বাংলা ভাষা পড়তে টোকিও থেকে কলকাতায় আই ইউগো, প্রিয় বিষয় রবীন্দ্রসংগীত

ই ইউগো (Ai Yugo)। জাপানের টোকিও শহর থেকে কুড়ি বছর বয়সী এই যুবক কলকাতায় এসেছেন বাংলা পড়তে। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন স্টাডিজ বিভাগ (Foreign Studies – Jadavpur University) ইউগোর অস্থায়ী ঠিকানা। শুধুমাত্র বাংলা ভাষা নয়, তাঁর পড়াশোনার বিষয় রবীন্দ্রনাথের গান। বসন্তের প্রথম সপ্তাহে খানিক লাজুক ও সদাহাস্য ইউগোর সঙ্গে দেখা হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। আমাদের টেবিলে তখন চায়ের ভাঁড়। সেই চা থেকেই আড্ডা ক্রমশ ঘন হল। ইউগো আদ্যোপান্ত চা প্রেমী। জাপানে থাকাকালীন বাড়ির বড়োদের মুখে দার্জিলিং আর আসাম চায়ের কথা খুব শুনেছিলেন। এমনকি টোকিও শহরের ঘরে ঘরেও নাকি পৌঁছে গিয়েছে দার্জিলিং আর আসাম চা। সেই চায়ের সুবাস ইউগোকে পৌঁছে দিয়েছে টোকিও থেকে কলকাতা।

সুমন সাধু-র সঙ্গে আই ইউগো

টোকিওতেই ওঁর বেড়ে ওঠা, স্কুল জীবন। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন স্টাডিজ বিভাগে (Tokyo University Of Foreign Studies) ভারতীয় ভাষা, বিশেষত বাংলা নিয়ে পড়ার আগ্রহ জন্মায় ইউগোর। ধীরে ধীরে বুঝতে থাকেন সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মজীবন। নিজের মতো পড়তে থাকেন ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। অতঃপর ইউগোর প্রেম জন্মায় এই দুই দেশের প্রতি, বলা ভালো বাঙালিদের প্রতি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাঙালিদের লড়াই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। প্রিয় হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। একলা চলো রে-র নীতি ও আদর্শের কথা উঠে আসে ইউগোর সঙ্গে আড্ডায়।

ইউগো বাংলা পড়তে ও বলতে পারেন অল্পবিস্তর। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি পাঠ করেছিলেন সুকুমার রায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে পড়েছেন সত্যজিৎ রায়ের ছোটোগল্প। ইউগোর মুখে ‘নিরিবিলি’, ‘আদর্শ’, আদানপ্রদান’-এর মতো বাংলা শব্দ শুনতে লাগে বেশ।

বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল আই ইউগো দক্ষিণ কলকাতার কলোনি এলাকা নেতাজি নগরে থাকেন। তাঁর প্রিয় যান অটোরিক্সা। তবে এখনও হলুদ ট্যাক্সি আর ট্রামে চড়া হয়নি, সে কথাও জানান। জাপানের টোকিও আর ভারতের কলকাতা — এই দুই শহরের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? এ প্রসঙ্গে ইউগো ভাঙা বাংলায় বলেন, “টোকিও আমার প্রাণের জায়গা। কলকাতার মতো ওখানেও অনেক মানুষ, কোলাহল। তবে কলকাতা আক্ষরিক অর্থেই সিটি অফ জয়। শুরুর দিকে ভাষাগত সমস্যা থাকলেও এ শহর খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে জানে। আমার বাড়ি যেহেতু টোকিওর একেবারে শেষ প্রান্তে, তাই ওই এলাকা বেশ নিরিবিলি। সে কারণে কলকাতার এই ক্যায়োস বেশ ভালোলাগছে। তাছাড়া জাপান ও বাংলার সম্পর্ক তো দীর্ঘদিনের।”

কলকাতার দুর্গাপুজোয় ইউগো

জাপানি সম্রাট হিরোহিতো (Hirohito) অবিভক্ত বঙ্গদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, “যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।” এই সৌজন্য সম্পর্ক জাপান বহু বহু বছর দেখিয়ে এসেছে, যা এখনও অব্যাহত আছে। আমরা জানি যে, রবীন্দ্রনাথ তিনবার জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। জাপানি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ, জাপান সম্পর্কে চিন্তা ও তাঁর মূল্যায়ন— এ সবকিছুই বহু আলোচিত। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পর বাঙালি ছাড়া আর যারা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন, তারা হলেন জাপানি। ১৯৯৫ সালে জাপানি ঔপন্যাসিক কেনজাবুরো ওয়ে (Kenzaburō Ōe) নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমপর্যায়ের হয়ে উঠেছ, এটা আমাকে খুবই আনন্দ দিচ্ছে।’ জাপানে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন খুবই পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি জাপানিদের প্রভাবিত করেছেন। জাপানি লেখকেরা ছিলেন তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে দ্রুত সামাজিক বিবর্তন ঘটে, জাপান সবদিক থেকেই হয়ে পড়ে পশ্চিমমুখী। তবে ভাবতে ভালো লাগে জাপানের বর্তমান প্রজন্মও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ও আদর্শের প্রতি আস্থা হারাননি। এবং কোনো পরিস্থিতিতেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাওয়ার নয়, একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করেন। স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বিপ্লবী রাসবিহারী বসু প্রমুখের জীবনের সঙ্গে জাপান জড়িয়ে ছিল ওতপ্রোতভাবে।

আই ইউগো কথা প্রসঙ্গে বলেন, “একটা দেশ ও জাতির সঠিক পথে পরিচালিত জন্য বাঙালিদের অবদান ভোলার নয়। জাপানেও তা সর্বজনবিদিত। রবীন্দ্রনাথ আমাদেরও অহংকার।”

ইউগো-র টোকিওর দিনগুলি

ইউগো বাংলা পড়তে ও বলতে পারেন অল্পবিস্তর। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি পাঠ করেছিলেন সুকুমার রায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে পড়েছেন সত্যজিৎ রায়ের ছোটোগল্প। ইউগোর মুখে ‘নিরিবিলি’, ‘আদর্শ’, আদানপ্রদান’-এর মতো বাংলা শব্দ শুনতে লাগে বেশ। কলকাতায় পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে ফুচকা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় কাটে যাদবপুর ক্যাম্পাসে। পড়াশোনা বা কাজ না থাকলে ইউটিউব আর ইন্সটাগ্রাম ঘাঁটতে ভালোবাসেন। বাংলা সিনেমা সম্পর্কে তেমন না জানলেও দেখে ফেলেছেন সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি।

তবে কলকাতার সাম্প্রতিক ভাষাগত সমস্যা ইউগো-কেও ভাবিয়ে তুলেছে। মুখেচোখে অবাঙালি ছাপ থাকায় কলকাতার বাজারে অনেকেই তাঁকে দেখে হিন্দিতে কথা বলেন। কিন্তু ইউগো হিন্দি জানেন না। ভারতের কোনো ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভাষা নেই। তবুও দেশজুড়ে হিন্দি ভাষার দাপট। এ ছবি ইউগোর কাছেও স্পষ্ট। ইউগো বলেন, “আমি বাংলা ভাষা পড়তে এসেছি ঠিকই, তবে ভারতের অন্যান্য জায়গা ভবিষ্যতে ঘোরার জন্য আমি হিন্দি শিখতে চাই। এখানে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়েছে, হিন্দি ভারতকে ডমিনেট করে। ইংরেজি সকলে বোঝেন না। হিন্দি জানলে আমি কাজগুলোর সমাধান করতে পারব।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি পর্বে ইউগো ও তাঁর বন্ধুরা

আজ যখন দেশে চাপিয়ে দেওয়া একটি বিশেষ ভাষার দাপট — নতুন প্রজন্মের ভাষা যখন মিশ্র (বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি মেশানো ভাষা) — স্কুলের শিশুরা যখন প্রায় ভুলতে বসেছে রূপকথার গল্প — একটা গোটা জাতি যখন পশ্চিমি সংস্কৃতি দ্বারা ভীষণ ভাবে প্রভাবিত ও চালিত — তখন আই ইউগোর মতো যুবক কলকাতায় এসে বাংলা ভাষা পড়ছেন, রবীন্দ্রনাথ চিনছেন, সেটা যেকোনো বাংলা ভাষাকর্মীর কাছে আশার জায়গা। ইউগো একদিন রবীন্দ্রনাথের ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ’ শুনে মনে মনে কল্পনা করেছিলেন বাংলার পথ, ঘাট, মাঠ — শান্তিনিকেতনে গিয়ে মিলিয়ে দেখেছেন সত্যিই যেন তাঁর শোনা গানের সঙ্গে মিলে যায় সেসব দৃশ্যকল্প। তাঁর ফোনে প্রতিদিন রিপিট হতে থাকে এ গান, হোয়াটস্যাপের প্রোফাইল পিকচারে উঁকি মারে ভারতের পতাকা আর যাদবপুরের বাঙালি বন্ধুরা হয়ে ওঠে তাঁর প্রিয়জন। আই ইউগো হয়ে ওঠেন বাঙালির তরুণ স্বপ্ন।

____________________________
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: প্রত্যুষা চক্রবর্তী (ভাষা-শিক্ষক, আমেরিকান ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিজ)

Written by