প্রবল দারিদ্রেও নস্টালজিয়া আগলে রেখেছেন রাজ কাপুর, উত্তমকুমারের সিনেমাটোগ্রাফার

বছর কয়েক নেপালের রাজপরিবারের ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি

কলকাতার উত্তর শহরতলিতে পানশিলার খালপাড়ে এক চিলতে ঘরে তাঁর বাসা। বয়সের ছাপ পড়েছে শরীরে। বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন দুপুরে দু’মুঠো ভাত খেতে যান দু’কিলোমিটার দূরে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানে অন্নপূর্ণা প্রকল্পে সহায়সম্বলহীন আর্থিকভাবে পিছিয়েপড়া মানুষদের জন্য পাত পড়ে। সেই দরিদ্রসেবায় পেট ভরান তিনিও। ছেলে ডেকরেটর্সের দোকানে সামান্য রোজগার করেন। রয়েছেন পুত্রবধূ এবং নাতি। সব মিলিয়ে অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর থেকেও খারাপ অবস্থা। এসবের মধ্যেও প্রবীণ মানুষটির মনে জেগে থাকে পুরোনো দিনের স্মৃতি। যে স্মৃতির মূল্য কোনো টাকার অঙ্কেই পরিমাপ করা যায় না।

তিনি বৈদ্যনাথ বসাক। একসময়ে পেশায় ছিলেন সিনেমাটোগ্রাফার। তরুণ বয়সে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন কলকাতার বিভূতি লাহার কাছে। সেটা ১৯৪৭ সাল। ভারত তখন স্বাধীন হয়েছে সবে। তারপর বোম্বের চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেলেন। পাঁচের দশকে রাজ কাপুরের প্রযোজনায় ‘বুট পালিশ’ ছবিতে সরকারী সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। এরপর ‘শ্রী ৪২০’ ছবিতে কাজের জন্য ডাক পেলেন বৈদ্যনাথ। সেই ছবি পরিচালনা করেছিলেন রাজ কাপুর নিজেই। কিন্তু বৈদনাথ সেই কাজে অসম্মতি জানান।

 
ততদিনে তিনি কলকাতায় ফিরে এসেছেন। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ছবি ‘অগ্নিপরীক্ষা’র জন্য অগ্রদূতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তারপর একে একে করে ক্যামেরার কাজ করলেন ‘সবার উপরে’, ‘লালু ভুলু’, সাগরিকা’, ‘সোনার খাঁচা’, ‘সূর্যসাক্ষী’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘নায়িকা সংবাদ’, ‘বাদশা’, ‘অপরাহ্নের আলো’-র মতো ছবিতে। উত্তমকুমারের প্রচুর ছবির ক্যামেরায় দায়িত্বে ছিলেন। মহানায়কের সঙ্গে ৭২টি ছবিতে কাজ করেছেন বৈদ্যনাথ। নবীন চিত্র পরিচালক রাজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাড়’ ছবিতে ক্যামেরার মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি ক্যামেরার দায়িত্ব সামলেছেন ‘হরিয়ালি অউর রাস্তা’, ‘কিতনে পাস কিতনে দূর’-এর মতো হিন্দি ছবিতে। কেরল, ওড়িশা, বিহারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন। কয়েক বছর ছিলেন নেপালের রাজপরিবারের ফটোগ্রাফার। নেপালের রাজনৈতিক অশান্তিতে ফিরে আসেন দেশে। 

সেই বৈদ্যনাথ বসাকের এখন আর্থিক হাল খুবই খারাপ। ভেঙে পড়েছে শরীরও। স্ত্রী সরস্বতী বসাক প্রয়াত হয়েছেন বছর পনেরো আগে। অশীতিপর এই বৃদ্ধকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকজন নামি-অনামি মানুষ এবং রামকৃষ্ণ মিশন। তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন এই প্রবীণ শিল্পী। সাদাকালো যুগের রঙিন স্মৃতিকে সম্বল করেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান তিনি। 

Developed by DXDasia