‘অমল আলো’য় ভরে আছে অশোকনগরের আন্তরিক থিয়েটার চর্চা

গ্ল্যামারসর্বস্ব থিয়েটারচর্চার বাইরে একটি ব্যতিক্রমী স্পেস ‘অমল আলো’

“লকডাউনকালে বাংলায় প্রথম যে ব্যক্তিগত থিয়েটার স্পেসের সূচনা হয় তার নাম ‘অমল আলো’। এই প্রতিবেদক-নাট্যকর্মীর নিজস্ব নাট্যদল অশোকনগর নাট্যমুখের উদ্যোগে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে গত পয়লা সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখে এই স্পেসের সূচনা হয়। কলকাতা থেকে ৪২ কিমি দূরে অবস্থিত এই নাট্যক্ষেত্রে প্রতি শনি-রবিবার অভিনয় করে চলেছেন রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রচুর নাট্যদল। উদ্বাস্তু-অধ্যুষিত, ছিদ্রান্বেষী, অন্তর্কলহে লিপ্ত, তোষামোদপ্রিয় এবং গ্ল্যামারসর্বস্ব বঙ্গীয় শিল্পচর্চায় এ তো রীতিমতো এক ঘটনাই বটে।”

নাট্যকর্মী অভি চক্রবর্তী। ২০০০ সালে নিজের নাট্যদল প্রস্তুত করেন। তার দুই দশক পরে তৈরি করলেন থিয়েটার স্পেস ও গ্যালারি ‘অমল আলো’। কলকাতা থেকে ৪২ কিমি দূরে অমল আলোর প্রতিষ্ঠা কেন ‘রীতিমতো এক ঘটনা’ সেটা বুঝতেই যেতে হবে অশোকনগর। হাবড়াগামী ট্রেন থেকে অশোকনগর স্টেশনে নেমে ভ্যানে করে পাঁচ মিনিটের পথ অমল আলো। প্রতিটি ভ্যান, রিক্সা কিংবা টোটোওয়ালারা অমল আলোকে চেনেন ‘থিয়েটার বাড়ি’ নামে। সাধারণত শহরে এমন চিত্রটা দেখা যায় না। যে কারণে বড়ো নাট্যদলের মহলাকক্ষ খুব সহজে খুঁজে পাওয়াও যায় না অনেকসময়। অমল আলো এখানে ব্যতিক্রমী। কী অপূর্ব সুন্দর তার দেওয়াল চিত্র দিয়ে গোটা অঞ্চলটা ঘেরা। গেট থেকেই দেখা যাচ্ছে বাগানের গাছের মধ্যে দিয়ে ঝুলছে বিভিন্ন মুখোশের শিল্পরূপ। বাংলার নাটকের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শিল্পকলার কাটিংস, দেওয়াল চিত্র, ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো পুরো স্পেস। গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে অমল আলো ও অশোকনগর নাট্যমুখের অফিস ঘর ও লাইব্রেরি। পাশেই অমল আলোর পারফর্মেন্স স্পেস গ্যালারি।

হাবড়াগামী ট্রেন থেকে অশোকনগর স্টেশনে নেমে ভ্যানে করে পাঁচ মিনিটের পথ অমল আলো। প্রতিটি ভ্যান, রিক্সা কিংবা টোটোওয়ালারা অমল আলোকে চেনেন ‘থিয়েটার বাড়ি’ নামে।

ভারতের বিভিন্ন মুখোশের সংগ্রহ

থিয়েটার পারফর্ম করার অংশটিতে ফ্রন্ট ও ব্যাক কার্টেন রয়েছে, আছে সাইক্লোরোমা বা স্ক্রিন, চারটে সচল উংগস, আছে ২২ ফুট মুক্ত স্পেস। লম্বায় ১৪ ফুট ও উচ্চতায় ১২ ফুট। লাইটের মোট ২৫টি অংশ আছে। মোট ৭০ জন দর্শক গ্যালারিতে বসতে পারেন। একদম আলাদা মেকআপ-রুম এবং সেই সঙ্গে প্রোজেকশন ও সেমিনার করার জন্য একাধিক গ্যালারি ফর্ম্যাট আছে। অমল আলো তৈরি হয়েছে কোনও রকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই। শুধুমাত্র দু-দশকের নাট্য প্রযোজনা থেকে উঠে আসা অর্থ এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের দেওয়া অর্থ থেকে। এখানকার সবচেয়ে জোড়ের জায়গা বোধহয় একতা। তাঁরা বিশ্বাস করে দল করেন, জীবনযাপনও একসঙ্গে। প্রধান হিসেবে অভি চক্রবর্তী আর সঙ্গীতা চক্রবর্তী ছাড়াও সঞ্জীব বক্সী, শাশ্বতী দাস, অরূপ গোস্বামী, অসীম দাস এই স্পেসটি গঠন করার স্বপ্ন দেখেন। অভ্যর্থনা কমিটিতে ঝুমুর ঘোষ, শ্রেয়া সরকার, দেবাদৃতা ভট্টাচার্য, অর্পিতা পাল, স্মৃতিলতা মণ্ডল পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে থিয়েটার দেখতে আসার জন্য আমন্ত্রণ করেন। অনুষ্ঠানের ডিজাইন করেন। টেকনিক্যাল কাজে সৌমেন্দু হালদারের জন্য থিয়েটারের প্রোডাকাশন সুন্দর হয়ে ওঠে। গৌতম বসু, সুকান্ত পাল এখন স্পেসের প্রধান।

মূল মঞ্চ

অমল আলোর বিভিন্ন দেওয়াচিত্র তৈরি করেছেন অদ্রীশ কুমার রায়। অমল আলোর বইয়ের স্টল আছে নিজস্ব। বাংলা থিয়েটারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বইপত্র যা কলেজ স্ট্রিটে ঘুরে সচরাচর পাওয়া যায় না, বিভিন্ন নাট্যদলের নাট্যপত্র, ব্রশিওর পাওয়া যাবে অমল আলোর বইয়ের স্টলে। এছাড়াও লাইব্রেরির মতো ব্যবহার করা যাবে নাট্যদলের বইয়ের সম্ভার। নাট্যকর্মীদের গবেষণার জায়গা, ডকুমেন্টেশনের একটা জায়গা অনায়াসে তৈরি হতে পারে।

শুধু নাটকের জন্যই তৈরি হয়নি অমল আলো। অভি চক্রবর্তী স্বপ্ন দেখেছেন এমন একটা স্পেস হবে, যেখানে থিয়েটারের সঙ্গে নাচ, গান, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি ও মাইম সমান গুরুত্ব পাবে।

শুধু নাটকের জন্যই তৈরি হয়নি অমল আলো। অভি চক্রবর্তী স্বপ্ন দেখেছেন এমন একটা স্পেস হবে, যেখানে থিয়েটারের সঙ্গে নাচ, গান, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি ও মাইম সমান গুরুত্ব পাবে। অফিস ঘরের ঠিক উপরেই একটি স্পেস, যেখানে দীপ্তসী সাহার নেতৃত্বে চলে ‘বিদ্যাধরী : মেঘেদের রান্নাঘর’। এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র রান্নাঘর বা ক্যান্টিন ভাবলে ভুল হবে। অভি চক্রবর্তী বলছেন, “রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে নাট্যকর্মীরা আসেন, তাঁদের থাকা খাওয়া নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমরা ‘বিদ্যাধরী : মেঘেদের রান্নাঘর’ নামের উদ্যোগটি নিয়ে ফেলেছিলাম অমল আলোর ক্যাম্পাসেই।” সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই ঘরে রসনাতৃপ্তির জন্য আছে অভিনব আয়োজন। এখানে কোনো মশলাদার খাবার হয় না। নাট্যকর্মীদের শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রেখেই সমস্ত রান্না হয়।

সাধারণ মানুষের মধ্যে থিয়েটারের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন সদস্যরা

হঠাৎ কেন এই ইন্টিমেট থিয়েটার চর্চা শুরু করলো অশোকনগর নাট্যমুখ! আসলে প্রসেনিয়ামের বাক্সবন্দি থিয়েটার চর্চা, এলিট জীবনের বাইরে সাধারণ খেটে খাওয়া কিংবা থিয়েটার বিষয় থেকে অনেক দূরে থাকা মানুষদের জন্য ‘অমল আলো’ কাজ করে থাকে। কোভিডের পর যেমন সমস্ত দ্রব্যের অর্থমূল্য আকাশ ছোঁয়া হয়, থিয়েটারেও তার কোপ পড়েছিল। তাই এই স্পেস চেষ্টা করে ন্যুনতম অর্থমূল্যে ভালো থিয়েটার দেখানোর। শনিবার ও রবিবার করে ইন্টিমেট থিয়েটার চর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলকাতা-সহ জেলার বিভিন্ন নাট্যদল। শুধু জেলা নয়, সারা ভারতের বেশ কয়েকটি নাট্যদল এখানে কাজ করে গেছে।

ভারতীয় থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অমল আলোয় এসেছেন বারবার। যেমন, ব্রাত্য বসু এসেছেন ক্যান্টিন ‘বিদ্যাধরী’-র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে। এসেছেন স্বনামধন্য নাটককার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, শেখর সমাদ্দারের মতো গুণীজন। ফুডকা অর্থাৎ ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ি এসেছেন। চেখে দেখেছেন রান্নাঘরের বিশেষ পদ নিরামিষ খাসির মাংস। ওয়ার্কশপ ও বক্তৃতায় উপস্থিত হয়েছেন দেব সাহিত্য কুটিরের প্রকাশক রূপা মজুমদার। যাদবপুর মন্থন, বালার্ক নিমতা এখানে নাট্যোৎসব করেছে। সুদূর বালুরঘাট বা সিউড়ি থেকেও দল আসছে। নাট্যচিন্তক মলয় রক্ষিত, গল্পকার শমীক ঘোষ, ভাবনা থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক অভীক ভট্টাচার্য কোনও না কোনও ভাবে অমল আলোর অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থিয়েটারের প্রয়োগকে আরও প্রসারিত করতে সাহায্য করেছেন।

Developed by DXDasia