
বাংলায় ওয়াফেলের জয়যাত্রা কমদিন শুরু হয়নি, ঔপনিবেশিক কায়দায় বাণিজ্য একেই বলে
আমাদের চপ আন্তর্জাতিক লেভেলে খ্যাতি পেল না। অথচ রাস্তাঘাটে কালিকা বা লক্ষ্মীনারায়ণ সাউয়ের প্রসিদ্ধ আলুর চপ, কাশ্মীরি চপ খাওয়ার সময় আমরা আশা করি ম্যাকদোনাল্ড, সাবওয়ে, কেএফসির মতো বিপণন এসব তেলেভাজারও হবে বৈকি। কিন্তু ঝাঁ চকচকে এসি দোকানে বসে ব্যাসন গুলে বেগুনি বা ফুলুরি ভাজতে কাউকে দেখলাম না। বরং চোখের সামনে দেখলাম তো পাস্তা, পিৎজা, স্যান্ডউইচ কীভাবে বাজার ধরে নিল। এঁদো গলির তেলচিটে দোকানের চপ-কে লেংগি মেরে হালফিলে এসি নিয়ন্ত্রিত ঝকঝকে দোকানের ‘ওয়াফেল’ নামক বস্তুটিকেও শূন্য থেকে শুরু করে বাজার ধরতে দেখেছি।
এসব ভাবতে ভাবতেই চৌকো ছাঁচে মণ্ড তুলে দিয়েছেন দোকানদার। আমি আসন্ন ভূমিষ্ঠ ওয়াফেলের কথা ভেবে শিহরিত হলেও উল্টোদিকে বিশেষ কথা তিনি বলেন না। বুঝলাম, বেশি কথা বললে কোম্পানির কর্পোরেট ভাবসাব আসে না।
বাংলায় ওয়াফেলের জয়যাত্রা কমদিন শুরু হয়নি। ঔপনিবেশিক কায়দায় বাণিজ্য একেই বলে। ময়দা, ইস্ট, চিনি, দুধ নইলে প্রিমিক্স পাউডার মিশিয়ে যে মিশ্রণ বা মণ্ড তৈরি করা হয়, ছাঁচে ফেলে সাকুল্যে সেটাই অনেক বেশি দামে বিক্রি আর ব্র্যান্ডিং। মধু, চকলেট, আইসক্রিম, কোকো, নিউটেলা, কফি যেভাবে দিয়ে খাওয়া হবে, সেই অনুযায়ী ওয়াফেলের নামকরণ আর দাম। সারা পৃথিবীতে ওয়াফেল খাওয়া হলেও ওয়াফেলের স্বর্গ কিন্তু বেলজিয়াম। রসিকরা বলেন, মার্কিনি ওয়াফেলের থেকেও বেলাজিয়াম ওয়াফেল আরও হালকা এবং গভীর খাঁজবিশিষ্ট। এদিকে ব্রাসেলসের ওয়াফেল জমে উঠেছে কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাঁদের স্বভাবসিদ্ধ সৃজনশীলতার দ্বারা ওয়াফেলকে দিয়েছে নতুন নতুন রূপ। ওয়াফেল জংশন, বেলজিয়ান ওয়াফেল ইতিমধ্যে সাড়াও ফেলে দিয়েছে শহরে শহরে। অনলাইন অ্যাপের ডেলিভারি বয়ের সাহায্যে বাড়িতে এই আবহে পৌঁছে যাচ্ছে নানারকমের ওয়াফেল। ওয়াফেলের মহিমা চেখে দেখতে বাঙ্গুরের বেলজিয়ান ওয়াফেল কোংয়ের দোকানে হানা দিয়েছিলাম। ভারতে বেলজিয়ান ওয়াফেল কোং দারুণ ব্যবসা করে নিয়েছে ইতিমধ্যে। ওয়াফেলের বংশে প্রথম কুইক সার্ভিস রেস্টুরেন্ট হিসেবে জনপ্রিয়তার সেরা হকদার এই কোম্পানি।

সাগরপারের এই বিদেশি বস্তুকে বাঙ্গুরের আউটলেটে অবাঙালি মালিকের দোকানে বিক্রি করছিলেন হাবড়ার বাঙালি কন্যে। কথাবার্তায় বুঝলাম, ট্রেনিং নিয়ে তিনি দক্ষ ওয়াফেল প্রস্তুতকারক বনেছেন। ছাপোষা বাঙালি হিসেবে মেনুকার্ড দেখে দাম ছাড়া কিছুই বুঝিনি। হানি বাটার, মেপল বাটার, স্ট্রবেরি বা ব্লুবেরি ক্রিম চিজ, চকোলেট ইত্যাদি আন্দাজ করা গেলেও ব্ল্যাক ভেলভেট বা রেড ভেলভেট বুঝতে পারিনি। দেয়ালে চোখ বুলিয়ে পেলাম আরো অনেক নাম। কাজুনাট বাটার, পিঙ্ক আমন্ড ক্রাঞ্চ, বাটারস্কচ ক্রাঞ্চ, ক্ল্যাসিক বেলজিয়াম, কিটক্যাট ইত্যাদি আরো কত আইটেম।
আরও পড়ুন: অপু্র ‘চপের’ সংসার
হাবড়ার বাঙালি কন্যা তখন বললেন, “মূলত বেলজিয়াম থেকে আনা বেলজিয়ান চকোলেট সকলে পছন্দ করেন। এছাড়াও হানি বাটার বা অন্য কিছুও খেতে পারেন।”
একশো টাকার নিচে কিছু নেই। অন্যদের তুলনায় হানি বাটার যথেষ্ট সস্তা বলে এটাই অর্ডার করে বসে রইলাম। মাথার উপর বিজ্ঞাপনে ওয়াফেলের কেক ঝুলছে। দেয়ালে লোভনীয় নানাবিধ ওয়াফেলের ছবি টাঙানো। মূলত কাস্টমার কারা? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “মারোয়াড়িরাই বেশি অর্ডার করেন। কালেভদ্রে বাঙালিরাও আসেন খেতে।” দোকানের কাউন্টারে একগাদা ছোটো ছোটো কৌটো। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, এসব কৌটোর ভিতরেই চকোলেট আসে বিদেশ থেকে। ব্যাপারটা নেহাত এলেবেলে নয়, সত্যজিৎ রায় বা মৃণাল সেনের মতোই আন্তর্জাতিক। এমন আন্তর্জাতিক ওয়াফেলের সুতিকাগারে বসে বসে ওয়াফেল তৈরি দেখে আমারও চপশিল্পের ভবিষৎ নিয়ে আশা জাগছিল। মার্কেটিংয়ের জন্য প্রথমেই আগে টিনের চাল আর তেলচিটে দোকান বাদ দিয়ে এমন কাচের দরজাওয়ালা এসি দোকান নিতে হবে। তারপর ভয়ানক দাম ধরে রেট চার্ট সাজাতে হবে। পাঁচ টাকার আলুর চপকে টিস্যু পেপার আর ঝকঝকে প্যাকেটে মুড়ে নাইনটি নাইন অনলিতে বিক্রি করতে হবে। পেটিএম বা আমাজনে কিনলে ফ্ল্যাট পঞ্চাশ টাকা ছাড়।

এসব ভাবতে ভাবতেই চৌকো ছাঁচে মণ্ড তুলে দিয়েছেন দোকানদার। আমি আসন্ন ভূমিষ্ঠ ওয়াফেলের কথা ভেবে শিহরিত হলেও উল্টোদিকে বিশেষ কথা তিনি বলেন না। বুঝলাম, বেশি কথা বললে কোম্পানির কর্পোরেট ভাবসাব আসে না। মফস্সলের কেলোদা বা বটুদা তো চপ কিনতে গেলে সাতপুরুষের গল্প জুড়ে দেয়। এটাও পাল্টাতে হবে মার্কেটিংয়ের জন্য।
ততক্ষণে মস্ত রুটির মতো সাইজের ওয়াফেল চারভাগে ভাঁজ হয়ে গিয়েছে। অবশেষে বেলজিয়াম ওয়াফেলের লোগো আর ছবি দেওয়া কাগজের খামে ভরে হানি বাটার ওয়াফেল হাতে উপস্থিত হল। মুখে দেওয়ার আগে একডজন সেলফি তুলে নিলাম ওয়াফেলের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক বস্তু আবার জীবনে খাওয়া হবে কিনা জানি না তো! আপাতত সোশ্যাল মিডিয়াতে দিতে অসুবিধা নেই। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যি মুখে দেয়ার পালা। আমার পূর্বপুরুষেরাও এমন আন্তর্জাতিক বস্তু কখনও খায়নি। সে হিসেবে আমিই বংশের প্রথম যে এটি মুখে দেব। ইশ, যদি কেউ ছবি তোলার থাকত! কোনোরকম সাক্ষী ছাড়াই আমি ওয়াফেলের শরীরে ঐতিহাসিক কামড় দিলাম।

টিভিতে দেখেছি নামি কোম্পানির কিছু আইসক্রিম বা ডেজার্ট খেলে যেমন মডেলের মুখের ভেতর দুধ বা ক্ষীরের সমুদ্র ঢেউ খেলে যায়, তেমনি আমার মুখেও কিছু একটা খেলে গেল। গরম গরম নরম মুচমুচে সুস্বাদু মিষ্টি মিষ্টি ওয়াফেলের সঙ্গে কোনো বাঙালি খাবারের তুলনা করতে পারব না। শুধু ভেবে নিলাম, বাঙালির বিয়েবাড়ির শেষপাতে আইস্ক্রিমকে সরিয়ে ওয়াফেলকে রাখাই যায়। কালের নিয়মে একদা লাল মিষ্টি দইকে মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল এই আইসসক্রিম। এবারও আইস্ক্রিমকে সরালো বলে! অল্প অল্প কামড়ে স্বাদ অনুভব করতে করতে ঘুরে এলাম অ্যাংলো পাড়া বা বেলজিয়াম, ফ্রান্স থেকে। ওয়াফেল গপাগপ খাবার জিনিস নয় মোটে, সৌখিন মেজাজ ও মন তৈরি করে আগামী কামড় অপেক্ষা করবে।
একেক কামড়ে একেক ভবিষ্যৎ দেখতে পেলাম। ওয়াফেল শুধু সল্টলেক, লেকটাউন, পার্ক স্ট্রিট এলাকার বা অ্যাংলো পাড়ার সম্পত্তি হয়ে থাকবে না। মল, রেস্তোরাঁ বা পাবের সংস্কৃতি ছাড়িয়ে ওলিগলির বাজার দখল করবে ওয়াফেল। শুধু দামটা কমিয়ে দিলেই সেটা সম্ভব। বাংলার ঘরে ঘরে ওয়াফেল স্যান্ডউইচ, ওয়াফেল কেক হৈ-হৈ করে বিক্রি হবে। পাস্তা, পিৎজাকে টেক্কা দিয়ে গড়ে উঠবে আরেক ওয়াফেল সংস্কৃতি।

