
জামদেশপুরের ক’জন প্রকৃতি-পাগল ছেলে ‘সভ্যতা’র গ্রাস থেকে প্রকৃতিকে বাঁচানোর এক অসম্ভব সাহসী স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন
গ্রামের নাম ডঙ্গোরজুরি- কিন্তু এই নাম ওখানকার লোক প্রায় ভুলেই গেছে, সবার কাছে এখন এটা ‘ভালোপাহাড়’।পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের কাছে এই আশ্রম।‘আশ্রম’ই বলব তো? জামদেশপুরের ক’জন প্রকৃতি-পাগল ছেলে ‘সভ্যতা’র গ্রাস থেকে প্রকৃতিকে বাঁচানোর এক অসম্ভব সাহসী স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন- ঠিক করেছিলেন অন্তত একটা গ্রাম যদি রক্ষা করা যায়, রক্ষা করা যায় তার পরিবেশ, আদিম সংস্কৃতি, তাদের শেখানো যায় যদি স্বপ্ন দেখতে। পুরুলিয়ার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে জমি সংগ্রহ করেছেন ধীরে ধীরে।যত সহজে লিখলাম কাজটা তত সহজ হয়নি। দিনের পর দিন প্রায় গাছতলায় কাটিয়ে গ্রামের লোককে আপন করে নিয়েছেন,অংশীদার করেছেন তাঁদের কর্মকাণ্ডে।তাঁরা যে সত্যি আপন হয়েছেন বোঝা যায়- এই জেলার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভালোপাহাড়ের কাজ থেমে থাকেনি।
ভালোপাহাড়ের কর্মকাণ্ডের কথা আগেই শুনেছিলাম, এখানকার তত্ত্বাবধায়ক সাহিত্যিক কমল চক্রবর্তীর আমন্ত্রণ যখন এল – আর দেরি না করে বেড়িয়ে পড়লাম।মার্চ মাস- এখন পুরুলিয়া অঞ্চলে ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’-এর লোভও কম নয়। কলকাতা থেকে গাড়িতে প্রায় পাঁচ-সাড়ে পাঁচ ঘন্টার পথ- পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বেলা বারোটা। চারপাশে দলমা পাহাড়ে ঘেরা আরণ্যক পরিবেশে দোতলা বাড়ি, সামনে গোলপাতার ছাউনি দেওয়া আড্ডা-ঘর।কোথাও কোনও আড়ম্বরের ছাপ নেই, চারপাশে যা আছে সবই যেন প্রকৃতির রঙে রঙ মেলানো।পৌঁছেই পেলাম কমলবাবুর সাদর অভ্যর্থনা, নিজের হাতে তৈরি করে দিলেন সুগন্ধি দার্জিলিং চা। আমাদের থাকার জায়গা ঠিক হল দোতলার এক ঘরে, ঘর-সংলগ্ন বারান্দা থেকে দেখা যায় ধূ ধূ প্রান্তরের সীমানায় দলমা পাহাড়, ইতি-উতি উঁকি মারছে খেজুর গাছ আর দৃপ্ত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে রক্তপলাশ।
কমলবাবুর কাছে শুনছিলাম তাঁদের কাজের কথা। পুরুলিয়ার এই রুক্ষ অঞ্চলে গাছপালা প্রায় ছিলই না। অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মাটিতে লাগিয়েছেন সোনাঝুরি, নানা ফুল, ফলের গাছ – যা এখন চেহারা নিয়েছে প্রায় এক অরণ্যের। বিকেলে গেলামও সেই অরণ্যের পথে। মাঝে মাঝে রয়েছে ধানক্ষেত, বাঁধাকপি, টমাটো ইত্যাদি। শুনলাম এখানে ব্যবহার হয় না কোনও রাসায়নিক সার। এঁরা গ্রামের সব লোককে বুঝিয়েছেন রাসয়নিক সারের ক্ষতির দিক, উৎসাহিত করেছেন জৈবসারের ব্যবহারে। শুধু তাই নয়-এঁরা ফলাচ্ছেন প্রায় অবলুপ্ত দেশি ধান- কালোনুনিয়া, কালোভাত।
আমাদের থাকার জায়গার পাশেই স্কুলঘর। ক্লাস এইট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুমোদিত, তবে আছে দশ ক্লাস পর্যন্ত, অন্য স্কুল থেকে বোর্ডের পরীক্ষা দেয় ছাত্রছাত্রীরা। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পড়তে আসে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা, ছাত্রাবাসও আছে দূরের ছেলেমেয়েদের জন্য। এরা খাওয়াদাওয়া করে অতিথিদের সঙ্গে একসাথে। প্রায় দেড়শো ছেলেমেয়ের রান্না হচ্ছে, খাওয়া হচ্ছে – কিন্তু নেই কোন শোরগোল, নিয়মনিষ্ঠার সাথে সবার কাজ সবাই করে যাচ্ছে। জঙ্গলের পথে যেতে চোখে পড়ল গোয়ালঘর- প্রায় চল্লিশটি গরু আছে, আছে হাঁস,মুরগিও। এর সবকিছুরই স্বাদ পেলাম খাওয়ার সময়ে- কালো নুনিয়ার ভাত, ক্ষেতের শাক-সবজি, পুকুরের মাছ, শেষ পাতে গরুর দুধের পায়েস-আর চাই কি? সকাল-বিকেল বেড়িয়ে পড়া নিরুদ্দেশের পথে। কোথাও সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পলাশের গাছ, কোথাও ম ম করছে মহুয়ার গন্ধ, পথে ছড়িয়ে আছে মহুয়ার ফল। প্রায় চার/সাড়ে চার কিলোমিটার পথ গেলে আছে দুয়ারসিনি নদী, তিরতির করে বয়ে চলেছে, বর্ষায় কি রূপ নেয় জানিনা। নদীর পাশে দুয়ারসিনি দেবীর মন্দির।
কাছেই ছিল বন-উন্নয়ন বিভাগের পর্যটক আবাস, মাওবাদী গোলমালের সময়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। কোন এক বর্ষায় নদীর ধারে এই আবাসে থাকার ইচ্ছে রইল। কমলবাবু সন্ধান দিলেন আরেক পথের। গ্রামের শেষে পাহাড় যেখানে শুরু হয়েছে, প্রকৃতি সেখানে তৈরি করে দিয়েছে সাদা পাথরের গ্যালারি, সেখান থেকে সূর্যাস্ত-র দৃশ্য নাকি অপূর্ব। সত্যি পলাশ-কুসুমের মাঝে পাহাড়ের কোলে সূর্যাস্তর দৃশ্য সারাজীবনে ভোলার নয়। ভোলার নয় আরোও অনেক কিছু- হাসিমুখে কমলবাবুর অক্লান্ত পরিশ্রম, শত কাজের মধ্যেও প্রতিটি অতিথির খুঁটিনাটি সুবিধা-অসুবিধার প্রতি তীক্ষ্ণনজর, ভালোপাহাড়ের প্রত্যেক কর্মীর আন্তরিকতা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাসিমুখে পরিতৃপ্তির ছাপ।
ভালোপাহাড় আরো বড় হতে চায়, তাকে বাড়িয়ে দিতে হবে আমাদের সাহায্যের হাত।
