কণ্ঠ সঙ্গীত এবং যন্ত্র সঙ্গীত উভয় বিষয়েই পারদর্শী ছিলেন বাহাদুর খাঁ
দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
বাহাদুর খাঁ এবং পীর বক্স মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ দেব-এর সমকালে সপ্তদশ শতকে বিষ্ণুপুরে আসেন। এই দুজন শিল্পী আসার পরে বিষ্ণুপুরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার নবযুগের সূচনা হয়। বাহাদুর খাঁ কণ্ঠ সঙ্গীত এবং যন্ত্র সঙ্গীত উভয় বিষয়েই পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন মূলত সেনী ঘরানার গায়ক। বাহদুর খাঁ আসার পর রাজা রঘুনাথ সিংহ দেব ঘোষণা করেন যে যাঁদের কণ্ঠ সুমিষ্ট তাঁদেরকে বিনা খরচে রাজ দরবারে সঙ্গীত শিক্ষা দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, যারা দরিদ্র তাদেরও সঙ্গীত শিক্ষার জন্য আর্থিক সাহায্য করা হবে। বিষ্ণুপুরের সুপ্রসিদ্ধ সঙ্গীত গুরু রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখা ‘সঙ্গীত মঞ্জরী’ বইতে বাহাদুর খাঁ রচিত সাহানা রাগে চৌতালে নিবদ্ধ রাজা রঘুনাথ সিংহ–র গুণ গান বর্ণিত একটি ধ্রুপদের উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে এই গানটির বিষয় আলোকপাত করলেন বিষ্ণুপুরের নিজের ঘরে বসে(লোক মুখে দরবার) সঙ্গীত মঞ্জরী খুলে দেখিয়ে ধ্রুপদ গায়ক ও বর্তমান বিষ্ণুপুর রাজ দেবব্রত সিংহ ঠাকুর।
এই গানটি রামপ্রসন্ন বন্দ্যপাধ্য্যায় তাঁর পিতা অনন্তলাল বন্দ্যপাধ্যায়ের নিজের লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে নিজের কণ্ঠে তুলেছিলেন। তাঁরই লেখা ‘মৃদঙ্গ দর্পণ’ বইতে মৃদঙ্গ বাদক পীর বক্সের উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেবব্রত সিংহ ঠাকুর আরও জানালেন যে রাজা গোপাল সিংহ দেও সম্পর্কে গুণগান করে একই রকম ভাবে ভণিতা সহ একটি ধ্রুপদ রচনা করেছিলেন অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ধ্রুপদের রাগ ছিল বাগেশ্রী আর তাল ছিল চৌতাল। এ ধরণের উদাহরণ গুলি সঙ্গীতের ধারায় বিষ্ণুপুর রাজ বংশের পৃষ্ঠপোষকতার ও দরদী দর্শন দিয়ে সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখার যে পদক্ষেপ তাঁরা নিয়েছিলেন সেই সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে দেয়। দেবব্রত সিংহ ঠাকুর স্পষ্ট ভাবে গেয়ে শোনালেন ডাগর বাণীর ধ্রুপদের সঙ্গে বিষ্ণুপুর ঘরের ধ্রুপদের ফারাকের চেহারাটিকে। ডাগর বাণীতে অনুভব করা গেল দাপট আর লয় কারির অজস্র দানার ভিড় আর চঞ্চলতা অন্য দিকে বিষ্ণুপুর যেন নিবেদনের আধ্যাত্মিক কোমলতায় মহিমাময়।
অন্য দিকে বিষ্ণুপুরের নাদবাদ্যযন্ত্র সঙ্গীতের ধারা শুরু হয় পীর বক্স থেকে। মূলত পাখোয়াজ এবং তবলায় বিষ্ণুপুর উৎকর্ষ লাভ করে পীর বক্স বিষ্ণুপুরে আসার পর থেকে। বিষ্ণুপুরে ধ্রুপদের চল বেশী থাকাতে পাখোয়াজের চল বেশি দেখা যায়। পীর বক্সের পরে যাঁদের হাতে বিষ্ণুপুরে এই বাজনার গৌরব তৈরি হল তাঁরা হলেন গদাধর চক্রবর্তী, জগৎ চাঁদ গোস্বামী, গিরীশ চট্টোপাধ্যায়, রামপ্রসন্ন বন্দ্যপাধ্যায়ের হাতে। সেই ধারা আজও অব্যাহত। সঙ্গীতের ইতিহাস বলে যে, যে সময় থেকে খেয়ালের প্রচলন হল তখন থেকেই এখানে তবলা বাদনের চর্চা শুরু হয়। তবলা এবং পাখোয়াজের ধারায় একটি গৌরব সূচক নাম হল সুবোধ নন্দী। সুবোধ নন্দী প্রথমে বিষ্ণুপুরের বিজন হাজারির কাছে শিক্ষা নিয়েছিলেন। বিষ্ণুপুর ঘরের জ্ঞান গোঁসাইয়ের সাথে সঙ্গত করতেন সুবোধ নন্দী। সুবোধ নন্দীর সমসাময়িক আরেকজন তবলা বাদকের নাম হল সত্তার আলী খাঁ। বিষ্ণুপুরের লোকজন তাঁকে ডাকতেন সতীশ খাঁ বলে। তাই বলা যায় যে বাহাদুর খাঁ থেকেই বিষ্ণুপুরের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারার সূচনা হয় মল্ল রাজাদের আনুকুল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। ক্ষেত্র সমীক্ষা এবং তথ্য সমীক্ষা থেকে সেরকম সিদ্ধান্তে আমারা পৌছতেই পারি।