দীকার সম্মান জ্ঞাপন করবে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বিজয়লক্ষ্মী বর্মণকে। সেই নিয়ে বক্তব্য রাখবেন প্রকাশ ভট্টাচার্য, গৌতম হালদার, তীর্থঙ্কর চন্দ। ২০ ডিসেম্বর সন্ধে ৬টা থেকে শুরু হবে এই বিশেষ সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান।

উৎসবের সম্পূর্ণ তালিকা
কলকাতার গর্ব নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা। ৩৯ বছর ধরে সোহিনী সেনগুপ্ত দেখছেন দেশের থিয়েটার কিংবদন্তিদের। ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সোহিনী বলে চললেন খালেদ চৌধুরী, অমল পালেকর, রতন থিয়াম-দের নাম। উত্তর কলকাতার বিবেকানন্দ রোডের ছোট্ট বাড়িটা তখন গমগম করত। অতিথিদের জন্য রান্না করতে করতে স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত সংলাপ আওড়ে যেতেন। হাসি-আড্ডায় মশগুল রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। বাবা-মায়ের তৈরি করা সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সোহিনী।