
কর্মশালাটি আয়োজন করেছিল স্কুল অফ ফোক অ্যান্ড ড্রামা
ভারতের মূল সুর ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। ভারতীয় সংস্কৃতি-র প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই বিশেষত্ব চোখে পড়ে। নৃত্যকলা, সংগীত, শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা। প্রাচীন এই দেশের প্রতিটি অঞ্চলের ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’। সেইসব ভিন্ন সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে আদান প্রদানে পূর্ণ রূপ পায়। আর সংস্কৃতির অন্যতম মূল ও আদি স্তম্ভ হলো গান। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, শিল্পের সর্বোচ্চ রূপ হলো গান। ভারতীয় সংস্কৃতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ধরনের সংগীতে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ। বাংলাতেও অঞ্চলভেদে সংগীত, নৃত্যকলা প্রভৃতি আলাদা আলাদা। তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অনেক সময়েই নজরে পড়ে। সম্প্রতি তেমনই এক উদ্যোগের সাক্ষী থাকলেন আলিপুরদুয়ার জেলার রাজাভাতখাওয়ার মানুষ। সৌজন্যে স্কুল অফ ফোক মিউজিক অ্যান্ড ড্রামা (School of Folk Music and Drama) এবং আর্ট অফ লিভিং-ওয়াইএলটিপি (Art of Living- YLTP)। তাদের পক্ষ থেকে তিন দিনের একটি রবীন্দ্রসংগীতের কর্মশালা-র আয়োজন করা হয়েছিল আলিপুরদুয়ারের রাজাভাতখাওয়ার শ্রী শ্রী গৌশালায়। সহযোগিতায় ছিল যুগান্তর পরিবার। কর্মশালাটি আয়োজিত হয়েছিল গত ২৫ অগাস্ট থেকে ২৭ অগাস্ট।
রামকুমার লামা
“এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংগীতের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটানো”, বঙ্গদর্শন.কম-কে এমনটাই জানালেন স্কুল অফ ফোক মিউজিক অ্যান্ড ড্রামার চেয়ারম্যান তথা কর্মশালার আহ্বায়ক রামকুমার লামা। উত্তরবঙ্গের এই জেলায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস। লাভা, গারো, তামাং, ওঁরাও, ডোকপা, মেচ প্রভৃতি। তাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্যকলা। সেইসব গানের কোনও স্বরলিপি নেই, কোনও লিখিত রূপ নেই। উত্তরবঙ্গের উপজাতি-দের মুখে মুখে এইসব গান ছড়িয়ে যায় বংশপরম্পরায়। সেইসব গানকে একজায়গায় আনার উদ্দেশ্যে এই বছরের এপ্রিল মাস থেকে রামকুমার লামাদের স্কুল একটি ছ’মাসের কোর্স চালু করেছে, যেখানে সব লোকসংস্কৃতি একই ছাতার তলায় আসবে, বাড়বে তাদের মধ্যে আদানপ্রদান। তিনি জানান, “এইসব লোকগান প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শেখানোর উদ্দেশ্যেই এই কোর্স চালু করা হয়েছে। আর এইসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেইভাবে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান হয় না। নিজেদের সংস্কৃতির বাইরের জগৎ সম্পর্কে এঁদের তেমন ধারণা নেই। সেই সাংস্কৃতিক বেড়াজাল ভাঙা এই কোর্সের উদ্দেশ্য”। সেই কোর্সের অঙ্গই ছিল এই কর্মশালা, যার সেতুবন্ধক হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শিক্ষার্থীদের একাংশের সঙ্গে আয়োজক ও প্রশিক্ষকরা
এই কর্মশালায় শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীত। রামকুমার লামারা এই কর্মশালায় প্রাধান্য দিয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের উপরেই। কারণটা তাঁর মুখেই শোনা যাক, “রবীন্দ্রসংগীত অতি উচ্চ মার্গের সংগীত। রবি ঠাকুর ভাষা আর ভাবের মাধ্যমে সমগ্র জগতকে তুলে আনতেন তাঁর গানে, যেখানে সুরে-সুরে ধ্বনিত হতো একাত্মতা। আমরা সেই একাত্মতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছি শিক্ষার্থীদের”। তিনদিনে রবীন্দ্রসংগীতের পূজা, প্রেম, স্বদেশ ও বিচিত্র পর্যায় থেকে মোট ৬টি গান শেখানো হয়েছে। সকাল ১০.৩০ থেকে বিকাল ৪টে পর্যন্ত এক এক দিনের কর্মশালা চলেছে। বেছে নেওয়া হয়েছিল ৭টি গান- আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি, বিপদে মোরে রক্ষা করো, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, পুরানো সেই দিনের কথা, ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়, ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল। গানগুলি শেখানো হয়েছে বাংলা ভাষাতেই। প্রশিক্ষক হিসাবে ছিলেন ডঃ আশিস কুমার দাস। রামকুমার বলেন, “নেপালি ভাষায় আর তামাং ভাষায় কিছু রবীন্দ্র সংগীত অনূদিত হয়েছে, যেমন- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে হয়নি। আর অন্যান্য উপজাতিক ভাষায় তেমনভাবে অনূদিত হয়নি রবীন্দ্রসংগীত। আমরা চেষ্টা করব, পরবর্তীকালে বিভিন্ন উপজাতিক ভাষায় রবীন্দ্রসংগীত শেখাতে”। জানালেন, শেখানো হবে নজরুলগীতি এবং অন্যান্য সংগীতও।
কর্মশালায় রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন শিক্ষার্থীরা
রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি বিভিন্ন লোকগানও শেখানো হয় এই ছ’মাসের কোর্সে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ১৬-১৭টি ভাষাভাষীর আদিবাসী মানুষ। তাঁদেরকে নয়টি দলে ভাগ করা হয়েছে। আর বিভিন্ন ভাষা থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে তিনটি করে লোকগান, যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রশিক্ষকরা- উর্গেন লোপচান লামা, রোশনি লামা। শিক্ষার্থীরা একে অন্যের লোকগান শিখছেন, অন্য ভাষার লোকগানের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। আংশিক ক্রমে সামগ্রিক হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই কোর্স সম্পর্কে খুবই উৎসাহ রয়েছে বলে জানালেন রামকুমার।
তাঁরা এবার লোকবাদ্যের একটি সংগ্রহশালা খুলতে চান। তার কাজও শুরু হয়েছে। চলছে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করার কাজ। সেগুলির মধ্যে রয়েছে আদিবাসীদের নাগরা-মাদল (ধামসা-মাদল), রাভাদের কালবাঁশি, তামাংদের দমফু, বিভিন্ন উপজাতিদের ব্যবহার করা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি। এইভাবেই সংগীতের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতির আগল ভাঙছেন রামকুমার লামারা, আর পথ দেখাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ছবি সৌজন্যেঃ রামকুমার লামা
