কেন বাঙালি আজও মজে দূরদর্শনের মহালয়ায়?

ভোরের আলতো রোদ সবে মাত্র এসে পড়েছে দেউড়িতে। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘে আছে নিদারুণ শান্তি। ঠান্ডা বাতাস জানান দিচ্ছে, সে এসেছে। পূর্ব দিকের জানলা খুলে একটা লম্বা নিশ্বাস টেনে নিজেকে সতেজ করার আনন্দ আছে এই মরশুমে। এই মরশুমে আসে সেই আদুরে ভোর, যে ভোরে একবার হলেও বাঙালি ঘুম ঘুম চোখে আগমনী শুনতে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়ে একরাশ আনন্দ নিয়ে। যে আনন্দের সৃষ্টিকর্তা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরবর্তীকালে সেই আনন্দ যখন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে, তখন প্রথম দূরদর্শনে দেবী দুর্গা রূপে অবতীর্ণ হন সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রথম বাঙালি যে রোমাঞ্চ অনুভব করেছিল, তা আজকেও ভোলার নয়। সময় বদলেছে। মাধ্যম পাল্টেছে।মায়াভরা অভিনেত্রীরা মহালয়াতে দুর্গা রূপে অভিনয় করেছেন, আধুনিক হয়েছে সামগ্রিক দৃশ্যপট, তবুও সেই নয়ের দশকের জৌলুশহীন সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় আজও বাঙালির মণিকোঠায়। (দুরদর্শনের মহালয়া)

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে যে যত সরল ও সহজবোধ্য হয় শিল্পরূপ, তত দ্রুত তা দর্শকের মনে প্রভাব ফেলে। সেই পুরোনো মহালয়ার সারল্যই বাঙালির মনে গেঁথে গিয়েছে, যেখানে আজকের মহাকাব্যিক গ্রাফিক্স অনেক সময় দূরত্ব তৈরি করে।

মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির কাছে প্রিয় সাতকাহনের সূচনা। টেলিভিশনের অসংখ্য চ্যানেল আজ কোটি টাকা খরচ করে দেবীর আগমনীকে ঘিরে তৈরি করছে ভিএফএক্স, হচ্ছে ঝলমলে অনুষ্ঠান। তবু আশ্চর্য এই যে, বাঙালির মনে চিরকালীন রঙিন হয়ে আছে সেই দূরদর্শনের মহালয়া। যেখানে সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ অথচ তীব্র অভিনয়, মিতব্যয়ী নৃত্য, আজও যেন শিউরে উঠতে বাধ্য করে। ১৯৩১ সাল থেকে রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনীর সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। তখনকার দিনে এটি ছিল এক প্রকারের রিচুয়াল ব্রডকাস্ট। ভোরবেলা পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই মিলে রেডিওর সামনে বসতেন, শিশুরা ঘুমচোখে শুনত আর সেই সম্মিলিত শোনার অভিজ্ঞতা পরিণত হয়েছিল এক সামাজিক আচার্যে। মনোবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় কালেকটিভ মেমোরি অর্থাৎ স্মৃতি ব্যক্তিগত নয়, বরং সমষ্টির অংশ হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতাই প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আবদ্ধ রেখেছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাই হয়ে উঠেছিল সেই অনুষ্ঠানের শক্তি। সাদাকালো টিভি, সীমিত টেলিভিশন সেট, ভিজ্যুয়াল এফেক্টের কোনও চটকদারিত্ব নেই ফলে দর্শকের মনোযোগ আটকে থাকত মূল উপস্থাপনায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে যে যত সরল ও সহজবোধ্য হয় শিল্পরূপ, তত দ্রুত তা দর্শকের মনে প্রভাব ফেলে। সেই পুরোনো মহালয়ার সারল্যই বাঙালির মনে গেঁথে গিয়েছে, যেখানে আজকের মহাকাব্যিক গ্রাফিক্স অনেক সময় দূরত্ব তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নস্টালজিয়া মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। এটি বর্তমানের অনিশ্চয়তা থেকে মনকে রক্ষা করে। দূরদর্শনের মহালয়া সেই নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিবার শোনার সময় মানুষ কেবল দেবীর আবাহনই করে না বরং নিজের শৈশব, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, পাড়ার সমবেত পরিবেশকেও ফিরিয়ে আনে। আজকের মহালয়া যতই জমকালো হোক, সেটি এই ব্যক্তিগত-সমষ্টিগত স্মৃতিকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। (দুরদর্শনের মহালয়া)

বাঙালির সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বে দেবী দুর্গার সঙ্গে যুক্ত আবেগও বিশেষ ভূমিকা রাখে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ বাঙালির অবচেতনে দেবীর আগমনের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। ১৯৭৬ সালে দূরদর্শন যখন নতুন কণ্ঠে মহালয়া প্রচার করতে চেয়েছিল, তখন প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এমনকী আন্দোলনের মতো পরিস্থিতি ঘটে। এটাই প্রমাণ করে যে, মানুষের মন প্রতীকের প্রতি কতটা সংবেদনশীল। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রতীকমূলক আসক্তি আমাদের পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই ভিত্তিপ্রস্তর রূপকার দুই বাঙালি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিবারই ঠিক দুর্গাপুজোর আগে এই দুজন মানুষকে ঘিরে তৈরি হয় বিরাট বৃত্ত। তাঁদের নিয়ে লেখালেখি থেকে, পুরোনো সাক্ষাৎকার ফিরে দেখা, কতকিছুই ঘটে এবং ঘটবে। হয়তো এখানেই এই দুজন মানুষের সফলতা। কীভাবে আজও তাঁরা চিরন্তন হয়ে আছেন। তাঁদের পরে অনেকেই এসেছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে ভরে উঠেছে মহালয়ার বিভিন্ন প্রচেষ্টা। কিন্তু সেগুলো কেন চিরস্থায়ী হল না? কেন মানুষ সেগুলো ভুলে গেল সহজেই? (দুরদর্শনের মহালয়া)

সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা চলাকালীন তিনি মহিষাসুরমর্দিনী-র চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। তখন তিনি গোটা বিষয়টার জন্য একেবারে অপ্রস্তুত। সময়টা ছিল জুলাই-অগাস্ট। গুরু পিগোবিন্দন কুট্টির কাছে কথাকলি শিখতেন তখন। তিনিই একদিন সংযুক্তাকে কলামণ্ডলমে ডেকে পাঠান সকাল বেলা, দূরদর্শনের কোনও এক অনুষ্ঠানের জন্য নৃত্যশিল্পীদের অডিশন হবে। গিয়ে দেখেন দূরদর্শনের বেশ কয়েকজন প্রযোজক-পরিচালক ও তাঁদের সহকারীরা সেখানে রয়েছেন। তারপর তিনি অডিশন দেন এবং তিনি তখনও জানেন না যে কীসের জন্য অডিশন দিচ্ছেন। তারপর বাকি অংশটা অনেকটা ইতিহাসের মতো হয়ে রয়েছে। টানা প্রায় মাস দুয়েকের কঠিন পরিশ্রম ও রিহার্সালের পর শ্যুটিং শুরু হয়েছিল। (দুরদর্শনের মহালয়া)

সত্তর ও আশির দশকে ভারত সরকার দূরদর্শনকে ব্যবহার করেছিল জাতীয় ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে—একই কণ্ঠ, একই দৃশ্যপট, একই সময়ে গোটা দেশকে এক স্রোতে বেঁধে রাখা ছিল এর উদ্দেশ্য। ফলে দর্শক মনে করত, দূরদর্শনের পর্দায় দেখা দেবী শুধু টিভির চরিত্র নন, তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।

শ্যুটিংয়ের সময় খেতেন হবিষ্যি। মাটির তৈরি ৮টা হাত বেঁধে পারফর্ম করতেন। প্রথম প্রথম অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তাঁর। পরবর্তীকালে কুমোরটুলি থেকে শিল্পীদের নিয়ে আসা হয়। তাঁরা ফাইবারের হাত তৈরি করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর বদলে একবার হেমা মালিনীকে আনা হয়েছিল মূল চরিত্রে। কিন্তু হইহই রব উঠল, তারপর আবার সেই সংযুক্তাতেই মজে রইল বাঙালি। অর্থাৎ দিনের শেষে প্রবল আকর্ষণীয় হেমা মালিনীকেও তুচ্ছ করে বাঙালি ফিরল সংযুক্তাতেই। আবেগ, আদর, অভিমান প্রথম সবকিছু জুড়েই। একসময় রেডিওই ছিল ভোরের একমাত্র সঙ্গী। মহালয়ার দিনে সবাই একই সঙ্গে অনুষ্ঠান শুনত। আজকের দিনে যেখানে অসংখ্য টিভি চ্যানেল, ইউটিউব বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ভিন্ন ভিন্ন কনটেন্ট ছড়িয়ে আছে, সেখানে সেই একসঙ্গে উপভোগ করার আবহ আর তৈরি হয় না। আরেকটি বড়ো দিক হল অপেক্ষার আনন্দ। পুরোনো সময়ে মহিষাসুরমর্দিনী ছিল একদিনের বিশেষ অনুষ্ঠান। সারা বছর ধরে মানুষ ভোরবেলায় সেটি শোনার জন্য প্রস্তুত হতো। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রতীক্ষা আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বিপরীতে আজকের ভিএফএক্স-নির্ভর কনটেন্ট বা মহালয়ার অনুষ্ঠান যে কোনো সময় পাওয়া যায়, টিভির রিপিট টেলিকাস্ট বা ইউটিউবের ক্লিকে। সহজলভ্যতা আনন্দকে ততটা গভীর হতে দেয় না।

আমাদের আজও মনে আছে অমল চৌধুরীকে। তিনিও বাঙালির মনিকোঠায় অমলিন রয়ে আছেন।প্রথম যে বছর মহালয়া দেখানো হল, তাতে মহিষাসুরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অশোকনগরের বাসিন্দা আঁকার মাস্টার অমল চৌধুরী। যেমনি লম্বা, তেমনই চওড়া। বড়ো বড়ো চোখ, পাঁকানো গোঁফ- মহিষাসুরের সঙ্গে এত মিল বোধহয় আর কারও ছিল না। এলাকায় তাকে অনেকে অসুরকাকু হিসাবেও চেনেন। শুধু অসুর নয়, কখনও অসুরের প্রধান সেনাপতি আবার কখনও যমরাজ, বিভিন্ন ভূমিকায় মহালায় তাকে দেখা গিয়েছে। তবুও আজকে তাঁর অনুপস্থিতি টের পায় আপামর বাঙালি। যে বাঙালির শিরায় শিরায় যে অসুরসুলভ ভয় গেঁথে দিয়েছিলেন সেই ভয়ের লেশমাত্র এখন নেই। তবুও তাঁকে মনে পড়ে।

একটিমাত্র অনুষ্ঠান, তাও সময়ের সাপেক্ষে মাত্র একদিনের জন্য। সেই অনুষ্ঠানের দুই কলাকুশলীকে বাঙালি এতটা ভালোবেসে ফেলল যে তাঁদের ভোলা অসম্ভব। তাই তো বারবার প্রশ্ন জাগে, এমন কী ছিল সেই অনুষ্ঠানে যা আজও বাঙালিকে বুঁদ করে রাখে! হয়তো মনোবিজ্ঞানের তথ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সেসবের বাইরেও একটা জগৎ আছে। নন্দনতত্ত্ব আর শিল্পরীতির দিক থেকে দূরদর্শনের পুরোনো মহালয়ার সাফল্যের রহস্য অনেকটা একইসূত্রে বাঁধা। ভিএফএক্স যতই ঝলমলে হোক, তাতে থাকে কৃত্রিমতার গন্ধ। দর্শক বোঝে পর্দার দেবী আসলে গ্রাফিক্সের ফসল। সত্তর ও আশির দশকে ভারত সরকার দূরদর্শনকে ব্যবহার করেছিল জাতীয় ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে—একই কণ্ঠ, একই দৃশ্যপট, একই সময়ে গোটা দেশকে এক স্রোতে বেঁধে রাখা ছিল এর উদ্দেশ্য। মহালয়া সম্প্রচার সেই সাংস্কৃতিক রাজনীতিরই অংশ, যেখানে বাংলার আঞ্চলিক আচার-অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে তুলে ধরা হয়। ফলে দর্শক মনে করত, দূরদর্শনের পর্দায় দেখা দেবী শুধু টিভির চরিত্র নন, তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার আবহ আজকের বেসরকারি চ্যানেলের মহালয়ায় আর নেই। ওগুলো অনেকবেশি বাজারমুখী এবং প্রতিযোগিতামূলক। তাই পুরোনো মহালয়া বাঙালির স্মৃতিতে কেবল আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।

Written by