
ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবের জন্ম দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং
১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ। ভরা বর্ষায় আপামর বঙ্গবাসীর মাথার ওপর থেকে বিরাট ছায়াটি গুটিয়ে চিরতরে চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাইশে শ্রাবণ সেই থেকে বাঙালির শোকের দিন, তাঁদের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে স্মরণের দিন। কবিতায়-গানে-আলোচনায় চলে সেই স্মরণ। এ যেন অনেকটা গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো। অথচ, এই স্মরণ-উদযাপনের থেকে এইদিন অনেকটাই আলাদা হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের প্রাণের শান্তিনিকেতন। সেখানে তিরোধান দিবসে কবিকে স্মরণ করা হয় ভিন্নভাবে, হয়তো বা আরো নিবিড়তায়। আটাত্তর বছর ধরে, প্রতিটি বাইশে শ্রাবণে, শান্তিনিকেতনে পালিত হচ্ছে ‘বৃক্ষরোপণ উৎসব’। নিজস্ব রীতি ও ঐতিহ্য মেনে বৃক্ষরোপণের ভিতর দিয়েই এখানে স্মরণ করা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে।
আরো পড়ুন
দুই মেয়ের মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথ
শান্তিনিকেতনে এই ‘বৃক্ষরোপণ উৎসবের’ সূচনা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ, কবির ৬৪ বছরের জন্মদিনে, ‘উত্তরায়ণের’ উত্তরে পথের ধারে ‘পঞ্চবটী’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। নিজের হাতে রোপণ করেছিলেন অশ্বত্থ, বট, বেল, অশোক ও আমলকী গাছের চারা। আশ্রমের প্রথম বৃক্ষরোপণ উৎসব উপলক্ষে পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী আশ্রমের প্রথম এই বৃক্ষরোপণ উৎসব উপলক্ষে রচনা করেছিলেন একটি শ্লোক—
‘পান্থানাং পশুনাং পক্ষিনাং চ হিতেচ্ছায়া
এষা পঞ্চবটী রবীন্দ্রেনেহ রোপিতা।’

এর পরে, ১৯২৮ সালের ১৪ জুলাই, বৃক্ষরোপণ উৎসবে শান্তিনিকেতনের পিয়ারসন পল্লিতে নিজের হাতে বকুলগাছের চারা রোপণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন— ‘তোমার টবের বকুল গাছটাকে নিয়ে অনুষ্ঠানটা হল। পৃথিবীতে কোনও গাছের এমন সৌভাগ্য কল্পনা করতে পার না। সুন্দরী বালিকারা সুপরিচ্ছন্ন হয়ে শাঁখ বাজাতে বাজাতে গান গাইতে গাইতে গাছের সঙ্গে যজ্ঞক্ষেত্রে এল।’
তখনই ‘বৃক্ষরোপণ উৎসব’ শান্তিনিকেতনের অন্যান্য উৎসব-আচার-অনুষ্ঠানের মতো একটি নিজস্ব চরিত্র পেয়ে গেছে। কোনোবার এই উৎসবের দিন কবিতা পাঠ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, কখনো লিখেছেন গান। ১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতন আশ্রমের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে ভুবনডাঙায় আয়োজিত হল বৃক্ষরোপণ আর বর্ষামঙ্গল উৎসব। প্রতিষ্ঠা হল গ্রামের বিশাল জলাশয়ের। ১৯৪১ সালের বৃক্ষরোপণ উৎসব দেখে যেতে পারেননি কবি। তাঁর মৃত্যুর মাসখানেক পর রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল বৃক্ষরোপণ উৎসব। এরপর, কবির মৃত্যুদিনেই অনুষ্ঠিত হতে শুরু করল বৃক্ষরোপণ উৎসব। এ যেন প্রকৃতির হাজারো জন্মের ভিতরে রবীন্দ্রনাথকে, রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকেই পুনর্স্থাপন করতে চাওয়া। বলতে চাওয়া মৃত্যু আদতে শেষ নয়, তা আসলে জন্মের অমোঘ গন্তব্য।
আরো পড়ুন
সুকুমার রায়ের মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথ
আজো, শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা-সহ ভবনের কর্মচারীবৃন্দেরা সকলেই অংশ নেন এই অনুষ্ঠানে। ভোরের বৈতালিক থেকে শুরু করে বিকালে শোভাযাত্রা-সহযোগে বৃক্ষরোপণ করার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় ভিন্ন ভিন্ন মনোগ্রাহী অনুষ্ঠান ও কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে। নিছক বৃক্ষরোপণ নয়, তার সঙ্গে জুড়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী সমস্ত আচার ও অনুষ্ঠানও এই উৎসবকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। যে চারাগাছটি রোপিত হবে, সেই গাছটিকে মনোরম সাজে সজ্জিত পালকির মতো দেখতে একটি পালঙ্কতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পঞ্চকন্যা ও ছত্রবাহক সহযোগে। সঙ্গে চলে নাচ, গানের সমারোহে শোভাযাত্রা। এরপর, একটি নিদির্ষ্ট স্থানে গাছটি রোপন করা হয়। বৃক্ষরোপণে ব্যবহৃত পালঙ্ক ও পঞ্চকন্যার সাজে ব্যবহৃত অলংকার তৈরির কাজে যুক্ত থাকে কলাভবনের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকারাই।
এই অনুষ্ঠান পর্বটিকে বেশ কয়েকটি অংশে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন-
১. ফুল সংগ্রহ- উৎসবের দিন ভোরবেলা কলাভবনের ছাত্ররা স্নান সেরে সংগ্রহ করে আনেন টাটকা রঙিন ফুল। পরিমাণ নেহাত কম নয়। নাম জানা-অজানা সব ধরনের ফুলকে একত্রিত করলে তেরি হয় একটা ছোটো আকারের টিপি।
আরো পড়ুন
রবীন্দ্রনাথের গানের শেষ ও শেষের গান
২. অলংকার গড়া- সংগ্রহ করা বিভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে তৈরি করা হয় পঞ্চকন্যার জন্য বাহারি নানান ধরনের অলংকার। এই কাজটি দলবদ্ধভাবে করে থাকেন ভবনের ছাত্রীরা। পঞ্চকন্যার জন্য তৈরি হয় টিকলি, কানের দুল, মাথার মুকুট, হাতের চূড় ও বালা-র মতো নয়নাভিরাম সমস্ত অলংকার।
৩. পঞ্চকন্যা- বৃক্ষরোপণ উৎসবের রীতি মেনে কলাভবনেরই পাঁচজন ছাত্রীকে সাজানো হয় পঞ্চকন্যা হিসাবে। এই পঞ্চকন্যারা পৃথিবীতে জল, বায়ু, অগ্নি, মৃত্তিকা ও প্রাণ এই পঞ্চভূতের প্রতিনিধি। এদের হাতে থাকা জলের পাত্র জলকে, হাতপাখা বায়ুকে, ধূপদানীর ধূপ আগুনকে, মাটির তাল মৃত্তিকাকে এবং শাঁখ শুভ আওয়াজকে প্রতীকায়িত করে। পঞ্চকন্যার পরনে রবীন্দ্রনৃত্যের অনুকরণে শাড়ি, সঙ্গে উওরীয় ও ফুলের অলংকার। পঞ্চকন্যার উওরীয় ও শাড়ির পাড়ের রং আলাদা হয়। যথাক্রমে- কমলা, সবুজ, হাল্কা নীল, হলুদ এবং লাল।

৪. পঞ্চপুত্র- পাঠভবনের খুদে পাঁচজন ছাত্রকে সাজানো হয় পঞ্চপুত্র হিসেবে। এদের পরনের পাঞ্জাবির রং, মাথায় থাকা মুকুটের নকশা এবং কপালে আঁকা টিপ যথাক্রমে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমকে চিহ্নিত করে।
৫. ছত্র ও পালকি-বাহক- পঞ্চকন্যার পাশাপাশি ছত্র ও পালকিবাহক সাজানো হয় ছয়জন ছাত্রকে। যাদের মধ্যে দু’জন ধরেন ছত্র, এবং চারজন কাধে করে পালকি বহন করেন।
৬. ছত্র ও পালকি- চারাগাছটিকে রোপণ করতে নিয়ে যাওয়া হয় সুসজ্জিত পালকিতে করে বসিয়ে। পালকিটিকেও সাজানো হয় ভারি চমৎকারভাবে। পালকি-বাহকের আগে ও পরে ছত্র-বাহকের হাতের ছত্রটিকেও সুন্দর করে সাজানো হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পালকি কাঠের তৈরি এবং ছত্রটি বেতের। যা নতুন নতুন নকশায় ও সাজে সাজানো হয় প্রত্যেকবার।

৭. আলপনা- বৃক্ষরোপণের স্থানটিকে আলপনা দিয়ে সাজানো হয়। একসময় এই আলপনা আঁকতেন নন্দলাল বসু, মুকুল দে, অসিত হালদারের মতো মানুষরা। পরবর্তীকালে গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেন, ননীগোপাল ঘোষ-এর হাতে এই আলপনা প্রাণ পেত। বর্তমানে সেই একই ধাঁচে ভবনের ছাত্র-ছাত্রীরাই এই আলপনা আঁকেন।
দুপুর থেকে বিকালের মধ্যে একটি নিদির্ষ্ট সময়ে বিশাল শোভাযাত্রা সহযোগে ভবনের কোনো একটি স্থানে গাছটি রোপণ করা হয়। শোভাযাত্রার একেবারে সামনের সারিতে থাকে পঞ্চকন্যারা। এরপরে খোল, করতাল-সহ ভবনের খুদে ছাত্র-ছাত্রীদের দল। তারপরের সারিতে থাকে দুই ছত্রবাহক, যাদের মাঝখানে পালকিবাহকের কাধে সুসজ্জিত ওই পালকির মধ্যেই থাকে চারাগাছটি। ওই সময় রোপণ করবার স্থানে উপস্থিত থাকে পঞ্চপুত্রেরা। চারাগাছটি রোপণ করবার মূহূর্তে পাঠ করা হয় শ্লোক। শাঁখ বাজিয়ে, পাখার বাতাস ও ধূপ দিয়ে চারাগাছটিকে রোপণ করা হয়। গাছটি রোপণ করেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য স্বয়ং।
স্পষ্টতই, কবিগুরুর প্রয়াণ দিবসের এই বৃক্ষরোপণ উৎসব আর পাঁচটি বৃক্ষরোপণ উৎসবের থেকে চরিত্রগতভাবে আলাদা। নিছক গাছ লাগানো নয়, এখানে আসলে বরণ করা হয় প্রকৃতিকে, প্রাণকে। এ আসলে একটি বহমান দর্শনের উদযাপন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনেও তাঁর দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখার উদযাপনও বটে।
