নিউইয়র্ক, মেক্সিকো, সিডনি, জার্মানির বহু বিদেশি এই ক্লাসে রবীন্দ্র সংগীত শেখেন
মার্কোস গাইসলার একজন তরুণ জার্মান নাগরিক। বাংলার সঙ্গে নিজেকে বেঁধেছেন রবীন্দ্র সংগীতে। নিয়মিত রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা করে চলেছেন এই জার্মান তরুণ। নির্ভুল উচ্চারণে এবং যথাযথ সুরে আপনাকে মার্কোস রবীন্দ্রসংগীত শুনিয়ে দিতে পারবে অনায়াসে। যখন মার্কোসের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, তখন শুনেছিলাম রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে তার অনুভূতির কথা। হোয়াটসঅ্যাপ কলে মার্কোস বলেছিল, ‘‘জার্মানিতে নিত্যদিন আমার কাজের ফাঁকে রবীন্দ্র সংগীত মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে৷ তাঁর গানের সুন্দর সুর আমাকে প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে রাখে৷ তাই আমি রবীন্দ্র সংগীত পছন্দ করি৷ এই শীতে বার্লিনে বসে যখন টেগোরের গান গাই, আমার হৃদয় উষ্ণ হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার মাধুর্যও আমি এই গানের সূত্রে বুঝতে পেরেছি।”

শান্তিনিকেতনি আবহে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনা করছেন বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা
ছন্দা দত্ত বলেন, “সুরের সঙ্গে ওঁদের আগে পরিচয় ছিল না, মানে গান জানতেন না৷ যেহেতু জার্মান ভাষা আমার জানা ছিল না, তাই আমাকে ইংরেজিতে এসএমএস-এর মতো গানের বাণী লিখে দিতে হয়েছে৷”
রবীন্দ্রনাথের গান যে শুধু বাঙালিদের আবিষ্ট করে রাখে তা নয়, বিদেশিদেরও তা আচ্ছন্ন করে রাখে বৈকি! শুধু মার্কোস নয়, ভারতের বাইরে অনেক বিদেশি এই কারণে রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা করছেন। নেপথ্যে অনলাইন টিউটোরিয়াল। সেই শিক্ষার আসর নিয়মিত বসে হুগলি জেলার চন্দননগরে। ‘সুর ছন্দ’ গানের স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ছন্দা দত্ত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী হিসেবে খ্যাতনামা। পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীতের প্রশিক্ষণ করান তিনি। বাংলাদেশের ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামে গান শিখিয়েছেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত এই শিক্ষিকা। ৪০ বছর ধরে তিনি গান শেখাচ্ছেন। মায়া সেন, প্রমিতা মল্লিক, সুমিত্রা সেন, অপালা বসু সেন প্রমুখদের কাছে রবীন্দ্র সংগীতে শিখেছেন তিনি। নজরুল গীতির তালিম নিয়েছেন পূরবী দত্তের কাছে। বিদুষী শুভ্রা গুহের কাছে সংগীত রিসার্চ একাডেমিতে উচ্চাঙ্গ সংগীত তালিম নিয়েছেন।
কোভিড পিরিয়ডে মানুষ অনলাইনের গুরুত্ব বুঝেছিল। দিকে দিকে অনলাইনে পড়াশোনা, সংগীত চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তার বহু আগে থেকেই ২০১২ সাল থেকে ছন্দা অনলাইনে গান শিখিয়ে চলেছেন। নিউইয়র্ক, মেক্সিকো, সিডনি, জার্মানি, নিউ জার্সির বহু বিদেশি এবং প্রবাসী ছন্দার এই ক্লাসে গান শেখেন। সপ্তাহে একদিন একঘণ্টা করে এরা গানের ক্লাসে অংশ নেন।
ছন্দা দত্তের সঙ্গে গল্প করতে করতে উঠে আসে অতীতের কথা। তাঁর দাদার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেশ কিছু বিদেশি৷ দাদার পরিচয়ের সূত্রে ছন্দার চন্দননগরের বাড়িতে এসেছিলেন কয়েকজন জার্মান তরুণ-তরুণী৷ বঙ্গদর্শন.কম-কে ছন্দা বলেন, “ওঁরা রবীন্দ্রনাথের গানটা ভালোবাসেণ। ওঁরা গান জানতেন না, আমার বাড়িতে এসে গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গান শিখতে চান। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও কিছু জানতেন না। আমার কাছে এসেই ওঁরা রবীন্দ্রনাথকে জানতে পারেন।”

ছন্দা দত্তের প্রথম বিদেশি ছাত্রী
মার্কোসের মতোই এখনও ওয়াশিংটনের শিনাইল এবং শিকাগোর জেকব ছন্দার কাছে বিদেশ থেকে গান শিখছে। ছন্দার বাড়িতে ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকায় মিলান, মার্কোস, জুলিয়ারা ছিলেন একসময়।
তবে নিছক তোতাপাখির মতো গান মুখস্থ করেনি শিক্ষার্থীরা৷ শব্দের মানে বুঝে হৃদয়ঙ্গম করেই তা শিখেছে৷ ঠোঁটস্থ করার সঙ্গে সেটা তাঁরা আত্মস্থও করেছেন৷ সেটা তাঁদের অভিব্যক্তি বা আবেগ দেখলেই বোঝা যায়৷ ছন্দা বলেন, “সুরের সঙ্গে ওঁদের আগে পরিচয় ছিল না, মানে গান জানতেন না৷ যেহেতু জার্মান ভাষা আমার জানা ছিল না, তাই আমাকে ইংরেজিতে এসএমএস-এর মতো গানের বাণী লিখে দিতে হয়েছে৷”
মার্কোসের মতোই এখনও ওয়াশিংটনের শিনাইল এবং শিকাগোর জেকব ছন্দার কাছে বিদেশ থেকে গান শিখছে। ছন্দার বাড়িতে ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকায় মিলান, মার্কোস, জুলিয়ারা ছিলেন একসময়। ছন্দা অতীতের কথা মনে করে বলেন, ‘‘মিলান, মার্কুস, জুলিয়া, জেকবরা শান্ত, ধীর-স্থির, অনুভূতিপ্রবণ৷ আমার বাড়িটাই এঁদের বাড়ি হয়ে উঠেছিল তখন৷ আমি এঁদের স্টুডেন্ট হিসেবে পেয়ে গর্বিত, ধন্য৷ বাঙালি হয়েও বলছি, একজন বাঙালির থেকেও রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি এঁদের অনুরাগ ও নিষ্ঠা আমাকে মুগ্ধ করেছে৷ মিলান বা জেকবদের ডেডিকেশন অনেক বেশি৷”
এ জন্য ছন্দাকে অবশ্য অনেক ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের বাংলা উচ্চারণ শিখিয়েছেন ধরে ধরে৷ তালুতে জিভ ঠেকাতে হবে নাকি দাঁতে জিভ ঠেকাতে হবে, সবটাই ধরে ধরে শিখিয়েছেন তিনি তাঁর বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের। ছন্দা বলেন, “আমি বিদেশিদের যে গান শেখাই সেটা বিনা পারিশ্রমিকে। ভালোবেসে আমি ওঁদের গান শেখাই। যারা বাংলার কিছু বোঝে না, তাদের আমি বাংলায় রবীন্দ্র সংগীত শেখাচ্ছি। ওঁদের গানের মানেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দিয়ে গানটা শেখাই। রবীন্দ্রনাথকে আমি যে বিদেশে তুলে ধরতে পারছি, সেটা আমার কাছে আনন্দের।”

ছন্দা দত্ত
মিলান, সারা, জুলিয়া, বেঞ্জামিন, মিল্স, সোফিয়া, হানিস, মিরা, জেকব, সিনাইল জোহানাদের নাম আজও ছন্দা দত্তের ঠোঁটস্থ৷ ২০১১ থেকে বছর দুয়েকের মতো তাঁরা চন্দননগরে ছিলেন৷ ছন্দার গানের পাঠশালাতে ১৭ জন জার্মান শিক্ষার্থী ছিলেন, দুজন মার্কিন৷ চন্দননগরের বসন্ত উৎসবেও তারা বাঙালি পোশাকে সেজে রবীন্দ্র সংগীত গেয়েছেন। এই ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে নিজের দেশে ফিরে গিয়েও বাংলা গানের চর্চা চালিয়ে যেতে পারে, সেই লক্ষ্যেই অনলাইন ক্লাস শুরু করেন ছন্দা৷ তবে শুধু বিদেশিরা নন, প্রবাসী বাঙালিদের গান শেখাতেও কাজে লেগেছে অনলাইন জগত বা স্কাইপ৷ ছন্দা অনলাইন ক্লাসে একসময় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নজরুলের গান শিখিয়েছেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেও এখনও নিয়ম করে মার্কোস, জেকব ও সিনাইল ছন্দার কাছে প্রতি সপ্তাহে গান শিখে চলেছেন। বলা হয়, গানের ইস্কুল মানুষকে এখন আর টানে না। মানুষের নজর রিয়েলিটি শোয়ের দিকে। এসব কথা সরিয়ে রেখে আমার মনে পড়ে যায় মার্কোসের গলায় শোনা ঝরঝরে রবীন্দ্র সংগীত। জার্মানি থেকে উৎসাহী কণ্ঠে মার্কোস আমায় বলেছিল, “একদিন ছন্দার কাছ থেকে গান শিখে চন্দননগরে আমার বাসস্থানে ফিরছিলাম রিকশা চেপে। তখনও গুনগুন করছি ওরে গৃহবাসী গানটি। রিকশাচালক সেটা শুনে আমার দিকে ফিরে তাকালেন, অবাক হলেন৷ তারপর প্যাডেল করতে করতে নিজেও গাইতে লাগলেন সেই গানটা৷”