
আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশ থেকেও শ্রীখোল শেখানোর অনুরোধ আসতে থাকে
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একবার বলেছিলেন: ‘প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ আসে’। একইভাবে, প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক অতিমারি আমাদের সামনে নতুন পথ খুলে দিয়েছে; সারা বিশ্ব খুব দ্রুত ‘অনলাইন’-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমনকী, গ্রামের কীর্তনীয়ারা এখন অনলাইনে শ্রীখোল বাজানো শেখাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের। হ্যাঁ, অনলাইনের মাধ্যমেই বাংলার এই বাদ্যযন্ত্র পৌঁছে গিয়েছে পাশ্চাত্যে।
এখন আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ দখল করেছে ইন্টারনেট। প্রভাবিত করার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট অনেক সুযোগও তৈরি করেছে। গতবছর হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পর নদিয়ানন্দন বৈরাগ্যের মতো অনেকের জীবনেই অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল। শ্রীখোল বাদক নদিয়ানন্দন বিভিন্ন মন্দিরে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একটি কীর্তন দলে সঙ্গত করেন। লকডাউনে তাঁর একটিমাত্র উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামের কিছু ছেলেকে শ্রীখোল শেখানো শুরু করলেও পরে তা বন্ধ করে দেন। প্রচণ্ড হতাশার মধ্যেই শ্রীখোল বাজিয়ে, সেই ভিডিয়ো সোশাল মিডিয়ায় তুলে ধরেন এবং আবেদন জানান, তিনি অনলাইনে শ্রীখোল শেখাতে চান, যদি কেউ আগ্রহী হয় তাঁর সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে।
আরও পড়ুন: মঙ্গলকাব্যের স্মৃতি ঘেরা ইছাই ঘোষের দেউল
তারপর যা ঘটেছিল, তা ছিল নদিয়ানন্দনের কল্পনার বাইরে। শুধু এই দেশ থেকে নয়, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশ থেকেও শ্রীখোল শেখানোর অনুরোধ আসতে থাকে তাঁর কাছে।
বাংলার বহু ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র যেমন মাদল, বাংলা ঢোল, ঢাক এগুলির মতো শ্রীখোলেরও একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এটি মৃদঙ্গেরই ভিন্ন একটি রূপ, মূলত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িত। আসাম এবং মনিপুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলায় এই বাদ্যযন্ত্র নতুন একটি নামে পরিচিতি পায়। শ্রীখোলে অনেকধরণের তাল বাজানো হয়, যেগুলির নিজস্ব নির্দিষ্ট বোলবানী রয়েছে। প্রায় ১০৮ ধরণের তাল রয়েছে, যেগুলির মধ্যে ৮০টি এখনও পালা-কীর্তনে বাজানো হয়।
নদিয়ানন্দন ঠিক করেন তিনি ঝুঁকি নেবেন। বর্তমানে তিনি ১৫ জন আন্তর্জাতিক ছাত্রকে (তাদের মধ্যে দুজন আমেরিকার, তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকার এবং দুজন অস্ট্রেলিয়ার) শ্রীখোল শেখান। ওড়িশা, আসাম সহ অন্যান্য রাজ্যের আরও ছাত্র রয়েছে তাঁর, যারা খুব মনযোগ দিয়ে তাঁর কাছে শ্রীখোলের পাঠ নিচ্ছে। অনলাইন ক্লাসে ছাত্ররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা তাদের ‘গুরুজী’র জন্য। মঙ্গলকোটের একটি অজ গাঁয়ের বাসিন্দা নদিয়ানন্দন এভাবেই উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন এবং শ্রীখোল বাদক হিসেবে তাঁর এই আন্তির্জাতিক খ্যাতি অন্যান্য সঙ্গীতশিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।
আরও পড়ুন: ধর্মমঙ্গলের নদী বল্লুকা
অনলাইনে শ্রীখোল শেখাবেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দ্বিধায় পড়েছিলেন নদিয়ানন্দন। প্রথমেই তিনি হোঁচট খেয়েছিলেন বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষা না জানার জন্যে। তবে, শুধুমাত্র ভাষার জন্য তার কাজ আটকে থাকতে দেননি তিনি। বিদেশি ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে তাঁর এলাকায় ভাষায় পারদর্শী এমন কাউকে দোভাষীর কাজের জন্য অনুরোধ করেন তিনি। ভাষা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান হওয়ার পর তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাঁর অনলাইন ক্লাস, সংসারের অন্নসংস্থান নিয়ে আর ভাবতে হয় না তাঁকে, ঠিক সময়ে গুরুদক্ষিণা পেয়ে যান তিনি। নদিয়ানন্দনের কথায়, “আমি কখনও ভাবতে পারিনি যে বিদেশের ছাত্রদেরও আমি শ্রীখোল শেখাতে পারবো। তবে, আমাদের দেশের সমৃদ্ধশালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরে এবং পাশ্চাত্যের দরবারে এই প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রটি তুলে ধরতে পেরে ভালোই লাগছে।”
