বাণগড়ে পাওয়া গেছে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সদর বালুরঘাট থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে আছে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। গঙ্গারামপুর শহর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে পুনর্ভবা নদীর পাশে গঙ্গারামপুর থানা এলাকাতেই তার অবস্থান। জায়গাটার নাম বাণগড়। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেজি গোস্বামীর নেতৃত্বে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। কয়েকবছর চলেছিল খননকার্য। তারপর আবার ২০০৮-০৯ সালে ফের খনন শুরু হয়। এখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছিল পাল যুগের মন্দির। মৌর্য এবং সুলতানি যুগের কিছু নিদর্শনও পাওয়া গিয়েছিল। রুপোর মুদ্রা, হাতির দাঁতের ছুরি, পাথরের মূর্তি, বড়ো বড়ো স্তম্ভ দেখে গবেষকরা অনুমান করেছিলেন, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে এখানে সমৃদ্ধ নগর ছিল। এছাড়া, প্রায় একশো বছর আগে খুঁজে পাওয়া এক তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, পাল সম্রাট প্রথম মহীপালের কোটিবর্ষ রাজ্যের রাজধানী দেবীকোটের অংশ ছিল এটি।
‘বায়ুপুরাণ’ এবং ‘বৃহৎসংহিতা’য় উল্লেখ রয়েছে, কোটিবর্ষের এই শহরের কথা। প্রাচীন অভিধান সংকলক হেমচন্দ্র এবং পুরুষোত্তমের লেখায় এই শহরের অনেকগুলো নাম পাওয়া যায় – উমাবাণ, বাণপুর, শোনিতপুর। কুষাণ এবং গুপ্তযুগে এই শহরের অস্তিত্ব ছিল। একসময়ে দেবকোট নামে পরিচিত ছিল এটি। কিছু কিছু বইতে একে ‘দ্বিকোটা’-ও বলা হয়েছে। পালযুগের লেখক সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ থেকে জানা যায়, এই জায়গা ছিল মন্দির এবং জলাশয়ে পরিপূর্ণ। কেউ কেউ বলেন, এটিই পাল সম্রাট রামপালের রাজধানী রামাবতী। পরবর্তীকালে চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজাদের আমলেও এই শহরের প্রতিপত্তি ছিল। ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি যখন বাংলা জয় করেন, তখন কিছু সময়ে এই দেবকোটে নিজের রাজধানী রেখেছিলেন।

এই জায়গাটার নাম বাণগড় হল কীভাবে? স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী এটি ছিল অসুররাজ বলির রাজধানী। সেই বলির কাছেই বিষ্ণু এসেছিলেন বামন অবতার হয়ে। বলির ছেলে ছিলেন বাণ। সেই বাণের নামেই জায়গাটির নাম বাণগড়। দ্বাপর যুগের কৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধ এই বাণ রাজার মেয়ে উষার প্রেমে পড়েছিলেন। বাণাসুরের রাজপ্রাসাদ থেকে তিনি ঊষাকে নিয়ে পালান। পথের মাঝখানে বাণ রাজা গিয়ে দু’জনকেই বন্দি করেন। খবর পেয়ে দ্বারকা থেকে ছুটে আসেন কৃষ্ণ, বলরাম, প্রদ্যুম্ন। এদিকে বাণকে রক্ষা করতে আসেন মহাদেব শিব। কৃষ্ণের সঙ্গে শিবের ভয়ংকর যুদ্ধ হয়, যা পুরাণে ‘হরি-হর যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। শেষে ব্রহ্মার হস্তক্ষেপে যুদ্ধ থামে। বাণাসুর কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চান ও উষা-অনিরুদ্ধের বিয়ে হয়। অবশ্য অনেকে বলেন, বাণরাজার রাজধানী শোনিতপুর বাংলায় নয়, অসমে অবস্থিত।
তথ্যঋণ – আজকের সিল্করুট, বর্ধমান টুডে, খোঁজখবর