
ঝাড়গ্রামের কেন্দুয়ানা গ্রামে বাবলু তৈরি করেছেন মুণ্ডা পিগ ফার্ম
বর্তমান সময়ে বাংলা তথা সারা দেশেই গবাদি শুয়োর প্রতিপালন অন্যতম আকর্ষণীয় ও লাভজনক পশুসম্পদ ব্যবসা হিসাবে উঠে এসেছে। গত কয়েক বছরে, পশ্চিমবঙ্গের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে পেশা হিসাবে শুয়োর প্রতিপালনের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এই ব্যবসাতে স্থায়ীভাবে লাভের মুখ দেখা যায় এবং উন্নতি করা যায় খুব তাড়াতাড়ি।
কয়েকবছর আগে পর্যন্তও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গবাদি শুয়োর প্রতিপালন করা হতো খুবই স্বল্প পরিসরে। মানুষের জীবনে গবাদি শূকরের বিভিন্ন ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শুয়োরের মাংস উচ্চ-প্রোটিন সম্পন্ন খাদ্য। এছাড়া, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শুয়োর বা শুয়োরের মাংস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেকে। এছাড়া শুয়োরের শরীর নিঃসৃত বর্জ্য জমির উর্বরতা বাড়ায়। আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি অনেক সম্প্রদায়ের কাছে শুয়োর প্রতিপালন তাঁদের সংস্কৃতিরও অঙ্গ। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে শুয়োর খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম এবং তাদের শরীর নিঃসৃত বর্জ্য তাঁরা ব্যবহার করেন জমির সার হিসাবে।

প্রাচীনকাল থেকেই শুয়োর প্রতিপালন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের মধ্যেই সীমিত ছিলো এবং এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ধারণার সম্পূর্ণ বদল ঘটেছে। বাংলা তথা সারা দেশেই বাণিজ্যিকভাবে শুয়োর প্রতিপালন শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া জনজাতিদের মধ্যে আটকে নেই। সমাজের সর্বস্তরের মানুষই, অন্যান্য গবাদি পশুর মতন, গৃহপালিত শুয়োরের বাণিজ্যিক মূল্য সম্পর্কে সচেতন হয়েছে।
শুয়োর প্রতিপালন বাংলার গ্রামগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাঁরা মানছেন যে, যদি যত্ন সহকারে এই ব্যবসার পিছনে সময় দেওয়া যায়, তবে লাভের পরিমাণে কোনও কমতি থাকে না। পশ্চিমবঙ্গ এবং আশেপাশের রাজ্যে গৃহপালিত শুয়োরের চাহিদা বিপুল। স্থানীয় শুয়োর প্রজাতিগুলিকে সহজেই প্রতিপালন করা যায়।

কয়েকবছর আগে পর্যন্তও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গবাদি শুয়োর প্রতিপালন করা হতো খুবই স্বল্প পরিসরে। মানুষের জীবনে গবাদি শূকরের বিভিন্ন ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শুয়োরের মাংস উচ্চ-প্রোটিন সম্পন্ন খাদ্য।
সম্প্রতি বাবলু সিং নামের একজন চাষি, রাজ্য সরকারের প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের সহায়তায়, তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প মুণ্ডা পিগ ফার্ম শুরু করেছেন। বাবলু সিং কেন্দুয়ানা গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটি ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের তপসিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। তিনি এই প্রকল্পের জন্য কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অ্যানিমাল হাজবেন্ডারি অ্যান্ড ফিশারি ঋণ (Animal Husbandery and Fishery KCC-AH Loan) পেয়েছেন। বাবলু একজন প্রান্তিক চাষি। ৪-৫ রকমের দেশি শুয়োর প্রতিপালন করেন। বাবলু সিং একবার তাঁর পোষ্যদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ব্লক পশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেখানে KCC-ARD স্কিম-এর ব্যাপারে তাঁকে অবগত করান এলাকার স্থানীয় ব্লক লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট অফিসার। বাবলু এই ঋণ পেয়েছেন দুয়ারে সরকার প্রকল্প-এর মাধ্যমে। প্রসঙ্গত, দুয়ারে সরকার হলো রাজ্য সরকার পরিচালিত একটি প্রকল্প, যা বছরের বিভিন্ন সময়ে ৩০ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে, পঞ্চায়েত এবং পৌরসভা এলাকায় ক্যাম্প করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
তাঁর এলাকায় হওয়া এমনই একটি ক্যাম্প থেকে বাবলু সিং ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে ঋণের জন্য আবেদন করেন। তাঁর আবেদনপত্রটি ২৩ ফেব্রুয়ারিতে ব্যাঙ্কে পাঠানো হয় এবং ঋণের অনুমোদন পান ২০২২ সালের মে মাসের ২৬ তারিখে।

ঋণ পাওয়ার পর বাবলু সিং গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকে তাঁর শুয়োর প্রতিপালন কেন্দ্রটি স্থাপন করেন। স্থানীয় ব্লক লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট অফিসার তাঁকে প্রতিটি ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন। শুয়োরের খাদ্য হিসাবে কোন জিনিস উপযোগী, তা কীভাবে তৈরি করতে হয়, কীভাবে প্রতিপালন করলে পোষ্যের বৃদ্ধি ভালো আর তাড়াতাড়ি হবে, সেসব শেখানো হয় তাঁকে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শুয়োর প্রতিপালনের প্রক্রিয়া শেখানো হয় হাতেকলমে। ফার্মের পরিকাঠামো তৈরিতেও সাহায্য করা হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই বাবলু সিং এই পেশায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্নতি করেছেন। এখন তাঁর ফার্মে দেশি প্রজাতির শুয়োরের সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট ইয়র্কশায়ার (White Yorkshire) প্রজাতির শুয়োরও প্রতিপালন করেন। এই প্রজাতির শুয়োরের বিপুল চাহিদা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ-সহ সিকিম, এমনকি নেপাল আর ভুটানেও। KCC-AH ফান্ডের সহায়তায় বাবলু সিং একজন দক্ষ এবং সফল শুয়োর প্রতিপালক হয়ে উঠেছেন।
২০২২-২৩ সালে রাজ্য সরকারি স্কিমে ঝাড়গ্রামের বাবলু সিং একজন পশুসম্পদ সরবরাহকারী হিসাবে নথিভুক্ত হয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যেই বিনপুর-১ ব্লকে, ব্লক লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট অফিসের জন্য ১০টি শূকরছানা সরবরাহ করেছেন। একজন সফল শুয়োর প্রতিপালক এবং ‘স্মার্ট চাষি’ বাবলু সিং এখন এলাকায় একটি পরিচিত নাম।
