বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করতে নিউ ইয়র্কে সরোদ পরিবেশন করেছিলেন আলি আকবর খাঁ

তিনি সংগীতের সুরে জয় করেছেন গোটা বিশ্ব

বাবা সংগীতের তালিম দিচ্ছেন ছেলেকে। কড়া শাসনে দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত রেওয়াজ করতে হয়। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। কারো সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। বাবার সঙ্গেই খেতে বসতে হয়। খাওয়ার সময় মাত্র ৩ মিনিট। সময় পেরিয়ে গেলে উঠবে হবে খাওয়া অসমাপ্ত রেখেই। কখনও মা লুকিয়ে জানলা দিয়ে খাইয়ে যেতেন ছেলেকে। বাবার যখন শতবর্ষ বয়স পেরিয়ে গিয়েছে, তার পরেও শিখিয়ে চলেছেন ছেলেকে। এমন গুরু আর ক’জনের ভাগ্যেই মেলে! বাবা তো আর যে সে মানুষ নন। তিনি উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। আর ছেলে্র নাম আলি আকবর খাঁ, তিনিও সংগীতের সুরে জয় করেছেন গোটা বিশ্ব।

আলাউদ্দিন খাঁ’র কর্মস্থান ছিল মাইহার। সেখানেই বাবার কাছে কণ্ঠসংগীত শেখা শুরু করেন আলি আকবর খাঁ, মাত্র ৩ বছর বয়সে। চাচা ফকির আফতাবউদ্দিনের কাছে তবলা শিখতেন। বাবার থেকে বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রের পাঠ নিয়েছিলেন। তারপর সরোদ নিয়েই একনিষ্টভাবে অনুশীলন চালিয়ে যেতে থাকেন। বাবার মাইহার ঘরানাকেই আলি আকবর খাঁ ধরে রেখেছিলেন। ১৩ বছর বয়সে এলাহাবাদে তিনি প্রথম এক সংগীত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সেই সম্মেলনেই কয়েক বছর বাদে ১৯৩৯ সালে পণ্ডিত রবিশঙ্করকে সংগত করেন সরোদে। সঙ্গীতকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্যে লখনৌর অল ইন্ডিয়া রেডিওয়ে যোগ দিয়েছিলেন। তার আগে থেকেই রেডিওতেও সংগীত পরিবেশন করতেন তিনি।

যোধপুরের রাজদরবারে সংগীতশিল্পী হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলেন আলি আকবর খাঁ। মহারাজ হনবন্ত সিং তাঁকে ‘উস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কয়েক বছর যোধপুরে থাকার পর আলি আকবর খাঁ চলে যান মুম্বাই। অবতীর্ণ হন সংগীত পরিচালকের ভূমিকায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’, তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর মতো বাংলা ছবিতেও সুরারোপণ করেছেন। 

সারা বিশ্বে রাগসংগীত পরিবেশন করেছেন আলি আকবর খাঁ। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্য নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান প্রমুখ অংশ নিয়েছিলেন এই অনুষ্ঠানে। সেখানে উস্তাদ আলি আকবর খাঁ সরোদ পরিবেশন করেছিলেন। তিনি সংগীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। দেশে বিদেশে নানান সম্মাননা লাভ করেছেন। 

উস্তাদ আলি আকবর খাঁ বলেছিলেন, “অন্তত দশ বছর সংগীত সাধনা করলে নিজে তৃপ্তি পেতে শুরু করবে। বিশ বছর সাধনা করলে তুমি তোমার শ্রোতাদের তৃপ্তি দিতে পারবে। সাধনা ত্রিশ বছর অতিক্রম করলে হয়তো তোমার গুরু তৃপ্ত হতে পারেন; কিন্তু ঈশ্বরকে তৃপ্ত করার জন্য তোমাকে আরো আরো অপেক্ষা করতে হতে পারে …”

তথ্যসূত্র – বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। 

Developed by DXDasia