দেবী চৌধুরানির স্মৃতি বিজড়িত বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য

স্থানীয় লোকের বিশ্বাস, এখানে মহাভারতের যুগে আশ্রয় নিয়েছিলেন কৃষ্ণ

“যখন আমরা এক গ্লাস জল খাই, নোটবুকে লিখি, জ্বর হলে ওষুধ খাই কিংবা বাড়ি তৈরি করি – সব কিছুর সঙ্গেই রয়েছে বনের যোগাযোগ। একইভাবে জীবনের নানা বিষয় কোনও না কোনওভাবে জঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে।” আন্তর্জাতিক বন দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে একথাই বলা আছে রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটে। সাধারণ সভা অনুমোদন করার পর ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ মার্চ তারিখে এই দিনটি উদযাপন করে রাষ্ট্রসংঘ। অরণ্য সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেয় সারা বিশ্বে।

এ বছর আন্তর্জাতিক বন দিবসের থিম ছিল ‘অরণ্য পুনরুদ্ধার: আরোগ্য এবং কল্যাণের পথে’। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের সংকট থেকে মুক্তির জন্য খুব জরুরি এই দিশা। স্থিতিশীল উন্নয়নের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পরিষেবা এভাবেই তৈরি হবে। “আর্থিক সক্রিয়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হবে ও জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটবে” – উঠে আসে রাষ্ট্রসংঘের বার্তায়।

বাংলার বেশির ভাগ মানুষই জঙ্গল বলতে সুন্দরবনকেই বোঝেন। তার যথেষ্ট কারণও আছে। বিশ্বের সবথেকে বড়ো ম্যানগ্রোভ অরণ্য। বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের আবাস – আমাদের বেঁচে থাকার জন্যও সুন্দরবনের ভূমিকা রয়েছে। তবে যদি উত্তরবঙ্গের দিকে চোখ ঘোরাই, সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে আরেকটি বিশাল অরণ্যের দেখা পাব। যার নাম বৈকুণ্ঠপুর।

ভৌগোলিকভাবে তরাই জঙ্গলের একটি অংশ বৈকুণ্ঠপুর। ডুয়ার্সের কিছুটা পশ্চিম ভাগ, হিমালয়ের পাদদেশের কিছুটা দক্ষিণ ভাগ নিয়ে মহানন্দা এবং তিস্তা নদীর মাঝখানে এই অরণ্যের অবস্থান। খানিকটা দার্জিলিং এবং খানিকটা জলপাইগুড়ি জেলায় বিস্তৃত। কাছের গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে আছে শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়ি। বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল এক সময় ছিল কোচবিহারের রাইকট রাজপুত্রদের ঘাঁটি। স্থানীয় লোকের বিশ্বাস, এখানে মহাভারতের যুগে আশ্রয় নিয়েছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ। যে কারণে ইসকনের এক বড়োসড়ো কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে শিলিগুড়িতে।

আরেকটি কারণে এই জঙ্গল বিখ্যাত। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মাধ্যমে বাঙালি জেনেছে দেবী চৌধুরানি এবং ভবানী পাঠকের নাম। সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের সময় তাঁরা এখানে থাকতেন। জলপাইগুড়ি শহরের বাইরে আজও দেখতে পাবেন দেবী চৌধুরানির মন্দির। ভবানী পাঠক এবং প্রফুল্ল যুদ্ধে যাওয়ার আগে মন্দিরে কালীপুজো করতেন। তিস্তা নদীর জলে দাপিয়ে বেড়াত তাঁদের বজরা। 

ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখে তাঁরা ছিলেন ডাকাতের সর্দার। ১৮ শতকের শেষে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সারা বাংলায় হিন্দু সন্ন্যাসী এবং মুসলমান ফকিরদের বিদ্রোহ চলছিল। মুর্শিদাবাদ এবং বৈকুণ্ঠপুর ছিল বিদ্রোহের কেন্দ্র। উত্তরবঙ্গে সন্নাসীদের নেতৃত্ব দিতেন দেবী চৌধুরানী এবং ভবানী পাঠক। দু’জনকে এখন দেবতার মতো পুজো করা হয় ওই কালী মন্দিরে। পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে সারা বছর।

বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য নাম বৈকুণ্ঠপুর। বিশেষ করে প্রচুর বুনো হাতির বাস। বনের কিছু অংশে মানুষের বসবাসের কারণে পশুপাখিদের জীবনযাপন ব্যাহত হয়েছে ঠিকই, আবার কিছু অংশে নির্বিঘ্নেই থাকে জীবজন্তুরা। যেমন মহানন্দা অভয়ারণ্য।

এই অঞ্চলে আগে ছিল ম্যালেরিয়ার দাপট। চা উৎপাদন শুরু হলে ম্যালেরিয়া কমতে থাকে। বাড়তে থাকে জনবসতি। গত ৫০ বছরে ঘন অরণ্য কমে যায় অনেকটাই। হিসেব বলছে, তরাই জঙ্গলের ২৫ শতাংশ আজ টিকে আছে। ৪৩ শতাংশ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে কৃষি এবং অকৃষিজমি। চা বাগান হয়েছে ১৫ শতাংশ এলাকায়। 

জমি পরিষ্কার করা, টেরেসিং, খনি তৈরি, এবং বাড়ি নির্মাণ – এই সব কারণেই বনের অনেকটা ধ্বংস হয়েছে। ভূমিক্ষয় এবং জলের গুণমাণ নষ্ট হওয়ার পিছনেও এগুলো দায়ী। এছাড়া নির্বিচারে বেআইনি উপায়ে গাছ কাটা এবং গৃহপালিত পশুদের লাগামহীন চরে বেড়ানোও প্রচুর ক্ষতি করে। ভোপালের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৯৩ শতাংশ বাড়ির জন্য বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল থেকেই জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়। ফলে আসতে চলেছে বিপর্যয়। 

হাতির সংখ্যা যেহেতু বাড়ছে, মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাত রোখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক বছর বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট ডিভিশন বহু লক্ষ টাকার চোরাই কাঠ বাজেয়াপ্ত করে মহানন্দা অভয়ারণ্য এবং বৈকুণ্ঠপুর সংরক্ষিত অরণ্য থেকে। কিন্তু এখনও কাঠ চোরাচালান বন্ধ হয়নি। 

এত কিছুর পরেও বৈকুণ্ঠপুর অরণ্যের আদিম সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না। প্রাণী এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র্যও মুগ্ধ করে। শিলিগুড়ি থেকে সড়কপথে মহানন্দা অভয়ারণ্যে পৌঁছনো যায় মাত্র ৩০ মিনিটে। অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার সুকনার দূরত্ব শিলিগুড়ি থেকে ১৩ কিলোমিটার এবং বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে ২৮ কিলোমিটার। সংরক্ষিত বনের প্রায় ১৫৯ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে তৈরি হয়েছে অভয়ারণ্য। ১৯৫৫ সালে ক্রীড়া অভয়ারণ্য হিসেবে শুরু হওয়ার পর ১৯৫৯ সালে পরিপূর্ণ অভয়ারণ্যের মর্যাদা পায়। উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় বাইসন এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে সংরক্ষণ করা।

অভয়ারণ্যের সবথেকে উঁচু পয়েন্ট লাটপাঞ্চার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪২০০ ফুট উঁচুতে। পাখি প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য এই অভয়ারণ্য। রুফুয়স ঘাড়যুক্ত ধনেশ, কাও ধনেশ, রাজ ধনেশের মতো বিপন্ন পাখি যেমন পাবেন, ছোটো সাহেলি, ছাতারে, আবাবিলের মতো পাখিও আছে প্রচুর। জন্তুদের মধ্যে রয়েছে হিমালয়ের সেরো, হিমালয়ের কালো ভালুক, মায়া হরিণ, সম্বর হরিণ, ম্রঘলা চিতা, ভারতীয় হাতি, ভারতীয় বাইসন, মেছো বেড়াল, বনবেড়াল।

গজলডোবা অঞ্চলের জলাভূমিও প্রভাবিত করে অভয়ারণ্যকে। তিস্তা সেতু তৈরির সময় সেচের জন্য এইসব হ্রদ গড়ে উঠেছিল। শিলিগুড়ি থেকে এক ঘণ্টা ড্রাই করে গজলডোবা পৌঁছনো যায়। বৈকুণ্ঠপুরের খুব কাছেই। মধ্য এশিয়া এবং লাদাখ থেকে প্রচুর পাখি আসে এইসব জলাশয়ে। যার মধ্যে পাবেন চখাচখি, দাগি রাজহাঁস, ভুতিহাঁস, ল্যাঞ্জাহাঁস। 

কয়েক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে গজলডোবা হয়ে উঠেছে ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন।   নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চারদিকে। আরেকটা সুবিধে হল, হাতে কাছে পেয়ে যাবেন বেশ কিছু ডেস্টিনেশন। যেমন শিলিগুড়ি (৩০ কিলোমিটার), জলপাইগুড়ি (৪০ কিলোমিটার), ওদলাবাড়ি (২০ কিলোমিটার) এবং গরুমারা জাতীয় উদ্যান (২৬ কিলোমিটার)। অর্থাৎ গজলডোবায় কয়েকদিন থেকে সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন আশেপাশে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। উন্নয়ন এবং পরিকাঠামোর জন্য চিহ্নিত করা হয় ২০০ একরের বেশি জায়গা। অদূর ভবিষ্যতে গজলডোবা যাতে হয়ে ওঠে জমজমাট ট্যুরিস্ট হটস্পট, তেমনই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গজলডোবায় পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব ভোরের আলো ট্যুরিজম প্রপার্টির এসি কটেজে পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে থাকতে পারেন স্বচ্ছন্দে। বুকিং এবং অন্যান্য তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন – 
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
 

Developed by DXDasia