কলকাতাকে প্রথম হিন্দি ‘ইন্টিমেট থিয়েটার স্পেস’ চিনিয়েছিল ঊষা গাঙ্গুলির ‘রঙ্গকর্মী’

এই থিয়েটার স্পেসটি তৈরি করেছেন ইঞ্জিনিয়ার অমিতাভ ঘোষ

ঞ্জন বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, “আসল প্রশ্ন, ঊষা কত বড়ো অভিনেত্রী বা কত বড়ো পরিচালক, তা নয়। আসল কথাটা হল ঊষার নিজের বক্তব্যের জোর ক্রমশ বাড়ছে। ষাট বা সত্তরের দশকে সেই বইমুখো মেয়েটি বেরিয়ে এসেছেন তাঁর খোলস ছেড়ে।” গাড়িটা তখন সদ্য সাউথ সিটি শপিং মলকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমি যেন শুনতে পাচ্ছি বড়োলোকদের উঁচু খেলনা বাড়ি হবে বলে কত কত মানুষদের উচ্ছেদের কান্না ভরা হাহাকার। শুনতে পাচ্ছি ঊষা গঙ্গোপাধ্যায় সেই মানুষদের চোখের জল মুছিয়ে দিতে গর্জে উঠছেন থিয়েটারে। তিনি কৃষক শ্রমিকদের কথা বলছেন, কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঁওতাবাজি নিয়ে কথা বলছেন। আসলে তিনি কথা বলছেন তথাকথিত শহুরে উন্মাদনা, উন্মত্ততার বিরুদ্ধে। গাড়িটা তখন আনোয়ার শাহ্‌ বাজারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সামনেই ঊষা গাঙ্গুলির স্বপ্নের ‘রঙ্গকর্মী স্টুডিও থিয়েটার’। এই সেই স্পেস, যেখানে তাঁর সমস্ত কণ্ঠস্বর আজও ধরা আছে বিভিন্ন থিয়েটার চর্চার মধ্যে। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চিত মানুষের হয়ে কথা বলবেন নাট্যকর্মীরা, সেই মানবিক স্বপ্নের আবাসভূমি রঙ্গকর্মী স্টুডিও আজও দৃপ্ততার সঙ্গে কাজ করে চলেছে।

১৯৭৬ সাল থেকে রঙ্গকর্মীর পথচলা। ৪৭ বছর হতে চলেছে ভারতের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যদলের। যদিও রঙ্গকর্মী স্টুডিও থিয়েটার ও গ্যালারির শুভ সূচনা হয় ২০১২ সালে। বর্তমানে বহু নাট্যদলের নিজস্ব ‘ইন্টিমেট স্পেস’ আছে। ২০১২ সাল থেকে যখন অধিকাংশ দলই ইন্টিমেট গ্যালারি কী জানতো না, সেই সময় ঊষা গাঙ্গুলি ইন্টিমেট থিয়েটার চর্চার একটা নতুন দর্শন খোঁজ করার চেষ্টা করছিলেন।

ঊষা গাঙ্গুলি

হলে প্রবেশ করলে দেখা যায় থিয়েটার পারফর্মিং স্পেস। পুরো গ্যালারি সচল এবং দ্বিমুখী আকার নিতে পারে, অর্থাৎ গ্যালারি ফর্ম্যাট (ঊষা গাঙ্গুলি মঞ্চ) ও এরিনা ফর্ম্যাট (বিনোদিনী-কেয়া মঞ্চ)। স্পেসটি তৈরি করেছেন প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার অমিতাভ ঘোষ। সাউন্ড এফেক্ট তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে এবং উন্নতমানের সিনোগ্রাফির জন্য পঞ্চাশের উপর আলোকযন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে এখানে।

লকডাইনের পর তৈরি হয় ‘রঙ্গকর্মী ক্যাফে’। সাজানো হয়েছে রঙ্গকর্মীর বিভিন্ন থিয়েটারের পোস্টার দিয়ে। এই পোস্টার অবশ্যই একটি পঞ্চাশ বছর ছুঁইছুঁই দলের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।

লকডাইনের পর তৈরি হয় ‘রঙ্গকর্মী ক্যাফে’। সাজানো হয়েছে রঙ্গকর্মীর বিভিন্ন থিয়েটারের পোস্টার দিয়ে। এই পোস্টার অবশ্যই একটি পঞ্চাশ বছর ছুঁইছুঁই দলের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। থিয়েটারে চিত্রকলা ও ফটোগ্রাফি নিয়ে এ দেশে খুব একটা ভাবনা-চিন্তা হয় না। অথচ থিয়েটারের ফটোগ্রাফি এক ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে উঠে আসে সময়ের আঙ্গিক। সেইসব কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নাট্যকর্মী ও গবেষকদের কাছে। ঊষা গাঙ্গুলির অভিনয়ের নানান মুহূর্ত ছাড়াও এখানে ধরা আছে দেশ-বিদেশের কিংবদন্তি থিয়েটার শিল্পীদের নানান ঐতিহাসিক কাজ।

রঙ্গকর্মী ক্যাফে

রঙ্গকর্মী থিয়েটার গ্যালারি

কলকাতার হিন্দি থিয়েটারে নতুন যুগ এনেছিলেন ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়

গ্যালারির পাশেই লাইব্রেরি, যাকে কনফারেন্স রুম হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ সব বই আছে। রঙ্গকর্মী যেহেতু কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দি ভাষার নাট্যদল, তাই এখানে হিন্দি সাহিত্য, ইতিহাস, নাটক ও সংস্কৃতির বইপত্রই বেশি আছে। শুধুমাত্র থিয়েটারকর্মীরাই নন, যে কেউ লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন পড়াশোনার জন্য। এখানকার সাম্প্রতিক প্রধান অনিরুদ্ধ সরকার বলছেন, “রঙ্গকর্মী আজও সারা ভারতের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির থিয়েটার চর্চার জন্য ইন্টিমেট স্পেসে বিভিন্ন নাট্য উৎসব করছে। নাটকের ছাত্রছাত্রীরা ও বহু শিক্ষক এখানে আদানপ্রদান করেন তাঁদের থিয়েটারের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।” এই স্পেস উদ্বোধন করেন পণ্ডিত তন্ময় বসু, শিল্পী সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রোহিনী রায়চৌধুরী। এছাড়াও থিয়েটারের আড্ডায়-অনুষ্ঠানে বিভিন্নসময় এসেছেন জহর সরকার, আনন্দ লাল, প্রবীর গুহ, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, ভদ্রা বসু, দেবাশিস মজুমদার, অংশুমান ভৌমিকের মতো নাট্যসুহৃদরা। বাংলাদেশের সায়ক সিদ্দিকী ‘রূপ সুন্দরীর পালা’-র অভিনয় করে গেছে এখানে।

 

রঙ্গকর্মী থিয়েটার স্পেস

রঙ্গকর্মীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাট্যোৎসব ‘সমন্বয়’, যেখানে দেশের নামজাদা ইন্টিমেট থিয়েটার এখানে অভিনয় করে গিয়েছে। এই স্পেসেই ঊষা গাঙ্গুলি অভিনয় করেন ‘আত্মাজ’। রঙ্গকর্মী আজ রেপার্টারি হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশজন ছেলেমেয়ে এখানে নাট্যশিক্ষা গ্রহণ করছে। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা-র শিক্ষকরা রঙ্গকর্মীর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কর্মশালার আয়োজন করে। রঙ্গকর্মী স্টুডিও থিয়েটার পশ্চিমবাংলায় এখনও অবধি সবচেয়ে বেশি শো করে গেছে ইন্টিমেট স্পেসে। তাদের ওয়েবসাইটেই সুন্দর করে সবকিছু ডক্যুমেন্ট করা আছে। আসলে ঊষা গাঙ্গুলি বিশ্বাস করতেন, কাজ করার মধ্যেই বেঁচে থাকার আনন্দ। তাই রঙ্গকর্মীর অভিভাবক সশরীরে না থাকলেও তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রঙ্গকর্মীরা এগিয়ে চলেছেন শিল্পের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে।

আগামী ১৬ জানুয়ারি আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস মঞ্চে প্রায় ৩৬ বছর পর ফিরছে ঊষা গাঙ্গুলি নির্দেশিত নাটক ‘লোক কথা’। মারাঠি নাট্যকার রত্নাকর মাতকারির এই নাটককে হিন্দি ভাষায় রূপান্তর ও নির্দেশনা দেন তিনি।

লোক কথা

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আগামী ১৬ জানুয়ারি আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস মঞ্চে প্রায় ৩৬ বছর পর ফিরছে ঊষা গাঙ্গুলি নির্দেশিত নাটক ‘লোক কথা’। মারাঠি নাট্যকার রত্নাকর মাতকারির এই নাটককে হিন্দি ভাষায় রূপান্তর ও নির্দেশনা দেন তিনি। এক সময় এ নাটক দেখার জন্য আকাদেমি থেকে টিকিটের লাইন চলে যেত রবীন্দ্র সদন পর্যন্ত। ‘লোক কথা’ নাটক জুড়ে রয়েছে স্বাধীনতার পরেরকার সময় – যখন সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার বেড়ে চলেছে, বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যা – এমন সময় মানুষই আবিষ্কার করবে জীবনের মহৌষধি, মানুষই বাঁচিয়ে তুলবে চারপাশকে। বিষয়ের কারণেই ‘লোক কথা’ সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক।

Developed by DXDasia