আয়োজনে বালি সাধারণ গ্রন্থাগারের কর্মীসংঘ
গঙ্গার ধারে বালি অ্যাথলেটিক ক্লাবের মাঠ। জেলা হাওড়া। দিনটা ২৫শে ডিসেম্বর। রঙিন ছাতার নিচে একদল মানুষ নিজের মনে ছবি আঁকছেন। আর বহু মানুষ আগ্রহ ভরে দেখছেন কীভাবে রূপ আর অরূপের সীমানা মুছে যায় ক্যানভাসের মধ্যে তুলির একেকটি আঁচড়ে। এইভাবেই শিল্পী আর শিল্পরসিকদের ভিড়ে জমে উঠেছে ‘শিল্পীশিবির’-এর ২৭তম বছর। সৌমেন চারুকলা উৎসবের অংশ হিসেবে এই সৃজন অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে বালি সাধারণ গ্রন্থাগারের কর্মীসংঘ। সহযোগিতায় ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রালয়।
১৯ শতকের শেষে যখন সবে গঙ্গার পশ্চিম তীরে বালিতে কিছু শিল্প কারখানাকে ঘিরে একটি ছোটো শহর ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে, ওই সময়েই ১৮৮৫ সালে এলাকার কিছু বইপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে তৈরি হয় বালি সাধারণ গ্রন্থাগার। গত ২০১০-১১ সালে ধুমধাম করে লাইব্রেরির ১২৫ বছর উদযাপিত হল। পশ্চিমবঙ্গের তখনকার রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়কার উপাচার্য অধ্যাপক করুণাসিন্ধু দাসের মতো বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন সেই উদযাপনে। লাইব্রেরি চালু হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর ধরে এলাকার কয়েকজন বইপ্রেমী মানুষ লাইব্রেরিকে ভালোবেসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সেখানকার যাবতীয় কাজকর্ম চালাতেন। তাঁরাই ১৯৪০ সালের ১২ আগস্ট জন্মাষ্ঠমীর দিনে তোলেন ‘কর্মীসংঘ’। অর্থের বিনিময়ে নয়, বরং দেশ ও জাতির সেবা করার উদ্দেশ্যে এই কর্মীসংঘ লাইব্রেরিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলার শপথ নিয়ে থাকেন। তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইব্রেরি এবং বইয়ের নিবিড় সংযোগ বানিয়ে তোলাও তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। তারপর ১৯৮০ সালে এই গ্রন্থাগার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে টাউন লাইব্রেরির মর্যাদা পায়। এখন কর্মীসংঘের স্বেচ্ছাসেবী সদস্যের সংখ্যা ৬৬।

কর্মীসংঘের লোগো এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। লাইব্রেরির দৈনন্দিন কাজ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে চালানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মীসংঘ বছরের নানা সময়ে বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। গত ৩৭ বছর ধরে তাঁরা প্রত্যেক বাংলা নববর্ষের দিনে বন্দোবস্ত করে থাকেন রক্তদান শিবিরের। লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা দিবসে হয়ে থাকে পুরোনো এবং বর্তমান সদস্যদের পুনর্মিলন। আর ‘সৌমেন চারুকলা উৎসব’-এর ব্যানারে সৃজন আর মননের হরেক আয়োজন তো থাকেই। এই উৎসবেরই অংশ হিসেবে প্রত্যেক বছর থাকে বক্তৃতা এবং কর্মশালা, গত ১১ বছর ধরে চলছে ফটোগ্রাফি প্রদর্শন, আর সৌমেন চারুকলা উৎসবের শুরু থেকেই গত ২৭ বছর ধরে ডিসেম্বরের শেষে আয়োজিত হয় শিল্পীশিবির।
বালি সাধারণ গ্রন্থাগার কর্মীসংঘের উদ্যোগে চলে আসা এই শিল্পীশিবিরের অতীত বেশ সমৃদ্ধ। বি আর পানেসর, সুধীর মৈত্র, সুনীল দাশ, সমীর বিশ্বাস, শানু লাহিড়ী, উমা সিদ্ধান্ত, রবীন মণ্ডল, অনিতা চৌধুরী, গনেশ হালুই, ধীরাজ চৌধুরী, চণ্ডী লাহিড়ী, পার্থপ্রতীম দেব, স্বপ্নেশ চৌধুরী, হিরণ মিত্র, অসিত পাল, দেবব্রত চক্রবর্তী, অনুপ রায় নির্মলেন্দু মণ্ডল, অশোক মল্লিক, বিমল কুণ্ডু-র মতো বিভিন্ন প্রজন্মের অনেক গুণী কলাকার আগের বছরগুলিতে এই শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। এসেছিলেন শান্তিনিকেতনের শিল্পীরাও। বাংলার নানা প্রান্তের গ্রাম থেকে শিল্পীরা এসে শিবিরের মাঠে নিজের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করেন। মেদিনীপুরের নয়াগ্রামের পটুয়ারা, পুরুলিয়ার চোড়িদার ছৌ শিল্পীরাও এসেছেন আগে। এ বছর বর্ধমানের অগ্রদীপ থেকে এসেছিলেন কাঠের পুতুল শিল্পীরা। তরুণ চক্রবর্তী, অশোক মণ্ডল, মানিক কান্ডাহার, ইন্দ্রাণী বাগ, চিন্ময় মুখোপাধ্যায়, শৈবাল মুখোপাধ্যায়, তরুণিমা ধর, তনিমা ভট্টাচার্য, রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়, রৌনক পাত্র, সঞ্জীব দাশের মতো শিল্পীরাও এবারের শিবিরে সৃজনের চর্চা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্য এবং বড়ো সংখ্যক কর্মী ও সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে কলেবরে এবং আড়ম্বরে বেড়েছে এবছরের সৌমেন চারুকলা উৎসব।