কৃষ্ণনগরের প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো কোনটি? দ্বিতীয় বা তৃতীয় পুজোরই বা কী ইতিহাস?

প্রবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম জুড়ে আছে। আর সেই কাজের বিষয়ে শীলমোহর দিচ্ছেন দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের লেখা এই অংশ – ‘রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় জগদ্ধাত্রী ও অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন’। ‘ক্ষিতীশবংশাবলীচরিত’ বইতে এমন কথাই লিখছেন তিনি। সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ‘স্বপ্নাদেশ’-এর প্রচলিত এক কাহিনি। (কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো)

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পাবার পর কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সঙ্গে দেখা করে স্বপ্নের দেবীর কথা জানিয়েছিলেন। একথার সত্যতা নেই। কারণ আগমবাগীশের সময়কাল ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে। আর কৃষ্ণচন্দ্রের সময়কাল ১৭২৮ থেকে ১৭৮২। কাজেই আগমবাগীশের সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্রের দেখা হবার কোনো সম্ভবনা নেই। তাহলে কার সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ নিয়ে আলোচনা করলেন? প্রচলিত এক কাহিনির ভিত্তিতে অনুমান করা হয় বৃহত্তর নবদ্বীপের রাজারাম তর্কবাগীশের পুত্র কালীশঙ্কর ঠাকুরের কাছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পরামর্শ নিয়েছিলেন। কালীশঙ্কর ছিলেন একজন বড়ো তান্ত্রিক। যিনি কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় সমাদৃত হয়েছিলেন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র শিবচন্দ্রকে দেখে নবাব আলিবর্দি খাঁ-এর দৌহিত্রী মুগ্ধ হয়ে যান। আলিবর্দি খাঁ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ছেলের সঙ্গে তাঁর দৌহিত্রীর বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কৃষ্ণচন্দ্র ছেলেকে মুসলিম ঘরে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। সেই সময় কালীশঙ্কর ঠাকুর কৃষ্ণচন্দ্রকে কিছুটা সময় চাইতে বললেন নবাবের কাছ থেকে। ঐ সময়ের মধ্যে কালীশঙ্কর এমন তান্ত্রিক ক্রিয়া করেন, যার ফলে আলিবর্দি খাঁ-এর দৌহিত্রী মারা যায়। কাজেই তান্ত্রিক কালীশঙ্কর ঠাকুর কৃষ্ণচন্দ্রের কাছের লোক হয়ে ওঠে। অনুমান করা যেতে পারে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র শুধু কর দেননি বলেই নবাব তাঁকে ও তাঁর ছেলে শিবচন্দ্র সহ বন্দি করেছিলেন, তা নয়। শিবচন্দ্রের সঙ্গে দৌহিত্রীর বিয়ে দিতে পারেননি বলেও কৃষ্ণচন্দ্রের ওপর নবাবের রাগ ছিল। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, কেবল কথিত রয়েছে। (কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো)

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ির পুজোটি প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো কৃষ্ণনগর শহরে। তাহলে দ্বিতীয় পুজো? দ্বিতীয় পুজোটি এই শহরে মালোপাড়ার পুজো। তারপরে পুজো শুরু হয় বাগদি পাড়াতে। আর চতুর্থ পুজোটি ঘূর্ণি দাস পাড়ার। এইগুলোই কৃষ্ণনগরের সব থেকে প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজো।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একদিকে হিন্দু রাজা। এছাড়াও তিনি শাক্ত উপাসক। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একদিকে যবনের সঙ্গে সংসর্গ করছেন তিনি। কীভাবে? কৃষ্ণচন্দ্রের নবরত্ন সভার শ্রেষ্ঠ গায়ক ছিলেন কলাবৎ বিশরাম খাঁ, কথক নিত্যশিল্পী ছিলেন শের মামুদ, সেনাপতি মামুদ জাফর, ঘোড়া শালার রক্ষক হাবসি ইমামবক্স । কিন্তু মনে মনে চাইছেন তিনি স্বতন্ত্র হিন্দু রাজা হয়ে উঠতে। কাজেই মুঙ্গের দুর্গ থেকে ইংরেজদের সাহায্যে মুক্ত হওয়ার পরেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নতুন এক পুজো শুরু করলেন। আসলে নিজেকে যবনের কারাগার থেকে মুক্ত করার আনন্দকে ‘সেলিব্রেট’ বা উদযাপন করলেন। (কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো)

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ির পুজোটি প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো কৃষ্ণনগর শহরে। তাহলে দ্বিতীয় পুজো? দ্বিতীয় পুজোটি এই শহরে মালোপাড়ার পুজো। তারপরে পুজো শুরু হয় বাগদি পাড়াতে। আর চতুর্থ পুজোটি ঘূর্ণি দাস পাড়ার। এইগুলোই কৃষ্ণনগরের সব থেকে প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজো। কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে ‘অবতলের মানুষরা’ সামাজিকভাবে সুরক্ষা পাবার আশাতে সব থেকে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছিলেন চৈতন্যদেব প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মে। কাজেই কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে সব থেকে বেশি চ্যালেঞ্জের ছিল অবতলের মানুষদেরকে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা। আর ঠিক সেই কারণেই রাজবাড়ি থেকে পুজোর খরচ বাবদ অর্থাৎ ‘পারিতোষিক’ হিসেবে তিন ‘বৃত্তি ভিত্তিক’ পাড়াতে পুজো শুরু করানো হয়। এখনও পর্যন্ত মালোপাড়া বারোয়ারিতে নবমীর পুজোর দিন পনেরো টাকা আসে রাজবাড়ি থেকে। এই টাকা দিতে আসেন রাজপরিবারের লোকেরাই। বাকি দুটো পাড়াতে আসে না কেন? তার মূল কারণ তারা ট্রাডিশনকে ধরে রাখতে পারেনি। কৃষ্ণনগর শহরের মধ্যে একমাত্র মালোপাড়া যারা নিজেদের পুজোর ট্রাডিশন থেকে এক চুলও সরেনি। আসলে কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন ‘ধর্মসচেতন, পৌত্তলিকতার প্রচারক, শিল্প অনুরাগী একজন হিন্দুরাজা’।কাজেই অবতলের মানুষদের পুজো করার অনুমতি দিয়ে শাক্ত ধর্মকে প্রচার করলেন। সঙ্গে বৈষ্ণব ধর্মকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করলেন। (কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো)

ষাটের দশকে চাষাপাড়া বারোয়ারি ঠাকুর পরিচিত ছিল ‘চাষা মা’ নামে। অনেক পরে কোনো এক অজ্ঞাত কারণেই চাষাপাড়া বারোয়ারির প্রতিমা পরিচিত হয় ‘বুড়িমা’ নামে। বাংলার মানুষ এই শহরের বড়িমাকে এক ডাকে চেনেন। তবে বুড়িমার মণ্ডপে পুজোর দিনে ‘যাত্রাপালা’ হওয়ার রীতি বেশ পুরোনো। সত্তরোর্ধ্ব শিক্ষক সমীররবণ সাহার কাছ থেকে জানা যায়, ষাটের দশকে দক্ষিণ কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো বলতে ছিল মাত্র তিনিটে। বালোকেশ্বরী বারোয়ারি, চকেরপাড়া বারোয়ারি ও হাটখোলাপাড়া বারোয়ারি। সেই সময় চকেরপাড়া বারোয়ারিতে পুজোর দিনে রাস্তাতে বসিয়ে পাতা পেতে পাতলা খিচুড়ি খাওয়ানো হত ভক্তদের। আর সন্ধে হলে জ্বলতো হ্যাজাকের আলো। কৃষ্ণনগর শহরে বেশ কিছু অন্য রকমের জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। যেমন বালকেশ্বরী বারোয়ারির পায়ের নিচে হাতির কাটা মাথা বা ‘করীন্দ্রাসুর’ থাকে না। থাকে একটা গোল পৃথিবী। ‘জগদ্ধাত্রী’ ও ‘গন্ধেশ্বরী’ দেবীর মধ্যে একটাই পার্থক্য গন্ধেশ্বরী দেবীর পায়ের নিচে হাতির মাথা থাকে না। থাকে পৃথিবী। আসলে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে গন্ধেশ্বরী দেবী বালকেশ্বরী বারোয়ারিতে জগদ্ধাত্রী হিসেবে পুজো পান।

কৃষ্ণনগর শহরে প্রথম চার দিনের পুজো শুরু করে নুড়িপাড়া বারোয়ারি। ২০০০ সালের পরে এই বারোয়ারির মায়ের নাম দেওয়া হয় ‘চারদিনী মা’। ভাইফোঁটার পর কৃষ্ণনগর শহরের অলিগলি জুড়ে শুধু একটাই চর্চার বিষয়- জগদ্ধাত্রী ও পুজোর থিম।

কৃষ্ণনগর শহরের মধ্যে বাঘাডাঙাতে বাঘ থাকত। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কৃষ্ণনগর পৌরসভার ‘জন জীববৈচিত্র নথি’ থেকে জানা যায় পৌর এলাকার ভেতর কোনোদিন কোন বাঘ ছিল না। এই এলাকায় প্রচুর বাঘের মতো দেখতে ‘বাঘরোল’ ছিল। অঞ্জনা নদীতে কুমির থাকত। রাজার দিঘিতে ঘরিয়াল ছাড়া হয়েছিল, রাজবাড়ির তরফ থেকে। এছাড়া রাজবাড়িতে হাতি ছিল। যাক সে কথা। ‘বাঘা’ জায়গা অর্থাৎ বন্যার জল যেখানে ওঠে না। তাই জায়গার নাম হয় বাঘাডাঙা। বাঘাডাঙা বারোয়ারির প্রতিমার নাম ‘বাঘা মা’। এই পাড়ার বাসিন্দা নাট্যকার সুশান্তকুমার হালদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানকার ঠাকুরের সিংহের পায়ের নিচে ষাটের দশকেও বাঘ ছিল না। আশির দশকের শেষের দিকে সিংহের পায়ের নিচে বাঘ এসেছে। আগে বারোয়ারিতে একটা তিন থাকের কাঠের সিংহাসন ছিল। সেখানে দু’পাশে তিনটে করে ছ’টি সখী ছিল। সেই সিংহাসনে মা জগদ্ধাত্রী বসতেন। এখন সেই সিংহাসন অতীত। পাল্টে গেছে পুজোর চেহারা।

কৃষ্ণনগর শহরে প্রথম চার দিনের পুজো শুরু করে নুড়িপাড়া বারোয়ারি। ২০০০ সালের পরে এই বারোয়ারির মায়ের নাম দেওয়া হয় ‘চারদিনী মা’। ভাইফোঁটার পর কৃষ্ণনগর শহরের অলিগলি জুড়ে শুধু একটাই চর্চার বিষয়- জগদ্ধাত্রী ও পুজোর থিম। চাষাপাড়ার বুড়িমাকে বাদ দিলেও এই শহরের প্রত্যেকটি জগদ্ধাত্রীর গায়ে সোনার গহনা রয়েছে। যে ঠাকুরের সব থেকে কম গহনা রয়েছে, তারও কেজি খানিক সোনার গহনা রয়েছে। এই শহরের বেশির ভাগ প্রতিমা দেবী মূর্তি। পুতুল মূর্তি খুব কম, হাতে গুণে কয়েকটা। আজ গোটা রাজ্য কার্ণিভালের দিকে ঝুঁকছে। ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে বহুদিন আগে থেকে কৃষ্ণনগর শহরে কার্ণিভাল হত। রানি জ্যোতির্ময়ী দেবীর আমল থেকে এই শহরে কার্নিভাল শুরু হয়। শহরের সব ঠাকুর বিসর্জনের সময় রাজবাড়িতে আসতো। সে প্রথা এখনও রয়েছে।

___________
ছবি: আলেখ্য স্টুডিও, বংশী মোদকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

Written by