সুন্দরবনে এই প্রথমবার পাখি উৎসব, মিলল একঝাঁক পাখি-পরিবারের হদিশ

পক্ষীবিশারদদের নজরে ধরা পড়ল পাঁচ হাজারেরও বেশি সংখ্যক পাখি

সম্প্রতি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সজনেখালি জুড়ে পালিত হল প্রথম সুন্দরবন পাখি উৎসব ২০২৩ (1st Sundarban Bird Festival 2023)। আমাদের চারপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাখিদের বিষয়ে বিবিধ অজানা আকর্ষণীয় তথ্য সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়াও, এই অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাখি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির যথাসম্ভব প্রচেষ্টা করেছে কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানটি সংঘটনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল সজনেখালি টাইগার রিজার্ভ-এর কমিউনিটি হল।

সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ-এর ফিল্ড ডিরেক্টর অনুষ্ঠানটির শুভ সূচনা ঘোষণা করেন। গত ৭ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি অবধি চার দিন ধরে চলে সুন্দরবনের প্রথম পক্ষী উৎসব। উৎসবে উপস্থিত বিশেষ অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর জোয়ান্স জাস্টিন, সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ডিরেক্টর রাজেশ কুমার, সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিল্ড ডিরেক্টর দেবদর্শন রায় প্রমুখ।

উৎসবে আয়োজন করা হয়েছিল একটি বৈঠকী আসরের, যেখানে উপস্থিত গুণীজনেরা নানান আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে নির্ধারণ করেন এমন কয়েকটি সমস্যা যেগুলি আবাসিক এবং পরিযায়ী – সব ধরনের পাখিদের সংরক্ষণের ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে, নদী তীরবর্তী অঞ্চলে চাষাবাদ, অস্বস্তিকর পক্ষী আবাস, পক্ষী অধ্যুষিত নদী-তীরে বেআইনি কার্যকলাপ, ক্ষতিকারক নেটের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিভিন্ন সমস্যা ইত্যাদি।

উৎসব চলাকালীন দুই দিন ধরে সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ এলাকায় একটি পক্ষী সমীক্ষার (Bird Trial) আয়োজন করা হয়েছিল; যার দরুন পক্ষীবিশারদদের নজরে ধরা পড়ে ৫০৬৫টিরও কিছু বেশি সংখ্যক পাখি। প্রজাতিগত বিচারে এই মোট সংখ্যাটিকে ভাগ করা হয়েছে বেশ কয়েকটি বিভাগে। যার মধ্যে রয়েছে ওয়েডার (৪২টি), র্যা প্টর (১২টি), জংলী পাখি (৭৮টি), জলমুরগি (৬টি) এবং অন্যান্য (৭টি)। এই পাখিদের তালিকাতেই জায়গা করে নিয়েছিল সুন্দরবনে বসবাসকারী বিপন্ন প্রজাতির দুটি পাখি – ইউরাসিয়ান কারলিউ (Eurasian Curlew) এবং লেসার স্যান্ড প্লোভার (Lesser Sand Plover)।

ইউরাসিয়ান কারলিউ বা সাধারণ কারলিউ নামের এই প্রজাতির পাখিগুলি স্কোলাপাসিডাই (Scolopacidae) নামের এক বিশেষ ওয়েডার জাতীয় পক্ষী পরিবারের অন্তর্গত। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম নুমেনিয়াস আরকোয়াটা (Numenius arquata)। এই পাখিরা তাদের ঠোঁটের সাহায্যে নদী সংলগ্ন নরম পলিমাটি খনন করে এবং ভিতর থেকে বের করে আনে কাঁকড়া বা ছোটো লবস্টার জাতীয় প্রাণীদের। এগুলোই এদের প্রধান খাদ্য। এছাড়াও মাটির উপর চলাফেরা করা কেঁচোদেরকেও মাঝে মাঝে শিকার করতে দেখা যায় এদের।

অন্যদিকে, লেসার স্যান্ড প্লোভারেরা ‘প্লোভার’ জাতীয় পক্ষী পরিবারের অন্তর্গত। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম চারাড্রিয়াস মঙ্গোলাস। এরা মূলত পরিযায়ী পাখি; তবে শীতকালের বেশিরভাগটা নদী তীরবর্তী উষ্ণ বালিয়াড়িতে কাটিয়ে দিতে পছন্দ করে এরা।

পক্ষী সংরক্ষণের বিষয়টিতে বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হয়েছেন সুন্দরবন কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছেন তাঁরা। সুন্দরবনের পাখিদের শীতকালীন প্রজনন ও বিশ্রামাগারগুলিকে যাতে আরও বেশি সুরক্ষিত করে তোলা যায়, তা খতিয়ে দেখছেন আধিকারিকেরা। এছাড়াও বনাঞ্চল ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলেও যাতে পাখিদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা যায় সেদিকেও তাঁরা লক্ষ্য রেখেছেন। এমন জায়গাগুলিতে পাখিদের প্রজনন এবং বিশ্রামের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম আবাস।

তবে কেবলমাত্র এই পদক্ষেপগুলি নিয়েই থেমে থাকেননি বনকর্মীরা। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বারংবার নানাবিধ ক্যাম্প ও সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করেছেন তাঁরা। কারণ একমাত্র মানুষের মধ্যে পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলে, তবেই এদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা সম্ভব।

Developed by DXDasia