বাঁকুড়া মিমস এবং উন্মেষ গাঙ্গুলি : একটি ‘সিরিয়াস’ সাক্ষাৎকার

সিনেদুনিয়া থেকে রাজনীতির ময়দান, বাঁকুড়া মিমসের তুরুপের তাস সকলেই

গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে প্রতিদিন বাংলা ছাড়িয়ে ভারতের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ‘বাঁকুড়া মিমস শর্টস’। মিম থেকে ভিডিও কন্টেন্ট, এই যাত্রা পথে জড়িয়েছে বহু বিতর্ক। সিনেদুনিয়া থেকে রাজনীতির ময়দান, বাঁকুড়া মিমসের তুরুপের তাস সকলেই। সোশ্যাল মিডিয়া, মিম, কনটেন্ট, কার লাভ-কার ক্ষতি সবকিছু নিয়েই অকপট টিমের অন্যতম প্রধান মুখ উন্মেষ গাঙ্গুলি। সুমন সাধুর সঙ্গে রইল ‘বাঁকুড়া মিমস’-এর একটি ‘সিরিয়াস’ সাক্ষাৎকার।

উন্মেষ গাঙ্গুলি (অন্যতম প্রধান, বাঁকুড়া মিমস শর্টস)

   বাংলা মিমের যখন সেই অর্থে তেমন কোনো বাজার ছিল না, সেই সময় থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনারা একটা ট্রেন্ড শুরু করেছিলেন। এই ‘বাঁকুড়া মিমস’-এর ধারণা কোথা থেকে এল?

উন্মেষঃ প্রথমদিকে যে মিমগুলো বানাতাম, সেখানে আমাদের বাঁকুড়ার আশেপাশের মানুষ, তাঁদের জীবনযাপন এসবই থাকত। আমি তখন মণিপালে থাকতাম বলে বাঁকুড়াকে প্রতিদিন মিস করতাম। সে সময় দেখতাম বেশ কয়েকজন মিম বানাচ্ছেন, কেউ অপারেট করছেন, কেউ অ্যাপ জেনারেট করছেন। তার ফলে মানুষের কাছে পৌঁছানোও যাচ্ছে সহজে। এরপরেই আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে ‘বাঁকুড়া মিমস’ নামে একটা ফেসবুক পেজ খুলেছিলাম প্রথম।

   তার মানে, আপনাদের মূল টার্গেট অডিয়েন্স ছিল মূলত বাঙালি।

উন্মেষঃ হ্যাঁ, এই টার্গেটটা প্রথম থেকেই ছিল – সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি।

   সাম্প্রতিক সময়ে সেলিব্রিটিরা নানারকমভাবে ট্রোলিং-এর স্বীকার হচ্ছেন। কেউ কেউ সোচ্চারও হচ্ছেন। আপনার কি মনে হয় বাংলা বাজারে ট্রোলিং-এ হেনস্থা হওয়ার ট্রেন্ডিং আপনারাই শুরু করেছিলেন?

উন্মেষঃ না, এটা আমার মনে হয় না। হেনস্থা তো মানুষ বহু বহু বছর ধরেই হয়ে আসছেন। ইন্টারনেট একটা মাধ্যম মাত্র। আপনার কি মনে হয়, ইন্টারনেট আসার আগে সেলিব্রিটিরা হেনস্থার স্বীকার হতেন না! নিশ্চয় হতেন। আজ অনেক মানুষই (বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম) দেব বা জিতের ছবি দেখতে হলে যান না। কিন্তু দেবের মতো অভিনেতারা পপ কালচারের একটা অংশ। সেখানে দেবকে নিয়ে যদি একটু মজা করি, তার মাধ্যমে তো তরুণদের কাছে পৌঁছাতে পারছি। এই সুপারস্টারদের কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না। ইন্ডাস্ট্রি তো তাঁদের জন্যেও ভালো ব্যবসা করছে। কথায় আছে, সব ধরনের প্রচারই দিনের শেষে আসলে প্রচার। এখন কোনো সেলিব্রিটি যদি বলেন মিমের ফলে তাঁদের শুধু ক্ষতিই হয়েছে, তাহলে তাঁরা কিছুটা মিথ্যে বলছেন। অনেকের কিন্তু লাভও হয়েছে।

   হ্যাঁ, এর ফলে সেলিব্রিটিদের নিয়ে সারাক্ষণ চর্চা হচ্ছে। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রচুর সাধারণ মানুষ আছেন, যাঁদের নিয়ে সে অর্থে কোনো চর্চা হয় না। তাঁরা কি কখনও আপনাদের টার্গেট ছিল না?

উন্মেষঃ সত্যি কথা বলতে, সবসময় প্ল্যানিং করে আমরা চলি না। আপনার আগের প্রশ্ন ধরেই বলি, রঞ্জিত মল্লিক, সৃজিত মুখার্জি এঁদের নিয়ে আমরা প্রচুর ট্রোল করেছি। আবার তাঁদের সঙ্গে দেখাও করে এসেছি। সৌজন্যের এই জায়গাটা তো রয়েছে। তাঁরা কিন্তু কেউ হেনস্থা হননি। 

   হ্যাঁ, তাঁরা আপনাদের কাজ মজাচ্ছলেই নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করি, বাঁকুড়া মিমের ফেসবুক পেজ বেশ কয়েকবার রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই বিতর্কে আপনাদের অবস্থান কীরকম ছিল?

উন্মেষঃ তেমন কোনো বক্তব্য ছিল না। কাজগুলো ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। এরপর কীভাবে আমাদের আটকানো যাবে! পাশাপাশি অনেক মানুষ আমাদের কাজ ভালো না লাগলে এড়িয়ে চলে যেতে পারছিলেন না। তাঁরা পেজ একাধিকবার রিপোর্ট করেছেন, লোক ডেকে এনেও রিপোর্ট করেছেন। আপনার কোনো একটি জিনিস খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু আপনি সেটা এড়িয়ে যাচ্ছেন না। বরং আরও দশটা লোককে ট্যাগ করে বলবেন, ‘এটা খারাপ, তোদেরও খারাপ লাগবে। এক্ষুনি রিপোর্ট কর বা ব্লক কর।’ এটাও কিন্তু আমাদের সমাজেরই একটা অংশ। 

   একদমই, খুব ভালো পয়েন্ট। আপনার কি মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়ার আধিক্যের জন্য আমরা অনেক বেশি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে যাচ্ছি?

উন্মেষঃ হ্যাঁ, কিছুটা তো বটেই। যদিও প্রতিহিংসা মানুষের আগেও ছিল। একটা সময় ছিল ‘চল লোক জড়ো করি’। সেটা পাড়ার মধ্যে সীমিত ছিল। এখন সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে এসেছে। প্রতিহিংসার জায়গাটা কিন্তু একই রয়ে গেছে। আসলে এখন হিংসা ছড়ানো খুব সহজ কাজ।

   কলকাতাকে ভারতের একমাত্র সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। সেই কারণে প্রচুর মানুষ এখনও মনে করেন, কলকাতায় না এলে কিচ্ছু হবে না। আপনিও ভিন্ন জেলা, মফস্‌সলের ছেলে। আপনাকেও নিশ্চয় এমন কথা শুনতে হয়েছে!

উন্মেষঃ আমার বড়ো হওয়া বাঁকুড়াতে। ছোটো থেকে ইচ্ছা ছিল মাস কমিউনিকেশন নিয়ে পড়ার। পড়েওছি এই বিষয় নিয়ে। কিন্তু একটা সময় বাঁকুড়ার মানুষ বুঝতেন না এই বিষয় নিয়ে পড়ে হবেটা কী! আদৌ কি ছেলে চাকরি পাবে! তখন আমাকেও বলা হত, কলকাতা গিয়ে পড়াশোনা কর। আবার যখন কলকাতায় এলাম, তখন এখানকার মানুষজন বলছেন, ‘তুই তো বাইরের ছেলে। তোর মধ্যে সেই কালচারটাই নেই।’ এই দ্বন্দ্ব সর্বত্র। তাহলে মফস্‌সল, গ্রামের ছেলেমেয়েদের কালচার নেই? কলকাতার এটা একটা খারাপ দিক, যেখানে অনেক মানুষ আজও ভাবেন কলকাতা ছাড়া এই বাংলায় কিচ্ছু নেই। এখন আমার প্রশ্ন, তাহলে ছেলে-মেয়েরা কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি চলে যাচ্ছে কেন? কলকাতাও তো সেই পরিমাণ সুযোগ, অর্থ তৈরি করতে পারছে না। সারাক্ষণ কলকাতা কলকাতা বলে চেঁচিয়ে গেলে তো হবে না। কলকাতার এই ‘এলিট’ কালচার আমি পছন্দ করি না।

   বাঁকুড়া মিমস কতটা রাজনীতি সচেতন?

উন্মেষঃ আমি ‘বঙ্গদর্শন’-এর সমস্ত পাঠক-শ্রোতার উদ্দেশে বলতে চাই, টাকা নিয়ে আমরা কখনও কোনো রাজনৈতিক দলের প্রোমোশন করব না। আমাদের নিজস্ব কমেডি কন্টেন্ট বানানোর হলে করব। যেমন এর আগেও আমরা মদন মিত্র এবং শতরূপ ঘোষকে নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু কোনো দল যদি, আমাদের বলেন, ভোটের আগে আমাদের নিয়ে দুটো ভালো ভালো কথা বলো, আমরা বলব না।

   খুব ভালো। কিন্তু কেন বলবেন না?

উন্মেষঃ তাহলে তো গণমাধ্যম আর বাঁকুড়া মিমসের কোনো পার্থক্য রইল না। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। যে-কোনো শিল্পে স্বাধীন চিন্তা-ভাবনা থাকা জরুরি। সমালোচনা করলে আমাদের দেশে তাঁকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমি যদি নিজেকে এতটুকুও শিল্পী ভাবি, তাহলে কেন টাকা নিয়ে অন্যের হয়ে কথা বলব? আমার তো নিজের কিছু কথা থাকবে। সেই নিজের কথাটুকুই আমার কন্টেন্ট। ভালো-মন্দ যাই হোক।

   মিম থেকে পুরোপুরি ভিডিও কন্টেন্টের দিকে চলে যাওয়া কি ইচ্ছা করেই?

উন্মেষঃ  আমার মনে হয়, আজ যদি ঋত্বিক ঘটক বেঁচে থাকতেন, তাহলে উনিও হয়তো ইন্টারনেটকেই বেছে নিতেন। ইন্টারনেট এমন একটা মাধ্যম, যেখানে খুব সহজে চটজলদি আমার কাজ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতে পারছি। একটা কথা যদি সাধারণ মানুষকে শোনাতে চাই, তাহলে ভিডিওর কন্টেন্ট, ওয়েব সিরিজ বা ছোটো স্কেচ ছাড়া উপায় নেই। যদিও মিম বানানো পুরোপুরি ছেড়ে দিইনি। তবে আমরা এখন অনেকটা সংযত হয়ে গিয়েছি। কারণ আমরা মূলত রাজনৈতিক মিম বানাতাম। এখন যদি দেখি সেটা কোনো দল তাদের আইটি সেলের মাধ্যমে ব্যবহার করে নিজেদের প্রোমোট করছে বা অন্যদের তুলোধোনা করছে, সেখানে আমার অসুবিধা আছে। আমি চাই না এমনটা হোক।

   বাঁকুড়া মিমস সাংঘাতিক কিছু হিউমার নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ মানুষ সরাসরি সেটা সংযোগ করতে পারে নিজের সঙ্গে। কিন্তু বাঁকুড়া মিমসের কাজ মানুষকে কতটা ভাবায়?

উন্মেষঃ কতটা ভাবায় বলতে পারব না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, আমরা একটা নিজস্ব দর্শকমহল তৈরি করতে পেরেছি, যারা আমাদের প্রতি সৎ। আমরা খারাপ কাজ করলে তাঁরা কিন্তু বলবেন, দাদা কাজটা ভালো লাগল না। এটুকু ভরসা আমার দর্শকদের প্রতি আছে।

   বাংলায় এখনও স্ট্যান্ড-আপ কমেডির বাজার তৈরি হয়নি। আপনাদের এটা নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছা করে না?

উন্মেষঃ ইচ্ছা আছে। নিজেদের আরও গ্রুম করে তারপর মাঠে নামব। এখনই হয়তো পারব না। তবে স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করলে বাংলা ভাষাতেই করব।

   সোশ্যাল মিডিয়া এখন যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ভবিষ্যৎটা কী দেখতে পাচ্ছেন?

উন্মেষঃ দেখুন, আগামী দশ বছর পর সবাই কন্টেন্ট ক্রিয়েটার হয়ে যাবে। তখন একটা ভিডিও যখন ভাইরাল হয়ে যাবে, সেটা নিয়ে অত মাতামাতি হবে না। আলাদাভাবে দর্শক বলে কিছু থাকবে না। সবাই কিছু না কিছু করবে। এবং মানুষ এটায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। এর ভালো-খারাপ সবদিকই আছে। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপের মতো ব্যাপার আরকি। আসলে কিছুই বলা যায় না। 

   যদুবাবুর টিউশানির স্ক্রিপ্ট খুব ভালো। তিনটে পর্বই সাংঘাতিক ভাইরাল হয়েছে। যদুবাবু, নিতাই, প্যারা এদের পেলেন কোত্থেকে?

উন্মেষঃ এঁদের আমি দেখেছি ছোটোবেলা থেকে। তাঁরা সকলেই বাঁকুড়ার মাটির মানুষ। আমরাও যদুবাবুর ছাত্রদের মতো দুষ্টু ছিলাম। প্যারা নামে সত্যিকারের একজন মেয়ে ছিল, যার ছাতনাতেই বাড়ি।

   এখনও অবধি বাঁকুড়া মিমস শর্টসের কোন কাজটা আপনার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ?

উন্মেষঃ ‘মিনিট খানেক সঙ্গে চুমন’ নামে একটা সিরিজ করতাম। সঞ্চালক চুমন বিভিন্ন ধরনের মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতেন। সেখানে ‘অমর জঙ্গি’ বলে একটা পর্ব করেছিলাম। সঞ্চালক একজন সন্ত্রাসবাদীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এটা কিন্তু মিডিয়ার দুনিয়ায় দুর্লভ, যেখানে সঞ্চালক ঘটা করে একজন সন্ত্রাসবাদীকে সাজিয়ে-গুছিয়ে স্টুডিওতে নিয়ে এসেছেন তাঁর কথা শুনবেন বলে। কেউ তো ছোটো থেকেই সন্ত্রাসবাদী হন না, পরিস্থিতি তাঁকে দিয়ে কাজগুলো করিয়ে নেয়। স্ক্রিপ্টটা আমার দাদার (উদ্দীপ্ত গাঙ্গুলি) লেখা ছিল। ওই কাজটা আমার খুব পছন্দের।

   আপনাদের ইউটিউবে এখন সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৩ লক্ষ ছাড়িয়েছে। ইউটিউব থেকে প্রথম উপার্জন দিয়ে কী করেছিলেন?

উন্মেষঃ প্রথম উপার্জন থেকে আমরা একটা সিনেমা বানিয়েছিলাম। ‘বেলুনওয়ালা’ ছবিটার নাম। এখনও আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে আছে।

(বাঁকুড়া মিমস শর্টস আগামীদিনে ওয়েব সিরিজ বানাবে বলে মনস্থির করেছেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক ‘ফ্যামিলি স্কেচ’-এর মতো আরও নতুন নতুন স্কেচ নিয়ে হাজির হবেন তাঁরা।)

Developed by DXDasia