স্বাধীনতার জন্য নারী-পুরুষের সম্মিলিত লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছে ‘অপরাজেয় বাংলা’

এই ভাস্কর্যের রূপকার ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ

দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন ৩ জন মানুষ। ঠিক রক্তমাংসের মানুষ নয়, এঁদের শরীর গঠিত হয়েছে সিমেন্ট, পাথরের টুকরো, বালি, ইস্পাত এবং লোহার রড দিয়ে। সংখ্যায় মাত্র ৩ জন হলেও একটি জাতির সমগ্র আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁরা। সেই জাতির নাম বাংলাদেশ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে এক বেদির ওপর অবস্থান করছে এই ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার পরিকল্পনা নেয়। সেই উদ্দেশ্যে আব্দুল লতিফের নকশায় তৈরি হয় একটি ভাস্কর্য। কিন্তু এক রাতে এই অনন্য সৃষ্টিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় কিছু দুষ্কৃতী। তখন নতুন করে ভাস্কর্য নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্বনামধন্য ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদকে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মূর্ত করার দায়িত্ব পেয়ে তিনি মহা উৎসাহে কাজ শুরু করে দেন। তিনি প্রথমে মাটি দিয়ে একটি মডেল তৈরি করেন। সেই মডেল সবারই পছন্দ হয়। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করেন। কয়েক বছর তিনি দিনে গড়ে একটানা ১২-১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করেছেন। 

সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ

এদিকে বাংলাদেশের রাজনীতি তখন উথালপাথাল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এমনকী, নির্মীয়মান এই ভাস্কর্যের দিকে তাক করে রাখা হত কামান। কিছু পাকিস্তানপন্থী সংগঠন এই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার নানা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। যদিও সেগুলির কোনোটাই সফল হয়নি। মাঝখানে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও পরে আবার চালু হয়। এটির উদ্বোধন করা হয় ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে। ভাস্কর্যটির নাম ‘অপরাজেয় বাংলা’ রেখেছিলেন সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী।

‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যে দেখা যায়, ফার্স্ট এইড বাক্স হাতে এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝখানে দৃঢ় প্রত্যয়ে এক হাতে রাইফেলের বেল্ট এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে দাঁড়ানো তাজা যুবকটি চিরন্তন গ্রাম বাংলার লড়াকু প্রতিনিধি। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে এক শহুরে তরুণ। নারী-পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার বার্তা দেওয়া হয়েছে ভাস্কর্যটির মাধ্যমে। পাশাপাশি, গ্রাম এবং শহরের মিলনের সুরও স্পষ্ট। ৩ জন মডেল হাসিনা আহমেদ, সৈয়দ হামিদ মকসুদ এবং বদরুল আলম বেনু ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে এই ভাস্কর্যে। 

Developed by DXDasia