
প্রথম ভারতীয় হিসেবে কানের Un Certain de Regard পেলেন অনসূয়া
জাতির গর্ব বা গড়িমা কীসে বাড়ে? ধর্মে না কৃষ্টিতে? এই জবাব খোঁজা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে দেশীয় রাজনীতি এবং তার করাল রূপ নিয়ে বাগাড়ম্বর করা এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে শিল্পের আঙিনায় লুকিয়ে থাকা রাজনীতি এবং তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকা একটা মাধ্যম ও সেই সমস্ত শিল্পীদের নিয়ে কথা বলা, যাঁরা নিজেদের জায়গা পোক্ত করে নিতে পারলেও আমাদের সমাজ ও সংগঠন তাঁদের অপাংক্তেয় করে পাশে সরিয়ে রাখে।

অনসূয়াকে এর আগে বাঙালি দেখেছে, অঞ্জন দত্তের ম্যাডলি বাঙালি-তে, তানিয়া চরিত্রে। আর সেরকম ভাবে তাঁকে দেখা যায়নি। বিশ্বের দরবারে সেই ‘অনামী’ অভিনেত্রীর হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমা সম্মানিত হল।
এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪ (Festival De Cannes 2024)-এ ভারতীয় শিল্পীদের জয় জয়কার প্রমাণ করে, প্রোপাগান্ডা ও বাজারি হুড়োহুড়িতে সবাই গা ভাসিয়ে দেয়নি। এবং এখানে সব থেকে আশ্চর্যের খবর হল একজন ভারতীয় হিসাবে প্রথমবার Un Certain de Regard বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেন অনসূয়া সেনগুপ্ত (Anasuya Sengupta)। অনসূয়াকে এর আগে বাঙালি দেখেছে, অঞ্জন দত্তের ম্যাডলি বাঙালি-তে, তানিয়া চরিত্রে। আর সেরকম ভাবে তাঁকে দেখা যায়নি। বিশ্বের দরবারে সেই ‘অনামী’ অভিনেত্রীর হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমা সম্মানিত হল।
প্রসঙ্গত চলে আসে ফিল্মি দুনিয়ার ‘ধর্মের’ কথা। সেই ধর্মের নাম গ্ল্যামার। সেই ধর্মের মূল মন্ত্র ‘সেলিব্রিটি’ তকমা। সাদা চামড়া, লাস্যময়ী মুখশ্রী, দেহের আবেদন — সামাজিক ভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই সমস্ত কিছু আড়াল করে দেয় নারীদের শিল্প ও শৈল্পিক ক্ষমতাকে। বাংলা সিনেমা নিয়ে ইদানীং এক প্রকার ঝড় উঠেছে, তা হল এখানে ভালো সিনেমা হয় না। তার অন্যতম কারণ বোধহয় এই ধর্মাচরণ। এক প্রকার বিপণনি সৌন্দর্যকেই চিনতে ও ব্যবহার করতে শিখেছেন এখানকার পরিচালকেরা। অনেকেই মনে করেন “পাবলিক নেবে না, কারণ তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত রূপ হল গোলগাল লক্ষ্মীমন্ত চেহারা। ঋত্বিক ঘটক একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, “ফিল্ম মানে কী?”

খুবই জরুরি এই প্রশ্ন। যার উত্তর অধিকাংশ বাঙালি কখনোই খোঁজার চেষ্টা করেননি। অথচ মালায়লিদের পাশাপাশি বাংলা ছবিই এক অন্যধারার গল্প বলার ক্ষেত্রে ব্রতী ছিলো। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর মতো পরিচালক, শ্রীলা মজুমদারের মতো অভিনেত্রী কাউকেই তাঁরা উদযাপনের বিষয় করে উঠতে পারেননি। মাথায় রাখতে হবে বর্ণবিদ্বেষ, পিছিয়ে পড়া মানসিকতা শ্রীলা মজুমদারের বুকে বিষম পাথর হয়ে বসেছিল। রামতনু লাহিড়ী যে শিক্ষার প্রসার শুরু করেছিলেন, চিন্তা ভাবনার যে নজিরকে স্থান দিতে শুরু করেছিলেন তাকে নিয়ে আমরা কেন চলতে পারলাম না? তেমনই অনসূয়ার দক্ষতাকে এতদিন পরে কন্সটান্টিন বোজানভ নামক পরিচালক জায়গা করে দিলেন তার ছবি দ্য শেমলেস-এ। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এখানে দেখার একটা সমস্যা হচ্ছে। শৈল্পিক দক্ষতাকে কিছু বাহ্যিক পরিমাপের সঙ্গে এক আসনে বসিয়ে দক্ষতার অপচয় করা হচ্ছে ক্রমাগত এবং তাকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের ফিল্ম কৃষ্টির অংশ। এই কৃষ্টিকেই বারবার মেডিওক্রিটি বলে সম্বোধন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল উৎকর্ষের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া হল কেন? কেন উৎকর্ষের দিকে না গিয়ে আমরা এই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসালাম। এর উত্তরটাও সহজ। বাংলা সিনেমার বলিউডিকরনের চেষ্টা।

কিন্তু বাঙালি বা বাংলা সিনেমার কি কোনো টনক নড়বে? বলা মুশকিল। কিন্তু অনসূয়ার এই জয় বারবার চিৎকার করে জানায় যে, বাঙালিরা সত্যিকারের কমিটেড শিল্পীদের পাশে কোনোদিন দাঁড়াননি। এবং অনসূয়ার মতো হাজার হাজার অনসূয়ারা সেই আলোর খোঁজ করতে করতে হারিয়ে যান। ঠিক যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন মৃণাল সেনের প্রিয় অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদার।
