এখন সুন্দরবনই রুবি শেখের ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু
অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার পর রুবির বাঁচার মধ্যে কোনও আত্মবিশ্বাস ছিল না। চলে নানান ট্রিটমেন্ট এবং থেরাপি। এখন ব্যবসায় মন দিয়েছেন। সাফল্যও এসেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। বঙ্গদর্শনে আজকের শিরোনামে ‘আগুনপাখি’ রুবি শেখ।
রুবি শেখের (Rubi Sheikh) জীবনে কিছু অপ্রীতিকর ভয়ানক স্মৃতি আছে, আজও হয়তো ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে সেসব ভয় দেখিয়ে যায়। যা সে আর মনে করতে চায় না। কথাও বলতে চায় না। পালিয়ে বেড়ায়। তার মা-বাবাও সেই দিনগুলো মনে করতে বা করাতে চান না। তাঁদের ধারণা এটা নিয়ে আলোচনা ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে’ টাইপ ব্যাপার হবে। কিংবা ‘দুর্বলতা দেখিয়ে কিছু মানুষের মেকি সহানুভূতি আদায় করা হবে।’ তাঁদের মেয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ‘যেন কিছু হয়নি’, মানসিকতায় এগিয়ে যাবে। এটাকে অতীতের ঘটনা ভোলার একটা কৌশলও বলা যেতে পারে।
সমাজে প্রতিহিংসার একটি মতবাদ খুব জনপ্রিয় — ‘প্রস্তাবে হ্যাঁ-তে হ্যাঁ না মেলালে অ্যাসিড ছুড়ে পুড়িয়ে দাও। না পেলে ধ্বংস করে দাও।’ এমন ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আকছার ঘটে। ‘ছপক’ (Chhapak) ছবিতে দীপিকা পাডুকোনের চরিত্রে উঠে এসেছিল প্রতিহিংসার নগ্ন দিক এবং অ্যাসিড আক্রান্তের জীবন। মিডিয়ার দৌলতে অনেকে মনীষা পৈলানের (Monisha Pailan) (পড়ুন মনীষা পৈলানের সাক্ষাৎকার) কথা জেনেছেন। তাঁদের পাশাপাশি সুন্দরবনের এক হার না মানা কন্যা রুবি শেখের কথাও সকলের জানা প্রয়োজন।

রুবি শেখ
অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার পর রুবির বাঁচার মধ্যে কোনও আত্মবিশ্বাস ছিল না। মনে হত, বেঁচে থাকা আর না থাকা সবটাই সমান। ইতিমধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। তারপর হঠাৎ একদিন মনে হল, ‘আমি ফেলনা নই। বাইরের চেহারাটাই সবকিছু নয়। বাইরের আবরণ তো একদিন খসে বা পুড়ে যায়ই!’ মনের মধ্যে আওয়াজ এল, ‘কিছু করে দেখাতেই হবে।’ যেন কোনও উর্দু শায়রের শায়েরি উচ্চারিত হল তার কানে — “উঠ, বাঁধ কমর, ক্যায়া ডরতা হ্যায়/ ফির দেখ খুদা ক্যায়া করতা হ্যায়।”
অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার পর রুবির বাঁচার মধ্যে কোনও আত্মবিশ্বাস ছিল না। মনে হত, বেঁচে থাকা আর না থাকা সবটাই সমান। ইতিমধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। তারপর হঠাৎ একদিন মনে হল, ‘আমি ফেলনা নই। বাইরের চেহারাটাই সবকিছু নয়। বাইরের আবরণ তো একদিন খসে বা পুড়ে যায়ই!’
পরিবারের সহযোগিতায় শুরু হল রুবির নিজস্ব লড়াই। নানান ট্রিটমেন্ট এবং থেরাপি। ওভারকাম করতে বছর দু-তিনেক লেগেছিল। পায়ে হাঁটতে লেগেছিল আরও ছমাস। কী দুঃসহ ছিল সে জীবন! সেসব বলতে গেলে থ মেরে যায় রুবি। কুলতলির (Kultali) গ্রাম্য পরিবেশে বড়ো হলেও রুবির পরিবার গোঁড়া ছিল না। বাবা স্কুল শিক্ষক ছিলেন। তিনিই আগাগোড়া মেয়েকে ভরসা দিয়ে গেছেন। সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ের হাত ধরেছেন। যাবতীয় আক্রমণে ঢাল ছিলেন রুবির বাবা। …অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার তিক্ত অতীত পেরিয়ে রুবি শুরু করল স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই।

রুবির কালেকশন (সুন্দরবন)
একটা চাকরি জোটাতে হবে। বাংলায় এমএ, তারপর ডিএলএড করলো মেয়েটা। কিন্তু দিনকাল এমন, অনেক চেষ্টার পরেও চাকরি জুটলো না। বয়স বাড়ছে, অবসরপ্রাপ্ত বাবার সংসারে নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছে, তখন তার মনে এল ব্যবসার কথা। ফেসবুকের কিছু গ্রুপে উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে শাড়ি, কাপড়ের। কেউ দুল কিংবা অন্যান্য সামগ্রী বেচছে। একদিন রুবি ইন্টারভিউ দিয়ে ট্রেনে ফিরছে। আবারও ব্যর্থ হওয়ার গ্লানি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বারবার ভাবছে এই অবস্থা থেকে বেরোনোর রাস্তা চাই। তখনই তার মনে হল, আমিও যদি এমন ব্যবসা শুরু করি! অন্তত নিজের হাত খরচের টাকা যদি আসে! সেই শুরু। সাতপাঁচ না ভেবে যে ব্যবসা শুরু করেছিল রুবি শেখ, সেই উদ্যোগ এতটা এগিয়ে যাবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

রুবির কালেকশন (সুন্দরবন)
রুবির স্বপ্নটা যখন ঘনীভূত হল, সে স্থির করলো ব্যবসা মূলত গেরস্থের ঘরে নিত্যদিনের খাবারের সামগ্রী নিয়ে হবে। সেক্ষেত্রে ঘি, মধু, আচার ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণের রাস্তা খোলা আছে। তার প্রোডাক্ট বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে। আরেকটি বিষয় প্রতিজ্ঞা করেছিল সে — তার ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো ভেজালহীন হবে। মানুষ ভালো জিনিস পর্যাপ্ত মূল্য দিয়ে খাবে। এই মানসিকতাই ছিল রুবির ব্যবসার অনন্য পুঁজি। সেই সততার পুঁজিতে রুবির তৈরি প্রোডাক্ট এখন সারাদেশে অর্ডারমাফিক পৌঁছে যায়।
জার্নির শুরুটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অমসৃণ হয়। রুবির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। গ্রুপগুলোতে পেমেন্ট করে কোড নিয়ে পোস্ট করতে হত। প্রথমদিকে সপ্তাহে একটা, কখনও কিছুই বিক্রি হতো না। হতাশা ঘিরে ধরত, তবু হাল ছাড়েনি। যখন নিজের স্টক এনে কাজ শুরু হল, তখন প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয় বা কিছু ক্রেতা বন্ধুরাও বিভিন্নভাবে ঠাট্টার পথ বেছে নিলেন। মানে যতটা সম্ভব ডিমোটিভেট করা যায় আর কী! ‘এত লেখাপড়া শিখে শেষে এইসব বিক্রি? অনলাইনে বিক্রি করবে তো লেখাপড়া শেখার দরকার কী ছিল?’
রুবির স্বপ্নটা যখন ঘনীভূত হল, সে স্থির করলো ব্যবসা মূলত গেরস্থের ঘরে নিত্যদিনের খাবারের সামগ্রী নিয়ে হবে। সেক্ষেত্রে ঘি, মধু, আচার ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণের রাস্তা খোলা আছে। তার প্রোডাক্ট বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে।
বাঙালি মেয়ে ঘরসংসার না করে ব্যবসা করবে? ততদিনে রুবির উদাহরণ তখন মেয়েদের পড়াশোনা করার বিরুদ্ধে বড়ো অস্ত্র হয়ে গেছে। “লেখাপড়া করে কী হবে, ওই তো রুবি লেখাপড়া শিখে শেষে ফেসবুকে ব্যবসা করছে।” পরে অবশ্য সব ধারণা বদলে দিয়েছে রুবি। এক ক্রেতা একবার অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আবার লেখাপড়াও জানো!’ মানে পড়ালেখা করা মেয়েরা ব্যবসা করতে পারে না।
রুবির ভীষণ ভালো লাগে আজকের দিনগুলো। এত মানুষ ভালোবাসেন। তাঁরা খাদ্যমেলার প্রাঙ্গণে দৌড়ে আসেন, জড়িয়ে ধরেন, চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেন। মনে হয় এই জীবনটাই আসল জীবন। স্বাবলম্বী হতে পারায় শান্তি আছে। সংখ্যালঘু পরিবারের মেয়ের সফল হয়ে ওঠার পথে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন রুবিকে মুগ্ধ করে। মহিলা হিসেবে সমস্যা ছিল, থাকবেও। সেটাকে অতিক্রান্ত করাটাই এখন মূল লক্ষ্য। ভোরে হাটে যায় রুবি। আম বা সিজনের ফল কিনতে আচারের জন্য, প্রথমদিকে অনেক খারাপ নজরে তাকানো বা ব্যঙ্গ করার চেষ্টা ছিল, এখন সেটা কমেছে। সুন্দরবনই রুবি শেখের ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। ২৫ কেজি সুন্দরবনের মধু দিয়ে শুরু করা ব্যবসায়, এখন বার্ষিক ১০ কুইন্টাল সুন্দরবনের মধু মধু বিক্রি করে রুবি। সুন্দরবন তাকে পরিচিতি দিয়েছে, ‘সুন্দরবনের রুবি’ (Rubi from Sundarbans)।

সুন্দরবনের রুবি
তার সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবনের কথা বলতে গেলে সীমিত শব্দে লেখা সম্ভব না। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধে আর কেমন থাকা যায়! তবু সুন্দরবনের জীবন এখানকার মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে, তারা সুন্দরবনবাসী পরিচয়ে গর্বিত। একসময় ট্রাভেল এজেন্সি চালিয়েছে রুবি। কলেজ স্ট্রিটে প্রুফ দেখার কাজও করেছে। কচিপাতা, খোয়াই, কৃতি, খোয়াবনামা প্রভৃতি প্রকাশনার জন্য কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তরুণ লেখিকা অর্পিতা সরকার থেকে শুরু করে বর্ষীয়ান মনোরঞ্জন ব্যাপারীদের বইয়ের কাজের নেপথ্যে ছিল রুবির অবদান।
রুবি কখনও ভাবেনি যে জায়গায় তিনবছর আগেও ক্যুরিয়ার আসতে নাভিশ্বাস হত, সেই জায়গায় তার ব্যবসার হাত ধরে আজ গ্রামে ক্যুরিয়ার আসে। পুরো গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন অনলাইনে কেনাকাটা করে। রুবির মতে — “জীবন একটাই। হ্যাঁ, আমরা সবাই একসময় হতাশ হই। আমি নিজেও একটা সময় পর ভাবিনি যে, আমার এই পোড়া মুখ বা চেহারা কেউ দেখবে, কারোর সামনে নিজেকে দেখাতে পারবো। অথচ আজ কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে আমার সংযোগ। সবার সামনে সাবলীল। আত্মহত্যার চেষ্টাও একসময় করেছিলাম। তাই বলবো, খারাপ সময় আসবে, তখন মনে হবে এটাই সবথেকে খারাপ সময়। এখানে আর বাঁচা যায় না। তবে ওটা দাঁতে দাঁত চেপে হজম করতে পারলে সামনে সুন্দর দিন।”
রুবি কখনও ভাবেনি যে জায়গায় তিনবছর আগেও ক্যুরিয়ার আসতে নাভিশ্বাস হত, সেই জায়গায় তার ব্যবসার হাত ধরে আজ গ্রামে ক্যুরিয়ার আসে। পুরো গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন অনলাইনে কেনাকাটা করে।
আগামীর ইচ্ছে কী এই প্রশ্ন করলে চকচকিয়ে ওঠে তার চোখ। খুব ইচ্ছা আছে, কারখানা করবে। খাঁটি মধু, ঘি, বাড়িতে বানানোর পদ্ধতিতে আচার আর শীতকালে মোয়া, গুড়, পাটালি এসব তৈরি হবে। এখন সহযোগী হিসেবে চারজন স্বামী পরিত্যক্তা এবং বিধবা মহিলা কাজ করেন। আগামী দিনে সেই কারখানায় বড়ো পরিসরে শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েরা সঠিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবে। ইনশাআল্লাহ্…
রুবির এই ‘ইনশাল্লাহ্’ উচ্চারণ রেখে গেল অনেক সম্ভাবনা। আগামীর অনেক সাফল্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আসবে এই ভরসা রাখাই যায়।
“আভি তো ইজ বাজ কি আসলি উড়ান বাকি হ্যায়/ আভি তো ইস পরিন্দে কা ইমতেহান বাকি হ্যায়/ আভি আভি ম্যায়নে লাংঘা হ্যায় সমুন্দরো কো/ অভি তো পুরা আসমান বাকি হ্যায়।”