
দরিদ্র অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান নিয়মিত
এবছর দীপাবলিতে বাজিপটকা কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছে মাননীয় কলকাতা হাইকোর্ট। তাতে বেজায় খুশি শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা টুম্পা সরকার। তাঁর মতে, প্রতিবছর দীপাবলির রাতে যেভাবে বাজিপটকা ফাটে, তাতে পশুপাখিদের খুব কষ্ট হয়। রাস্তার কুকুরগুলো প্রচণ্ড সমস্যায় পড়ে বাজির শব্দে। ওরা অবলা জীব। কথা বলতে পারে না। ওদের ভাষা আমরা বুঝতেও চাই না। এবার সেদিক থেকে স্বস্তি। টুম্পাদেবী জানিয়েছেন, তাঁরা নিষেধ করা সত্বেও বিগত বছরগুলোতে দেখেছেন কিছু মানুষ দীপাবলির আনন্দে মেতে ওঠার সময় পথ কুকুরগুলোর ওপর বাজিপটকা ছুঁড়ে দিয়েছেন। আর সেসব বাজিপটকার আগুন থেকে পুড়ে গিয়ে কিছু পথ কুকুরের শরীরে ঘা হয়েছে। সেসব কুকুরের তাঁরা চিকিৎসা করেছেন। এবারও তাই তাঁরা বিশেষভাবে সবরকম বাজি পোড়ানোর থেকে বিরত থাকার আবেদন করছেন।
তবে দীপাবলি বলে নয়, সারা বছর ধরে পশুপাখিদের নিয়ে কাজ করে নকশালবাড়ি এলাকায় একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছেন টুম্পাদেবী। মূলত তিনি বেশি কাজ করেন পথ কুকুর এবং বিড়ালদের নিয়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পথ কুকুরদের ওপর তাঁর কাজ এলাকায় তাঁকে ব্যতিক্রমী নাগরিক হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তবে পথ কুকুরদের পাশাপাশি ইদানীং তিনি চা বাগানের অনগ্রসরদের মধ্যেও সুনাম অর্জন করছেন বস্ত্র বিতরণের মাধ্যমে। নকশালবাড়ি এলাকায় তিনি বেশ কিছু দিন ধরে লোকজনের কাছ থেকে পুরনো বস্ত্র সংগ্রহ করেন, কেউ আবার তাঁর হাতে নতুন বস্ত্রও তুলে দেন। সেই সব নতুন পুরনো বস্ত্র সংগ্রহ করে টুম্পাদেবী চা বাগান এলাকায় বিতরণ করেন। এবারও শীত আসার আগে তিনি গরম জামাকাপড় সংগ্রহ করছেন। সেসব বিলি করবেন অসহায় দরিদ্র মানুষদের মধ্যে।
প্রতিদিন দুপুরে কমপক্ষে ত্রিশ পঁয়ত্রিশটি পথ কুকুরের জন্য রান্না করেন
শীতে কষ্ট পায় রাস্তার কুকুরগুলোও। তাদের কথা চিন্তা করে টুম্পাদেবী গতবছর রাতের বেলা চটের কিছু বস্তা নিয়ে বের হন। সেসব চটের বস্তার মধ্যে প্রবেশ করে পথ কুকুরেরা যাতে শীত থেকে একটু রেহাই পায় তাঁর প্রয়াস করেন। এবারও সেই কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।
রাজ্য সরকারের আইসিডিএসের একজন কর্মী টুম্পাদেবী। নকশালবাড়ি আজমাবাদ চা বাগান এলাকায় তিনি কর্মরত। সেখানে আইসিডিএস স্কুলে তিনি শিক্ষিকা। শিক্ষাদানের পাশাপাশি বাগানের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে খেলাধুলোর আসরও বসান। নিজে যে টাকা বেতন পান, তার কিছু অংশ দিয়ে পথ কুকুরদের সেবায় মাতেন নিয়মিত। প্রতিদিন টুম্পাদেবী বাড়িতে স্বামী, শিশু পুত্র, শ্বশুর বা অন্য সদস্যদের জন্য রান্নাবান্না করার সঙ্গে পথ কুকুরদের জন্যও রান্না করেন। সে অর্থে প্রতিদিন দুপুরে কমপক্ষে ত্রিশ পঁয়ত্রিশটি পথ কুকুরের জন্য তাঁর রান্না হয়ই। মেনুতে কখনও থাকে ভাত-চিকেন, কখনও অন্য কিছু। তারপর রাতে আবার বন রুটি, বিস্কুট, কলা নিয়ে স্বামী অভিষেক ঘোষের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া, এদিক ওদিকে ছড়িয়ে থাকা পথ কুকুরদের খাওয়ানো।
ভবিষ্যতে এলাকায় কুকুরদের জন্য একটি শেল্টার হোম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন
প্রতিদিন দুপুরে তাঁর বাড়ির সামনে কালু, লালু, ঝিমি, ভুলু, টাইগারদের মতো বারোটি পথ কুকুর নিয়মিত হাজির হয়। তারা কেউ অভুক্ত অবস্থায় ফেরে না। কোনও কোনও দিন আবার কালু, লালু, ঝিমিরা একটি-দুটি করে তাদের নতুন অভুক্ত অতিথিদের নিয়েও হাজির হয় টুম্পাদেবীর বাড়ির সামনে। তাদেরকেও অভুক্ত অবস্থায় ঘরের দরজা থেকে ফিরে যেতে দেন না তিনি।
আরও পড়ুন: দুঃস্থ মানুষদের ত্রাতা এই স্বনামধন্য চিকিৎসক
আজ ৩৩ বছর বয়স টুম্পাদেবীর। কিন্তু কবে থেকে শুরু হল তাঁর এই পশুপ্রেমের নেশা? তিনি জানালেন, একেবারে শৈশব থেকে। তাঁর বাবা দীপক সরকারও কুকুরদের ভালোবাসতেন। আর তাঁকে বলতেন, “এইসব অবলা জীবদের ভালোবাসবি। আর মানুষকেও ভালোবাসবি। বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা আশা করবি না।” বাবার কথা ছোটো থেকেই তাঁর মনে ধরে। আর সেই অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন।
শৈশব থেকেই পশুদের ভালোবাসেন টুম্পাদেবী
মাঝখানে করোনা দুর্যোগের জেরে পুরো লকডাউনের সময় টানা ৬৩ দিন দিনে-রাতে নকশালবাড়ি ও তার আশপাশে পথ কুকুরদের খাওয়ানোর কর্মসূচি নেন টুম্পাদেবী। কিছু সাধারণ মানুষও তাঁকে চাল, মাংস দিয়ে সহযোগিতা করেন। আর টুম্পাদেবীও অবলা জীবদের খাইয়ে শান্তি পান। কিছুদিন আগে ওই এলাকায় পথ কুকুরদের ডিসটেম্পার নামে একরকম ছোঁয়াচে রোগ হয়। সেই রোগের উপসর্গ ছিলো জ্বর, কাঁপুনি, বমিভাব, হেঁচকি এবং প্যারালাইসিস। তাতে এলাকায় ৫৩টি কুকুর মারা যায়। আর সেই দুর্যোগ থেকে কুকুরগুলোকে বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি। বাঁচাতে পেরেছিলেন ৫টি কুকুরকে।
ভবিষ্যতে এলাকায় কুকুরদের জন্য একটি শেল্টার হোম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায়, অসুস্থ কুকুরগুলোকে তিনি নিজে হাতে চিকিৎসাও করেন। কখনো কখনো পশু হাসপাতালের চিকিৎসকদের সহায়তা নেন। আবার পথ দুর্ঘটনায় কুকুরের মৃত্যু কমাতেও পথে নেমেছেন তিনি। এরজন্য কুকুরগুলোর গলায় রেডিয়াম বেল্ট লাগাতেও উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁর এই সব ব্যতিক্রমী কাজের প্রশংসা করেন অনেকেই। বিধাননগরের পুলিশকর্মী তথা সমাজসেবী বাপন দাস বলেন, “অসহায় দরিদ্র মানুষদের যেমন সেবা করেন টুম্পাদেবী, তেমনই অবলা জীবদের জন্য দিনরাত যা করেন তা সত্যি নজিরবিহীন। এইরকম সেবার মনোভাব সমাজে বাড়তে থাকলে সমাজের অনেক অন্ধকার দূর হবে”।

