পেরেক তুলে গাছের যন্ত্রণা লাঘব করছেন ওয়াহিদ

৫০০ কিমি রাস্তায় ১২৭ কেজি পেরেক তুলেছেন এই গাছবন্ধু…

শিক্ষার ঠিকঠাক সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে প্রচুর। তবে যাঁরা শিক্ষা আর প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে সমার্থক মনে করেন, তাঁদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারেন বাংলাদেশের এক প্রৌঢ় রাজমিস্ত্রি। আর্থিক দারিদ্রের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডীটুকুও তিনি পেরোতে পারেননি। অথচ, তাঁর কাজকর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবড় ডিগ্রিধারী মানুষরাও থ হয়ে যাবেন। এর সঙ্গে তিনি এটাও প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে শিক্ষিত হতে গেলে শুধুমাত্র সচেতন হওয়াই যথেষ্ট নয়, তার পাশাপাশি সক্রিয় হওয়াও ভীষণ রকমের প্রয়োজন।

তিনি ওয়াহিদ সরকার। মাথায় কৃষকের টুপি। তাতে বাংলাদেশি পতাকার লাল-সবুজ রং। পায়ে পুরোনো একজোড়া কেডস। একের পর এক গাছ থেকে তিনি পেরেক তুলছেন। অক্লান্তভাবে সরাচ্ছেন ফ্লেক্স, হোর্ডিং, ফেস্টুন, ব্যানার, পোস্টার, বিজ্ঞাপন। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা – এই তিনটে জেলার বিভিন্ন রাস্তায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার হেঁটেছেন তিনি। গাছ থেকে পেরেক তুলেছেন প্রায় ১২৭ কেজির মতো। শুনলে অবাক হওয়ার মতোই কথা। কিন্তু বাস্তবে তিনি এটাই করে দেখিয়েছেন। যদিও এই নিয়ে কোনো অহঙ্কার নেই তাঁর মনে। বরং তিনি মনে করেন, গাছেরও যেহেতু প্রাণ আছে, তাই যন্ত্রণাও আছে তাদের। সেই ব্যথাই খানিকটা লাঘব করার চেষ্টা করেন তিনি। গাছেদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন তিনি। তাদের জীবন, বেড়ে ওঠা এবং বৈচিত্র্য নিয়ে ওয়াহিদের ধারণা যথেষ্ঠ পরিষ্কার।

গাছের সংবেদনশীলতাকে এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। স্কুল-কলেজে আমরা সবই ছোটো বয়স থেকেই সেটা পড়ে এসেছি। কিন্তু পাঠ্য বইয়ের সেই জ্ঞান আমরা বাস্তব জীবনে কতটা প্রয়োগ করি? ক্লাসে বিজ্ঞানের নানা দিক নিয়ে পড়াশোনা করার পর আমরা কতটা পরিবেশের কাছে দায়বদ্ধ? কত সহজেই আমরা গাছেদের ওপর অত্যাচার করি, এই নিয়ে এক সেকেন্ডের জন্যও আমাদের কোনো অনুতাপ হয়? তাহলে আমাদের তথাকথিত শিক্ষার উপযোগিতা কোথায়? ওয়াহিদ সরকার জানান, যারা গাছের গায়ে পেরেক লাগান, ব্যানার কিংবা পোস্টার ঝোলান, তারা সবাই পয়সাওয়ালা এবং ডিগ্রিধারী লোক। তাই ওয়াহিদ যখন এই কাজ শুরু করলেন, তখন নিরাপত্তার একটা হুমকিও ছিল। অনেক লোক সন্দেহ করতেন তাঁকে। কেউ জিজ্ঞেস করতেন, কে তাঁকে নিয়োগ করেছেন, কেউ জানতে চাইতেন, এই কাজের জন্য তিনি কোনো টাকা পান কিনা। পেরেকগুলো বিক্রি করে টাকা রোজগারের ধান্দায় তিনি এই কাজ করেন বলেও মনে করতেন অনেকে। এই সব প্রতিকূলতায় খানিকটা ভয় পেলেও থেমে যাননি তিনি।

গোড়ার দিকে ওয়াহিদ মানুষকে বুঝিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাঁর ডাকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় “একলা চলো রে” নীতি গ্রহণ করেন। ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের খরচে এবং বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তিনি প্রায় ৩০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। আর্থিক অনটনের কারণে তাঁকে পরিবারের ক্ষোভও সহ্য করতে হয়েছিল। বাড়ির লোকেরা ভাবতেন, ওয়াহিদের এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অভ্যেস ধীরে ধীরে পরিবারের ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে দেবে। এখন তাঁর মালয়েশিয়াবাসী ছেলে সংসারের হাল ধরায় খানিকটা নিশ্চিন্ত ‘গাছবন্ধু’ । স্থানীয় মানুষ তাঁকে এই নামেই ডাকে। যতদিন পর্যন্ত না সরকার পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যানার, পোস্টারকে মিউজিয়ামে নিয়ে যাবে, ততদিন এই লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেই জানিয়েছেন ওয়াহিদ।

ছবি সূত্র – বিবিসি নিউজ

Developed by DXDasia