
গত ২৫ থেকে ২৭ জানুয়ারি উত্তরপাড়ায় অনুষ্ঠিত হল সঙ্গীতচক্রের ৬৩ তম বার্ষিক অধিবেশন
১৯৫৭ সালে উত্তরপাড়ার বুকে কিছু সঙ্গীত অনুরাগীর হাত ধরে তৈরি হয় উত্তরপাড়া সঙ্গীতচক্র। এক স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা যাঁদের বার্ষিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠানের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি। কেবল বার্ষিক অনুষ্ঠান ছাড়াও জেলাভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, কর্মশালা ও সারাবছরের একটি গানের স্কুল চালায় এই সংগঠন। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ভূমিকায় ছিলেন অমরনাথ মুখার্জি, যাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলা। সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পীদের এক মঞ্চে পাওয়ার ঐতিহ্যের নাম সঙ্গীতচক্র।

গত ২৫ থেকে ২৭ জানুয়ারি উত্তরপাড়ায় অনুষ্ঠিত হল সঙ্গীতচক্রের ৬৩ তম বার্ষিক অধিবেশন। প্রথম দিন সন্ধে ৮টায় শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলে সারা রাত। এইদিন অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিলেন কৈবাল্য কুমার গৌরব। এরপর দ্বৈত বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন বিক্রম ঘোষ এবং অভিষেক মল্লিক। এছাড়াও ছিলেন সন্দীপন সমাজপতি, বিদুষি নন্দিনী ঘোষাল। সেতারে ছিলেন ইন্দ্রজিৎ রায় চৌধুরীএবং সপ্তর্ষি হাজরা।

দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান চলে বিকেল ৪টে থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। এদিন অনুষ্ঠান শুরু হয় মোহন বীণায়। পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাটের সুরের যাদুতে সন্ধে নেমে আসছে তখন গঙ্গার বুকে। জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরির মাঠে তখন একটু একটু করে ঠাণ্ডা বাড়ছে। মা নিজের চাদর খুলে জড়িয়ে দিচ্ছেন সন্তানের গায়ে, আর ডানপিটে শিশু তার চেয়েও দুরন্ত এক সুরের পিছনে ধাওয়া করে এসে ক্লান্ত শরীরে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে অচেনা বাদ্যযন্ত্রের দিকে। এদেরই কেউ কেউ ভালোবেসে ফেলবে সুর, তারপর সারাজীবন চর্চা অথবা কেবল ভালোলাগাতেই কোনওদিন হাত ছাড়বে না গানের। সুর মানুষের জীবনের সেই দড়ির খেলা যেখানে পা ফসকালে মৃত্যু হবে না কারও, হাত পা-ও ভাঙবে না হয়তো, শুধু আঘাত থাকবে কিছু, কিছু জটিল ক্ষত। তারপর এমনই এক মঞ্চ থেকে নেমে আসার সময় ডায়েরি বাড়িয়ে দিলে নাম জিজ্ঞাসা করে ভি বাল সারা তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতে সই করে আমার সামান্য নোটবুক অসামান্য করে দেবেন। অথবা হরিপ্রসাদ নিজের সইয়ের মাথায় সানাই এঁকে দিদিকে বাচ্চা পেয়ে আটআনা পারিশ্রমিক দাবী করবেন… কেবল উত্তরপাড়াই জানে ভোরের গঙ্গার কুলকুল শব্দে পণ্ডিত রবিশংকর মিশে গেলে কেমন শোনায় গোটা এক শহরকে!
তৃতীয় অর্থ্যাৎ শেষ দিনের শুরুটা হয় বেগম পারভিন সুলতানাকে দিয়ে। ঠিক তারপরই পণ্ডিত তন্ময় বোসের তবলা ও শ্রী হরেকৃষ্ণ হালদারের শ্রীখোলের যুগলবন্দী। শেষ বললে হয়তো ভুলই বলা হবে। এ-অনুষ্ঠানে মাইক নামিয়ে রাখার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে যায় দিনগোনা। পরের বছরের প্রস্তুতি।

ভাবতে অবাক লাগে জীবনের প্রথম রাতজাগা কোনও পরীক্ষার জন্য নয়, সঙ্গীতচক্রে, মায়ের পাশের চেয়ারে বসে বড়ো বড়ো চোখে মুগ্ধ হয়ে শুনছি সুর। কতরকম বাদ্যযন্ত্র, তার কতরকমের চড়াই উৎরাই… এখন সে উত্তেজনা আর পাই না নিজের মধ্যে। যেদিন গিয়ে পৌঁছাই সেদিন মঞ্চ খোলার তোরজোড়। তাতে কী! উত্তরপাড়া আজও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য লাইন দেয়। এই তিনদিন জিটি রোডে জ্যাম হয়। মানুষ হন্যে হয়ে একটা টিকিট খোঁজেন। উত্তরপাড়ায় একটা শীত গিয়ে আরেকটা শীত চলে আসে। ঘাসের ডগায় তখনও শিশির জমে। লাইব্রেরির মাঠে কোথাও মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রিয় পথিককে দাঁড়াতে বলছেন। পথিক কি শুনতে পেলেন?
