কলকাতায় একটি বিকল্প-থিয়েটার সফর
চলন্ত ট্রামে নাটক! গতবছরই এহেন কাণ্ড ঘটিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন জিতাদিত্য চক্রবর্তী ও তাঁদের নাট্যদল ’সম্পর্ক’। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম ভাড়া নেওয়ার খরচ জানতে গিয়ে যে দলের মাথায় হাত পড়েছিল। ভেবেছিল কী করে এই খরচ জোগাড় করবে। পরে নিজেরাই ঠিক করে মাসে মাসে টাকা জমাবে, পথনাটক করে টাকা জোগাড় করবে। হয়ও তাই। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পুজো উপলক্ষে পথনাটক করে, টাকা জমিয়ে অবশেষে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ট্রামস্থ’ হয় সম্পর্ক-এর নাটক। এবার ‘সাইট-স্পেসিফিক’ থিয়েটার বা একটি বিকল্প-থিয়েটারের সঙ্গে আরও একবার স্মৃতিদের ঘরে ফেরার পালা। চলতি মাসে আবারও দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ-টালিগঞ্জ রুটে উড়বে ‘উড়োচিঠি’!

জীবন বা বয়সের চলনের মতো ‘উড়োচিঠি’-র গল্প এগিয়ে যায়, আবার এক জায়গায় এসে থামে। আবার এগিয়ে যায়। একসময় গল্পটা সেখানে গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। ‘সার্কল অফ লাইফ’ বা ‘জীবনচক্র’।
গত বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে চারটে চারটে করে শো হয়েছিল। প্রথমবারের দর্শক প্রতিক্রিয়া কেমন? “ট্রামের নস্ট্যালজিয়াকে কেন্দ্র করে এই নাটকে আমরা যে গল্পটা বলি, প্রথমবারেই দর্শক সেটার সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন। অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, পুরোনো কথা ভাগ করে নিচ্ছিলেন। গতবার এরকম অনেক মানুষ এসছিলেন যাঁরা হয়তো সেভাবে থিয়েটার দেখেন না কিন্তু ট্রামে নাটক হচ্ছে- এই বিষয়টা দেখার জন্যই এসেছিলেন শুধুমাত্র। এবং এক্ষেত্রে নানা বয়সের দর্শক পেয়েছি আমরা, এটা আমাদের কাছে দারুণ পাওনা। পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই নাটকটা দেখে আমায় বলেছেন, ‘স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছিল’। এছাড়া ট্রামে এরকম একটা কাণ্ড, সেই জার্নিটা সকলের ভালো লেগেছিল।” বলেন জিতাদিত্য।

যে জায়গায় নাটক করছি, সেটাকে নিয়ে গল্প বলা –এককথায় এই হল ‘সাইট স্পেসিফিক থিয়েটার’। ‘উড়োচিঠি’ শুরু হবে টালিগঞ্জের ট্রাম ডিপো থেকে। দর্শক আসবেন, ট্রামে বসবেন, চা খাবেন। ট্রাম চলতে শুরু করবে। টালিগঞ্জ মেট্রোর সামনে থামবে। চরিত্ররা উঠবে। অভিনয় শুরু হবে। এ ভাবে নাটক চলতে থাকবে। বিভিন্ন স্টপেজে থামবে। ট্রাম এগোবে। নতুন চরিত্ররাও উঠবে। নাটক এগিয়ে চলবে। নাটক শেষে ট্রাম ফিরে যাবে টালিগঞ্জে। ট্রামটাও যেন এই নাটকের একটা চরিত্র। জিতাদিত্য বলেন, “জীবন বা বয়সের চলনের মতো ‘উড়োচিঠি’-র গল্প এগিয়ে যায়, আবার এক জায়গায় এসে থামে। আবার এগিয়ে যায়। একসময় গল্পটা সেখানে গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। ‘সার্কল অফ লাইফ’ বা ‘জীবনচক্র’। এটা বোঝানোর জন্যই ট্রাম বেছে নেওয়া।”
নাটকটা এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ‘নাটক দেখতে গেছি’ এই অনুভূতিটাই না হয়। এমনিতে বেশির ভাগ মানুষই প্রসেনিয়াম বা মঞ্চের বাইরে নাটক বিষয়টাকে এখনও সেভাবে ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। জিতাদিত্য বলছিলেন তাঁদের নাটক দেখে অনেকেই বলেছেন, ‘আরে তোমরা এত ভালো থিয়েটার করছো, মঞ্চে করো না কেন! তোমরা ডিজার্ভ কোরো অ্যাকাডেমিতে শো করা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। জিতাদিত্য’র কথায়, “কিছু নাট্যশিল্পী বা দর্শকের ধারণা রয়েছে নাটক মানেই মঞ্চ। মঞ্চে করলে সেটা ‘সাইট-স্পেসিফিক’ থাকে কীকরে! আমি প্রসেনিয়ামের বিরুদ্ধে নই, ওটা একটা আলাদা ক্ষেত্র কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা যেভাবে করছি সেটা ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এছাড়া, এটার অন্য একটা দিকও আছে। নাটকের গল্প বা স্পেসেরও নিজস্ব রাজনীতি আছে। সব গল্প আমি মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারি না। আমি যে গল্পটা দর্শকদের দেখাতে চাইছি সেটার জন্যে তো মঞ্চের মতো ওই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ব্যাপারটার কোনও প্রয়োজনীয়তা নাই থাকতে পারে।”

‘উড়োচিঠি’র গল্প অরণ্য আর সুচেতনা’র। চরিত্ররা নাটকের মাঝেই কোনও দর্শককে হয়তো প্রশ্ন করলেন- ‘আচ্ছা আপনার সঙ্গে এরকম ঘটলে, আপনি কী করতেন?’ এরপর নাটক কিছুক্ষণ থামিয়ে দেওয়া হয়। দর্শকরা তাঁদের কথা বলতে থাকেন। এটাই অন্তরঙ্গ থিয়েটার (Intimate Theatre)-এর মজা। অভিনেতা ও দর্শকের দূরত্বহীন পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া, সরাসরি ও তৎক্ষণাৎ। “আমার মনে আছে গত অক্টোবরের শো’তে এক প্রৌঢ় দম্পতি এসেছিলেন। ট্রামের মধ্যে নাটকের একটি দৃশ্যে যখন প্রেমপত্র নিয়ে কথা হচ্ছে, তখন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি হঠাৎ তাঁর যৌবনের স্মৃতিচারণা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের জন্য কখনও প্রেমপত্র লিখিনি, কিন্তু বন্ধুদের প্রচুর লিখে দিয়েছি একসময়।’ একথা শুনে তো তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী একেবারে অবাক! মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন, ‘কই আমাকে তো একটাও লিখলে না!’। দেখুন, কে কবে প্রেমপত্র দিয়েছে বা দেয়নি সেটা বড়ো কথা নয় কিন্তু এই যে নাটকের মধ্যে তাঁদের নিজস্ব কিছু মুহূর্ত তৈরি হলো, এগুলোই আমাদের ভালোলাগার জায়গা। গত বছর আটটা শো’য়ে সেটা বারবারই ঘটেছে।” নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন জিতাদিত্য।

আগামী ২৭ ও ২৮-এ মে আসছে 'উড়োচিঠি'! বিকেল ৫টায় ও সন্ধ্যে ৭টায় (দু দিনই)। নাটকটির আনুমানিক সময় এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট। ট্রামের দ্বিতীয় কামরায় ৩০ জন দর্শক থাকবেন। প্রথম কামরা থেকে আবহ এবং আলো প্রক্ষেপণ করা হবে। এই নাটকের জন্য লাইট নিয়েও তাঁরা আলাদা করে ভেবেছেন। কারণ, এখানে মঞ্চের আলো ব্যবহার করা যাবে না, বেশি পাওয়ারফুল আলো ট্রামের মধ্যে ব্যবহারের অনুমতিও পাওয়া যায় না। তাই এই নাটকের জন্য তাঁরা কিছু এলইডি লাইটকে নিজেদের মতো করে, রেগুলেটরের মাধ্যমে ডিমার বানিয়ে সেগুলির তীব্রতা নিয়ন্ত্রিণের চেষ্টা করেন। ট্রামের নিজস্ব যে আলো, সেগুলোর সংযোগ সেসময় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পুরোটাই নিজেদের বানানো আলোয় নাটকটা চালিয়ে নিয়ে যায় সম্পর্ক নাট্যদল। নাটকটি লেখা, পরিচালনা, অভিনয়ের পাশাপাশি আলো-নির্দেশনার কাজটিও সামলেছেন জিতাদিত্য। উড়োচিঠি’র জন্য গান লেখা থেকে শুরু করে সুর করা, আবহ সবটাই দেবদীপের নির্মাণ। মোট ন’জন অভিনেতা রয়েছেন নাটকটিতে। তাঁদের বাদ দিয়ে ২২ জন রয়েছেন নাটকের নেপথ্যে। অভিনয় করেছেন জিতাদিত্য চক্রবর্তী, ঐশ্বর্য মহালানবিশ, রম্যানি বসাক, রূপকথা রায়, রিজা ঘোষ, ভূমিকা প্রামানিক, প্রদর্শ ভট্টাচার্য, রিতম জানা।

এটা কি ট্রামের ১৫০ বছর পূর্তির কথা ভেবে? জিতাদিত্য জানান , “না, একেবারেই না। ‘সাইট-স্পেসিফিক’ নাটক নিয়ে আমার এই প্রচেষ্টা অনেক আগে থকেই। আমি নাটক নিয়ে পড়েছি এবং পেপার ছিল ‘সাইট-স্পেসিফিক’ নাটক নিয়ে। এই জঁরের থিয়েটারে একটা সমস্যা হল দর্শক সংখ্যার একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। তবে, আমরা এইমুহূর্তে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি গল্পে। গল্প যেভাবে চাইছে সেভাবেই স্পেস নির্বাচন করছি। এখানে কোনও আপোস করতে চাইছি না আমরা। ৫০০ মানুষকে দেখানোর জন্য যদি আমাদের ৫০টা শো করতে হয়, তাহলে তাই করবো। প্রচুর দর্শককে দেখাতে গিয়ে গল্প বলায় কোনও আপোস করতে রাজী নই। অর্থনৈতিক সহযোগীতার জন্য কেউ যদি বিজ্ঞাপন বা অন্য কোনওভাবে পাশে দাঁড়ান, ভালো লাগবে।”
ছবি ও তথ্য ঋণঃ
জিতাদিত্য চক্রবর্তী