
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আলোচিত হল: ভারতের জাতীয় সিনেমা কী?
‘জাতীয় সিনেমা’ এই শব্দবন্ধ থেকে আমরা কী বুঝবো? যেসব সিনেমা একটি নির্দিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত? তাহলে, ভারতের মতো বহুভাষা ও সংস্কৃতির দেশে নির্দিষ্ট কোনও ভাষা বা জাতির ছবিকে ‘জাতীয় সিনেমা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় কি! ‘ভারতের জাতীয় সিনেমা কী?’ (What is National Cinema) এমন বিষয় নিয়েই ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এক মনোজ্ঞ আলোচনা সভা বসেছিল শিশির মঞ্চে। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফিরদৌসুল হাসান, গৌরী রাম নারায়ণ, শৈবাল চট্টোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, ও.পি শ্রীবাস্তব। দর্শকাসনে ছিলেন কিফ-এর চেয়ারপার্সন গৌতম ঘোষ এবং জব্বর প্যাটেল।
যদি আবিশ্বের তাবড় তাবড় চলচ্চিত্রবেত্তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় ভারতীয় পরিচালকদের কথা, হলফ করে বলা যায় তাঁরা প্রথমেই বলবেন সত্যজিৎ রায়, তারপর আসতে পারে মালায়লম, তামিল, হিন্দি ছবির পরিচালকদের নাম। বিশ্বখ্যাত পরিচালক মার্টিন স্করসেসি বলেছেন, ‘পথের পাঁচালি শুধু ভারত নয়, সারা পৃথিবীর শিকড় চিনতে শিখিয়েছিল’। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ে সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্তরা গড়ে তুলেছেন ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, মাউন্টব্যাটন বসে দেখেছেন ‘মীরা’ নামের ছবিটি। তাতে অভিনয় করেছিলেন, এম এস সুব্বুলক্ষ্মী, তিনি দক্ষিণ-ভারতীয় গায়িকা। ছবিতে গেয়েছিলেন পশ্চিম ভারতের বিদ্রোহিনী মীরাবাঈয়ের গান। একেই বোধহয় বলে জাতীয়তাবাদ। বাদল সরকার, বিজয় তেন্ডুলকর, মোহন রাকেশ, গিরিশ কারনাড এঁদের কাজ দেখেই তো চেনা যায় দেশকে। অথচ, জাতীয়তা বিষয়টি বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরীয় হলেও গত এক দশকের বেশি সময় সমগ্র দেশ দেখেছে পেশিবহুল জাতীয়তাবাদের উত্থান। ‘এক ভারত অভিন্ন ভারত’ এই ধরনের কথা প্রহেলিকা ছাড়া কিছু নয় : বলছিলেন নাট্যকার, অভিনেতা সুমন মুখোপাধ্যায়।
তাঁর কথায়, “জোর করে জাতীয়তাবাদ চাপানোর মধ্যে ফ্যাসিবাদ আছে।” সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতে, প্রেমচন্দ্র, জয়শঙ্কর প্রকাশ, মোহন রাকেশ মোটেও হিন্দি সংস্কৃতির প্রতিনিধি নন। বরং উত্তর ও মধ্য ভারত কেন্দ্রিক এক সংস্কৃতিকে তাঁরা আয়ত্ত করার চেষ্টা করেন।
প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান বলেন, “আমি মস্কো গিয়ে দেখেছি সেখানে রাজ কাপুরের ছবির গান চলছে ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি’। পাশাপাশি মস্কোবাসীরা ‘জিমি জিমি জিমি আজা আজা আজা’ গানে নাচছেন, মজা পাচ্ছেন। তাহলে কীসের জাতীয় সিনেমা?” অন্যদিকে, চলচ্চিত্র সমালোচক শৈবাল চট্টোপাধ্যায় বলেন, “পুষ্পা ২ মুক্তি পেয়েছে। যুগ এসেছে ‘আরআরআর’ ঘরানার ছবি বানানোর। আমি পূর্ববঙ্গের ছেলে। ছোটোবেলাটা রাঁচিতে কেটেছে। তারপর কলকাতা। তাহলে আমি কী করে বুঝব জাতীয়তাবাদ কাকে বলে?”
যদি আবিশ্বের তাবড় তাবড় চলচ্চিত্রবেত্তাদের জিজ্ঞেস করা হয় ভারতীয় পরিচালকদের কথা, হলফ করে বলা যায় তাঁরা প্রথমেই বলবেন সত্যজিৎ রায়, তারপর আসতে পারে মালায়লম, তামিল, হিন্দি ছবির পরিচালকদের নাম।
এই আলোচনায় একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে- সিনেমার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। সেই ভাষাই তাকে জাতীয় স্তরে পৌঁছে দেয়। এদিনের আলোচনায় উঠে আসে হিন্দি গানের জনপ্রিয়তার বিবর্তনের কথাও।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪-এর ৩০তম সংস্করণ। এদিন সমাপ্তি অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গোল্ডেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ডে সেরা ছবি হল ‘তারিকা’ (বুলগেরিয়া), এই বিভাগে সেরা পরিচালক হলেন আনা এন্ডেরা (বিলাভড ট্রপিক)। হীরালাল সেন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ডে সেরা সিনেমা হয়েছে ‘লাচ্ছি’ (কন্নড়)। সেরা বেঙ্গলি প্যানোরমা ফিল্ম হল ‘ধ্রুবর আশ্চর্য জীবন’। সেরা ভারতীয় তথ্যচিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ‘ভবতোষের কারখানা’।
