সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার

নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করছে জেলা প্রশাসন

‘সব তীর্থ বারবার/ গঙ্গাসাগর একবার!’ প্রতি বছরই এই প্রবাদবাক্য মনে করিয়ে দেয় গঙ্গাসাগর মেলায় লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড়। মকর সংক্রান্তির মাহেন্দ্রক্ষণে স্নান সারবেন তাঁরা। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পুণ্যার্থীদের স্বাগত জানাতে সেজে উঠেছে সাগরতট। গঙ্গাসাগর মেলা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সাগর দ্বীপে অনুষ্ঠিত অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। রাজ্য সরকারের সাহায্যে আয়োজিত, ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে ১০ জানুয়ারি, চলবে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত।

সাগরতীরের সার কথা মকর-সংক্রান্তিতে সাগর সঙ্গমে পুণ্যস্নান। তাই যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড়।

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবনাঞ্চলের সাগরদ্বীপের পৌরাণিক নাম শ্বেতদ্বীপ। এরই দক্ষিণাংশে গঙ্গা যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, সেই স্থানটি গঙ্গাসাগর নামে খ্যাতি পেয়েছে। সামনে আদিগন্ত সমুদ্র, পেছনে শ্যামল বনানী আর বালুকাময় বেলাভূমির মাঝখানে মহর্ষি কপিলের মন্দির। হিন্দু-মানসে গঙ্গাসাগর একটি মহাতীর্থ হিসেবে গণ্য। সাগরতীরের সার কথা মকর-সংক্রান্তিতে সাগর সঙ্গমে পুণ্যস্নান। তাই যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড়। খনার বচনে বলা আছে, ‘‘সারা বছর যাঁরা শয়ন একাদশী, ভৈমী একাদশী, উত্থান একাদশী, পার্শ্ব একাদশী, জন্মাষ্টমী, রামনবমী, শিব চতুর্দশী বা দুর্গার মহাষ্টমীর মতো শাস্ত্রীয় আচারের একটিও পালন করতে পারবেন না, তাঁরা যদি পৌষ সংক্রান্তির দিন শুধু একবার সাগরসঙ্গমে স্নান করেন, তা হলে সর্বতীর্থের পুণ্য অর্জন করবেন।”

মেলার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক:
পুণ্যস্নান: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে (যেখানে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশেছে) স্নান করলে পূর্বপুরুষদের আত্মা মুক্তি পায় এবং সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়।  

কপিল মুনির আশ্রম: এই মেলার মূল আকর্ষণ হলো পৌরাণিক ঋষি কপিল মুনির আশ্রম। স্নান শেষ করে ভক্তরা আশ্রমে পূজা দেন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগীরথ তার পূর্বপুরুষদের অভিশাপ মুক্ত করতে গঙ্গাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন এবং সাগর দ্বীপে তাদের মুক্তি ঘটেছিল।

জনসমাগম: কুন্ত মেলার পর এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী, সাধু-সন্ন্যাসী এবং পর্যটক এখানে সমবেত হন। ২০২৬ সালে ভিড় সামলাতে প্রশাসন থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা এবং ই-স্নান ও ই-দর্শন এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সাংস্কৃতিক মিলনমেলা: মেলাটি শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাংস্কৃতিক মিলনের ক্ষেত্র। সাগরতটে অস্থায়ী তাঁবু, গ্রামীণ হস্তশিল্প এবং ধর্মীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায় এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়।

বাংলার মন্দির দর্শন: পশ্চিমবঙ্গ সরকার এটিকে একটি বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করেছে, যেখানে ‘বাংলার মন্দির দর্শন’-এর মতো নতুন আকর্ষণ যোগ হয়েছে। তীর্থযাত্রীরা বাংলার ঐতিহ্যশালী মন্দিরগুলি দর্শন করতে পারবেন এই সাগর মেলাতেই। মেলার যাত্রাপথের বিভিন্ন স্থানে থাকছে বাংলার বেশ কিছু আদি মন্দির ও দেবদেবীর থ্রি ডি মডেল। পাশাপাশি গতবারের মতো এবারও গঙ্গাসাগর সমুদ্রতটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘সাগর আরতি’। এছাড়াও থাকছে ই-স্নান ও ই-পুজোর ব্যবস্থা।

গঙ্গাসাগর মেলায় প্রথমবার এই প্রযুক্তির ব্যবহার করছে জেলা প্রশাসন, যা সমুদ্রসৈকতজুড়ে নজরদারি থেকে শুরু করে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজে বড়ো ভূমিকা নেবে।

প্রসঙ্গত, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মেলায় যেতে এখন আর কোনও তীর্থ-কর দিতে হয় না। কপিলমুনির আশ্রম-সহ মেলা প্রাঙ্গণ সাজানো থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাস-ভেসেল-লঞ্চ-জেটি নদীপথ ড্রেজিং, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা, আলোকসজ্জা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, হাসপাতাল-ডাক্তার-নার্স- অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, তীর্থযাত্রীদের থাকার জায়গা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা, জরুরি ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার পরিষেবা, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, এবারের গঙ্গাসাগর মেলায় পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করছে প্রশাসন। ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলায় প্রথমবার মোতায়েন হয়েছে অত্যাধুনিক ওয়াটার ড্রোন বা রেসকিউ ড্রোন, যা সমুদ্রসৈকতজুড়ে নজরদারি থেকে শুরু করে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজে বড়ো ভূমিকা নেবে।

 

কলকাতা থেকে রেলপথে কীভাবে যাবেন গঙ্গাসাগরে?
ট্রেনে যেতে চাইলে আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে শিয়ালদা দক্ষিণ শাখার প্ল্যাটফর্মে। সেখান থেকে আপনি নামখানা লোকাল ধরুন। সেই ট্রেনে পৌঁছে যেতে পারেন একেবারে শেষ স্টেশন নামখানা কিংবা তারও কিছুটা আগে কাকদ্বীপ স্টেশনে। কাকদ্বীপে নামলে স্টেশনের কাছ থেকেই পেয়ে যাবেন অটো-টোটো কিংবা মোটরভ্যান। সেই ছোট গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে লট-৮-এর ঘাটে। এই লট-৮ ঘাট থেকে আপনাকে নদী পেরোতে হবে। নদীর ওপারে কচুবেড়িয়ায় নামুন। সেখান থেকে ফের অটো-টোটো,বাস কিংবা অন্যান্য ছোট গাড়ি পেয়ে যাবেন গঙ্গাসাগরে পৌঁছোতে। এছাড়া নামখানা স্টেশনে নেমেও আপনি গঙ্গাসাগরে যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন
গঙ্গাসাগর মেলায়, কপিলমুনির আশ্রমের কাছেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম (WBTDCL) পরিচালিত গঙ্গাসাগর ট্যুরিজম প্রপার্টি। বুকিং করার যোগাযোগ- ইমেইল: baulacademy2022@gmail.com, অনলাইন বুকিং: WBTDCL-এর ওয়েবসাইট।
 

Developed by DXDasia