আফ্রিকার এই দেশের সরকারি ভাষা বাংলা

বহু ভাষা এবং সংস্কৃতির দেশ

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা – আমাদের প্রাণ। পয়লা বৈশাখ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আমরা নববর্ষ উদযাপনে মেতে উঠি। প্রত্যেক বছর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের বুক ফুলে ওঠে গর্বে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পিছনে লুকিয়ে আছে বাঙালি শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেই বলিদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে সারা বিশ্ব স্মরণ করে। কিন্তু আমরা কি জানি, সুদূর আফ্রিকার একটি দেশে অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পেয়েছে বাংলা।

আফ্রিকার পশ্চিম অংশের ছোট্ট দেশ সিয়েরা লিওন। বহু ভাষা এবং সংস্কৃতির সহাবস্থান এখানে দেখা যায়। জনসংখ্যা সাড়ে ৭৬ লক্ষের কাছাকাছি। সিয়েরা লিওনকে বলা হয় ‘হিরের খনির গরিব দেশ’। খনিজ পদার্থের ভাণ্ডার থাকলেও সাধারণ জনগণ দারিদ্রে কষ্ট পান। ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ শাসক থেকে স্বাধীন হয় দেশটি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন স্যার মিলটন মারগাই। কিন্তু ১৯৬৪ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেলে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। 

সেদেশের ১৬টি উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ লেগেই থাকত। জনগণের মনে জমতে থাকে ক্ষোভ আর অসন্তোষ। কলহ বাড়তে বাড়তে স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ১৯৯১-তে কিছু বিদ্রোহী দল চেষ্টা করে রাষ্ট্রপতি জোসেফ মোমাহ-কে পদচ্যূত করতে। তার থেকেই যুদ্ধের শুরু। রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সিয়েরা লিওন। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ঘরছাড়া হন লক্ষ লক্ষ মানুষ। 

সিয়েরা লিওনের স্থানীয় সংস্কৃতি 

সিয়েরা লিওন সরকার ব্যর্থ হয়েছিল গৃহযুদ্ধ থামাতে। পশ্চিম আফ্রিকার অন্য দেশগুলো একত্রিত হয়েও কোনো মীমাংসা করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৯ সালে যুদ্ধ থামানোর দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্রসংঘ। তাদের শান্তি মিশনে যোগদান করে অনেক দেশ। বাংলাদেশও অংশ নেয়।  রাষ্ট্রসংঘের পাঠানো প্রথম দলে ৭৭৫ জন বাংলাদেশি সেনা ছিলেন। যুদ্ধের অবস্থা খারাপ হতে থাকলে আরও সেনা পাঠানো হতে থাকে। ১২ হাজার বাংলাদেশি সৈন্য পা রাখেন সিয়েরা লিওনের মাটিতে। তাঁরা যেমন বিদ্রোহ থামানোর কাজ করেছেন, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়া শুরু করেন। সেখানকার জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। স্থানীয় মানুষেরাও আকৃষ্ট হন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি। এমনি তাঁদের নিজস্ব অনুষ্ঠানে বাংলা গানের ব্যবহার শুরু হয়। বিবাদমান উপজাতিগুলোর মধ্যে সম্প্রীতির বোধ জাগিয়ে তোলেন বাংলাদেশি সৈন্যরা। অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনী ততটা আন্তরিকভাবে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিশতে পারেননি।

 ২০০২ সালে শান্তি ফিরে আসে সিয়েরা লিওনে। দেশ পুনর্গঠন এবং বন্ধুসুলভ আচরণের জন্য বাংলাদেশের কাছে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সে বছরের ১২ ডিসেম্বর বাংলা ভাষাকে অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমেদ তেজান কাব্বা। তবে এই স্বীকৃতি কেবলই সাম্মানিক। সেদেশে সরকারি কাজকর্ম হয় ইংরেজি এবং ক্রিওল ভাষায়। রাষ্ট্রপতি তেজান কাব্বা ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশ বাংলা ভাষাকে যে মর্যাদা দিয়েছে, তা সারা বিশ্বে এক অনন্য নজির। পৃথিবীর নানা দেশ ও মানুষের মধ্যে এভাবেই ভালোবাসার অটুট বন্ধন গড়ে উঠুক। 

 

Developed by DXDasia